খুবই সৎপরামর্শ সন্দেহ নেই। কিন্তু করম আলির ভাষ্য অনুযায়ী কয়েকজন ‘বিশ্বাসঘাতক’ মিলে সিরাজকে পরামর্শ দিল যে একটি বিশাল সৈন্যবাহিনী সমাবেশ করে ইংরেজদের সঙ্গে লড়াইয়ে জেতা প্রায় অসম্ভব—তাই তিনি মীরজাফর ও তাঁর সঙ্গীদের শাস্তি দেবার চিন্তা মাথা থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তাদের সঙ্গে মিটমাট করে ফেলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু মীর মর্দান আবার তাঁকে সাবধান করে দিলেন এই বলে যে: ৫৬
বিপজ্জনক শত্রু সম্বন্ধে খুবই সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এসময় ওই সব সরদারদের [সেনাপতিদের অর্থাৎ মীরজাফর ইত্যাদি] কাছ থেকে কোনও রকম সাহায্য প্রত্যাশা করা আমাদের পক্ষে অনুচিত। আমাদের প্রধান কর্তব্য হবে এদের শায়েস্তা করা। তা হলে সেই শুনেই ইংরেজরা পিছু হঠে যাবে। আমাদের তাঁবুতে ওই দু’জনের [মীরজাফর ও খাদিম হুসেন খান] উপস্থিতি আমাদের অনুগত সেনাপতিদের অস্বস্তি ও আশঙ্কার কারণ হবে। ওঁরা দু’জন বিশ্বাসঘাতকতা করবেনই।
সিরাজদৌল্লা কিন্তু এ-সবে কর্ণপাতই করলেন না। এমনকী স্ক্র্যাফ্টনও জোর দিয়ে বলছেন যে মীরজাফরের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে সিরাজদৌল্লা চরম ভুল করেছিলেন। শুধু তাই নয়। তিনি মন্তব্য করেছেন যে সিরাজ তাঁর নিজের দুর্বলতা সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন কিন্তু তার ঊর্ধ্বে উঠে এবং সবরকম ভয় কাটিয়ে মীরজাফরকে শায়েস্তা করতে সাহস করেননি। তার পরিবর্তে বদান্যতা ও ক্ষমা প্রদর্শনের সূক্ষ্ম আড়ালে তাঁকে ভোলাবার চেষ্টা করলেন এবং শপথ বাক্যের মাধ্যমে তা সুদৃঢ় করার প্রয়াস পেলেন।৫৭ জাঁ ল’-ও বলছেন যে চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা না নিয়ে নবাব বিরাট ভুল করেছিলেন। তাঁর মতে মীরজাফর প্রতারণা করেছেন সিরাজদৌল্লা তাও বুঝতে পারেননি। তাঁর সঙ্গে একটা মিটমাট করে ফেললেন। মীরজাফর কোরাণ নিয়ে শপথ করলেন, তিনি নবাবের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন, আর সিরাজ তাতেই সন্তুষ্ট থাকলেন।৫৮ ল’-র সঙ্গত প্রশ্ন, সিরাজদৌল্লা যখন মীরজাফর, জগৎশেঠ এবং অন্যান্যদের তাঁর প্রতি বিরুদ্ধতার কথা জানতেন তখন এঁদের পরিকল্পনার কথা কেন আগে থেকে আঁচ করতে পারেননি? উত্তরটা অবশ্য তিনি নিজেই দিয়েছেন:৫৯
নবাবের এই অদ্ভুত আচরণের একমাত্র ব্যাখ্যা বোধহয় মোহনলালের অসুস্থতার ফলে তিনি একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। কাকে বিশ্বাস করবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তিনি তাঁর শত্রুদের বিশ্বাস করছেন এমন ভাব দেখাতে চাইলেন যদি এভাবে তাদের ছলনা করা যায়। এভাবে আপাতত তাদের ভুলিয়ে ভালিয়ে পরে সুযোগমতো তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া যাবে, সম্ভবত এটাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
