কিন্তু মুন্নি বেগমের এই সৌভাগ্য বেশি দিন স্থায়ী হল না। দু’বছর পরে ওয়ারেন হেস্টিংস গভর্নর জেনারেল পদে নিযুক্ত হলেন বটে কিন্তু যে নতুন কাউন্সিল হল, তাতে তিনজন সদস্যই হেস্টিংস-বিরোধী। তারা মুন্নি বেগমকে অপসারণ করে আবার বব্বু বেগমকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন। এতে হেস্টিংস খুবই মর্মাহত হন। মুন্নি অবশ্য বরাবরই হেস্টিংসের বিশ্বস্ত বন্ধু ছিলেন এবং তাঁর বিপদে আপদে সবসময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন। হেস্টিংসও অবশ্য তাঁর প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকী ১৭৮৩ সালে ভারতবর্ষ ছাড়ার আগে তিনি লন্ডনের পরিচালক সমিতির কাছে মুন্নি বেগমের প্রশংসা করে এবং বৃদ্ধ বয়সে তিনি যেন একটু আরামে থাকতে পারেন তাঁর জন্য ওঁর ভাতা যেন বাড়িয়ে দেওয়া হয়, সে অনুরোধ জানান। মুন্নি বেগমের একটি আর্জিও এ চিঠির সঙ্গে পাঠানো হয়। তাতে অবশ্য খুব একটা ফল হয়নি—মুন্নি বেগমের মাসিক ভাতা ঠিক হল ১২,০০০ টাকা। সেটা এবং নিজের সঞ্চিত ধনভাণ্ডার দিয়ে সত্যিকারের বেগম ও রানির মতোই তিনি মুর্শিদাবাদে জীবন কাটাতে লাগলেন। তাঁকে কেউ ভালবাসত না কিন্তু নবাব থেকে সবাই তাঁকে ভয় করত।
মুন্নি বেগম আনুমানিক ৯৭ বছর বয়সে ১৮১৩ সালের ১০ জানুয়ারি মারা যান। মৃত্যুর সময় তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তির মোট মূল্য ছিল ১৫ লক্ষ টাকার ওপর। জাফরাগঞ্জে মীরজাফরের পারিবারিক সমাধিক্ষেত্রে তাঁকেও সমাধিস্থ করা হয়। মুর্শিদাবাদ প্রাসাদের দক্ষিণপূর্বে চক মসজিদ মুন্নি বেগম তৈরি করিয়েছিলেন। এটাই মুর্শিদাবাদের বৃহত্তম মসজিদ। নবাব সুজাউদ্দিনের প্রাসাদ চেহেল সুতুনের ধ্বংসাবশেষের ওপর এটি তৈরি হয় ১৭৬৭ সালে। মুন্নি বেগমকে কোম্পানির জননী আখ্যা দেওয়া হয়। তাঁর স্বামী নবাব মীরজাফরের মৃত্যুর পর তিনি যখন শোকে মুহ্যমান তখন লর্ড ক্লাইভ নাকি তাঁকে এই বলে সান্ত্বনা দেন যে, ‘আমি মৃত নবাবকে বাঁচিয়ে তুলতে পারব না কিন্তু আপনাকে আন্তরিকভাবে জানাচ্ছি যে আমি এবং এখানকার আমার ইংরেজ সহকর্মীরা আমাদের আপনার সন্তান বলেই মনে করি, আপনাকে আমরা আমাদের জননী বলে জানি।’ বস্তুতপক্ষে ক্লাইভ এবং হেস্টিংস দুজনেই মুন্নি বেগমকে বেশ সম্ভ্রমের চোখে দেখতেন এবং তাঁর প্রতি যথেষ্ট সদয় ছিলেন। সত্যি বলতে গেলে মুন্নি বেগমের জীবনের মতো বারবার এমন উত্থানপতন, এমন বৈচিত্র্যে ভরা বর্ণময় জীবন মুর্শিদাবাদের বেগমদের মধ্যে দেখা যায়নি। তাই আজও তাঁর স্মৃতি অমলিন।
সূত্রনির্দেশ ও টীকা
১. সিয়র, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৪৫; রিয়াজ-উস-সলাতিন, পৃ. ৩২২।
২. Abdul Karim, Murshid Quli, p. 59
