বাংলা থেকে, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চল থেকে, কাঁচা রেশম রফতানির ক্ষেত্রে ভারতীয়/এশীয় বণিকদের যে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য ছিল সেটা সমসাময়িক বহু তথ্য থেকে সুপ্রতিষ্ঠিত। সদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি কাশিমবাজারের এক গুজরাটি সিল্ক ব্যবসায়ীর গোমস্তা ছিলেন এবং তিনি নিজেও তিরিশ বছর ওই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৭৫০-র দশকের প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে মুর্শিদাবাদে তখন দশ জন সওদাগর ছিল যারা বছরে ১৩,০০০ থেকে ২০,০০০ মণ পর্যন্ত সিল্ক রফতানি করত।৪১ বাংলায় ডাচ কোম্পানির অধ্যক্ষ লুই টেইলেফারট (Louis Taillefert) ১৭৬৩ সালে লিখেছেন যে অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিক থেকে লাহোর ও মুলতান অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের গোমস্তারা মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার থেকে সিন্ধ কেনার পরিমাণ অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে।৪২ তা ছাড়া উইলিয়াম বোল্টস, হ্যারি ভেরেলস্ট, লিউক স্ক্র্যাফ্টন প্রমুখ জোর দিয়ে বলেছেন যে ভারতবর্ষ ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীদের অসংখ্য ‘ক্যারাভ্যান’ (caravan) বাংলায় পণ্য, বিশেষ করে বস্ত্র ও রেশম, কেনার জন্য নিত্য আসা যাওয়া করত। কিন্তু উত্তর পলাশি পর্বে এ চিত্র সম্পূর্ণ পালটে যায়। ইংরেজ কোম্পানি ও তাদের কর্মচারীদের দৌরাত্ম্যে ভারতীয়/এশীয় বণিকরা পিছু হঠতে বাধ্য হয় এবং ধীরে ধীরে তাদের স্থলপথের বাণিজ্যে ভাঁটা পড়তে থাকে এবং ক্রমশ তা প্রায় বিলীন হয়ে যায়।
রেশম শিল্পের পাশাপাশি আরও কিছু ছোটখাটো শিল্পের উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছিল নবাবি আমলের মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল হাতির দাঁতের কারুশিল্প (ivory carving)। এই শিল্পের উৎপত্তি নবাবি আমলে। তার আগে এর অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায় না। এর উৎপত্তি সম্বন্ধে একটি গল্প বহুল প্রচলিত। মুর্শিদাবাদের এক নবাব একটি কান-খুঁচুনি (ear-pick) তৈরি করতে বলেন এবং সে অনুযায়ী ঘাসের তৈরি একটি কান-খুঁচুনি বানানো হলে সেটা তাঁর একেবারেই পছন্দ হয়নি। কারণ একমাত্র হাতির দাঁতের তৈরি জিনিসই নবাবের মর্যাদার উপযোগী। তখন এ কাজের জন্য দিল্লি থেকে এক ওস্তাদ কারিগরকে আনা হল। তিনি যখন এ কাজ করছিলেন তখন এক হিন্দু ভাস্কর বা খোদাইকার দেয়ালের একটি ফুটো দিয়ে জিনিসটা কীভাবে করা হচ্ছে সেটা দেখে নেয় এবং কীভাবে এটা করতে হয় সে কৌশল শিখে ফেলে। এই ভাস্কর তার ছেলে তুলসীকে কৌশলটি শিখিয়ে দেয়। তুলসী খাটেম্বের (Khatember) এ কাজে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠে এবং নবাব তাকে পনেরো টাকা মাস মাইনেতে দরবারে নিযুক্ত করেন। নবাব ও দরবারের জন্য তুলসী হাতির দাঁতের নানারকম জিনিসপত্র তৈরি করত। অষ্টাদশ শতকে মুর্শিদাবাদের হাতির দাঁতের শিল্পকর্ম ভারতবর্ষের অন্য যে কোনও অঞ্চলের চাইতে অনেক বেশি সুনাম অর্জন করেছিল। দিল্লি, বেনারস প্রভৃতি অঞ্চলে মুর্শিদাবাদের এই শিল্পের অনুকরণে জিনিসপত্র তৈরি হত।৪৩
হাতির দাঁতের কারুশিল্পে প্রধানত জীবজন্তুর মূর্তি— হাতি, ঘোড়া, উট, ইত্যাদি; নৌকা, পালকি, গোরুর গাড়ি, হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি, বিয়ের মিছিল, শিকারের চিত্র, চিরুনি, লাঠি, খেলনা, ছুরির বাঁট, কলমদান, দোয়াতদান, আয়নার ‘ফ্রেম’ (কাঠামো), এসব ছিল উল্লেখযোগ্য। মীরজাফরের বেগম বিধবা মুন্নি বেগম ওয়ারেন হেস্টিংসের স্ত্রীকে হাতির দাঁতের তৈরি একটা চেয়ার ও ছোট টেবিল উপহার দিয়েছিলেন। এ দু’টি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মূল্যবান বস্তু হয়ে উঠেছিল। মুর্শিদাবাদ থেকে হাতির দাঁতের কারুশিল্প ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশেও রফতানি হত। দেশের ভেতরে এই শিল্পের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাবরা, তাঁদের অমাত্য ও অন্যান্য অভিজাতবর্গ এবং ধনী শ্রেষ্ঠীরা। নবাব এবং দরবারের রমরমা যখন অস্তমিত, তখন কিছুদিন কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের ইউরোপীয় কোম্পানির কর্মচারীরা এই শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করে। কিন্তু রেশম শিল্প ও বাণিজ্যের অবনতির ফলে কোম্পানিগুলির এজেন্টরা ওই অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ায় হাতির দাঁতের কারুশিল্পেও দুর্দিন ঘনিয়ে আসে। হাতির দাঁতের কারুশিল্পের জন্য হাতির দাঁত আসত শ্রীহট্ট ও চট্টগ্রাম থেকে, যেখানে তখন হাতি শিকার করা হত। তা ছাড়া বোম্বাই থেকে কলকাতা হয়ে আফ্রিকার হাতির দাঁতও মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে আসত।৪৪
সূত্রনির্দেশ ও টীকা
১. Glamann, Dutch-Asiatic Trade, pp. 112-113; K.N. Chaudhuri, Trading World, pp. 343-47; S. Chaudhury, Trade and Commercial Organization, pp. 178-80; Om Prakash, Dutch Company, pp. 208-09.
২. S. Chaudhury, Trade and Commercial Organization, p. 179.
৩. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 119-200.
৪. Glamann, Dutch-Asiatic Trade, p. 122; Om Prakash, Dutch Company, pp. 187, 196, 199; S. Chaudhury, Trade and Commercial Organization, p. 181.
৫. Bernier, Travels, p. 439.
৬. S. Chaudhury, From Prosperity to Decline, pp. 220-21.