বস্তুতপক্ষে মোহনলালের অসুস্থতাই সিরাজের পক্ষে মারাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যার ফলে ভাগ্যচক্রের কাঁটা নবাবের বিরুদ্ধে এবং ইংরেজ সমেত ষড়যন্ত্রকারীদের সপক্ষে ঘুরে যায়।মোহনলালের শত্রুরা তাঁকে বিষপ্রয়োগ করেছিল বলে সন্দেহ করা হয়।ইউসুফ আলি বলেছেন মোহনলাল ছিলেন সিরাজদৌল্লার সবচেয়ে বড় ভরসা এবং ডানহাত।৬০ জাঁ ল’ অবশ্য তাঁকে ‘সবচেয়ে বড় বজ্জাত’ বলে অভিহিত করেছেন, যদিও তার কারণ হয়তো তাঁর হতাশা যে মোহনলাল নবাবকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের সাহায্য করতে এবং মুর্শিদাবাদ থেকে তাঁর বিতাড়ন বন্ধ করতে রাজি করাননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁকে স্বীকার করতে হয়েছে যে সিরাজদৌল্লা ওই সময় যে বিপদে পড়েছিলেন তার মোকাবিলা করার জন্য তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল মোহনলালকে। ল’ লিখছেন:৬১
মোহনলাল ছিলেন শেঠদের জাতশত্রু এবং তাঁদের সঙ্গে লড়াই করার পক্ষে সবচেয়ে সক্ষম ব্যক্তি। আমার ধারণা মোহনলাল সুস্থ থাকলে এই সওকাররা [জগৎশেঠরা] তাঁদের [বিপ্লবের] প্রকল্পে অত সহজে সফল হতে পারতেন না। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, কিছুদিন ধরে এবং এই সংকটের মুহূর্তে মোহনলাল সাংঘাতিক অসুস্থ…. খুব সম্ভবত তাঁকে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় সিরাজদৌল্লা তাঁর একমাত্র ভরসা থেকে বঞ্চিত হলেন।
ততদিনে ষড়যন্ত্র পাকা হতে চলেছে এবং ওয়াটস মুর্শিদাবাদ থেকে পালাবার ফন্দি করছিলেন। ১২ জুন যখন ওয়াটস মুর্শিদাবাদ থেকে পালান, তখনই নবাব প্রমাদ গুনলেন এবং ইংরেজদের আসল মতলব সম্বন্ধে নিশ্চিত হন। ১৩ জুন ক্লাইভ নবাবকে তাঁর শেষ সতর্কবাণী জানিয়ে দিলেন। তার জবাবে সিরাজদৌল্লা লিখলেন:৬২
ওয়াটসের পলায়ন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রতারণামূলক আচরণ। [আলিনগরের] সন্ধি বানচাল করার জন্যই এটা করা হয়েছে। আপনার অনুমতি ও নির্দেশ ছাড়া ওয়াটস নিশ্চয় এরকম করতেন না। এরকম কিছু যে ঘটতে পারে তা আন্দাজ করেই আমি পলাশি থেকে আমার সৈন্যবাহিনী সরিয়ে আনিনি। কারণ আমি সন্দেহ করেছিলাম আপনারা এরকম কোনও ফন্দি করছেন। আল্লাকে ধন্যবাদ যে আমার দিক থেকে চুক্তিভঙ্গ করা হয়নি।
সিরাজদৌল্লা এখন পাগলের মতো জাঁ ল’-কে চিঠি লিখলেন, তাঁকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাহায্য করার জন্য মুর্শিদাবাদ ফিরে আসতে। এ সময় প্রচণ্ড গুজব যে ব্যুসি (Bussy) বাংলার দিকে আসছেন। ইংরেজদের তখনও ভয় ছিল যে ফরাসিরা নবাবকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারে।আর নবাবের কাছে তা ছিল একমাত্র আশাভরসা। নবাবের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন অমাত্য আবার তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করল মীরজাফরকে বন্দি করে রাখতে, কিন্তু সম্ভবত এই সংকটময় মুহূর্তে তাঁর সৈন্যবাহিনীর মধ্যে বিভাজন এড়াবার জন্য সিরাজ আবারও মীরজাফরকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করলেন। মীরজাফর তাঁর আস্থাভাজন ওমর বেগকে ১৯ জুন লেখা একটি চিঠিতে নবাব তাঁকে কীভাবে তোয়াজ করছেন তা সবিস্তারে জানালেন: ৬৩