৩. B. N. Banerjee, Begams of Bengal, pp. 2-3. ফারসি ইতিহাস সিয়র বা রিয়াজ-উস-সলাতিনে আগে থেকে বাদশাহের অনুমোদন নেওয়ার উল্লেখ কিছুই নেই। আসলে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে দিল্লির বাদশাহ শুধু নামেমাত্র মুঘল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর ছিলেন কিন্তু কার্যত তাঁর কোনও ক্ষমতাই ছিল না। ফলে বাংলার নবাবরা দিল্লিতে যিনিই মসনদে বসতেন, তাঁকেই রাজস্ব পাঠাতেন। দিল্লিতে নিয়মিত রাজস্ব পাঠালেই বাদশাহ সন্তুষ্ট থাকতেন, তাঁদের আর ঘাঁটাতেন না।
৪. রিয়াজ-উস-সলাতিন, পৃ. ২৮৮. রিয়াজের লেখক গোলাম হোসেন সলিম অবশ্য বলছেন যে সরফরাজকে নিবৃত্ত করেন তাঁর মাতামহী মুর্শিদপত্নী নাসিরা বানু বেগম, রিয়াজ, পৃ. ২৮৮। স্যার যদুনাথ সরকারের বক্তব্যও মোটামুটি তাই, History of Bengal, vol. 2, p.423. অন্যদিকে ব্রজেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি লিখেছেন যে জিন্নতউন্নেসাই সরফরাজকে তাঁর পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে বলেছিলেন, B. N. Banerjee, Beganas of Bengal, p. 2. অবশ্য তারিখ-ই বংগালার লেখক সলিমুল্লা জানাচ্ছেন, এ ব্যাপারে নাসিরা বানু ও জিন্নতউন্নেসা দু’জনেই সরফরাজকে নিবৃত্ত করেন, তারিখ-ই-বংগালা, পৃ. ৭২।
৫. ইউসুফ আলি, তারিখ-ই-বংগালা-ই-মহবৎজঙ্গী, পৃ. ৮-৯; B. N. Banerjee, Begams of Bengal, pp. 3-4; সিয়র, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৮২।
৬. রিয়াজ, পৃ. ৩১০-৩২১, মুজাফ্ফরনামা, পৃ. ২০-২৩; J. N. Sarkar, History of Bengal, vol. II, pp. 440-42; K. K. Datta, Alivardi and His Times, p. 248.
৭. সিয়র, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৪০; B. N. Banerjee, Begams of Bengal, p. 5.
৮. B.N. Banerjee, Begams of Bengal, p. 6
৯. সিয়র, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৬; J, N. Sarkar, Bengal Nawabs, Pp. 50, 147-48; 152-53.
১০. সিয়র, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৬।
১১. B. N. Banerjee, Begams of Bengal, p. 6.
১২. সিয়র, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৩৪৮-৫০, ৩৫৩-৫৫; রিয়াজ, পৃ. ৩২৭-২৮, ৩৩০।
১৩. রিয়াজ, পৃ. ৩২৯; B. N. Banerjee, Begams of Bengal, p. 8.
১৪. রিয়াজ, ৩৩৮-৩৯; B. N. Banerjee, Begams of Bengal, p. 7; নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, পৃ. ৭৯-৮০।
১৫. সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ১১-১৪।
১৬. ঐ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬৫-৬৬।
১৭. সিয়র, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪২২।
১৮. B, N. Banerjee, Begams of Bengal, p. 11; নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, পৃ. ৮৪-৮৫।
১৯. Holwell to William Davis, 28 Feb. 1757, Hill, 111, pp. 151-52.
