সিরাজদ্দৌল্লা ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর কাছে যে সমস্ত রসিদ আছে তা থেকে তিনি প্রমাণ করতে পারবেন যে ইংরেজরা ফারুখশিয়রের ফরমান পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এশীয় ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যকে কোম্পানির দস্তকের মাধ্যমে শুল্কমুক্ত করে দিয়ে বাংলার নবাবকে তাঁর ন্যায্যপ্রাপ্য দেড় কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করেছে।
এমনকী এস. সি. হিলও স্বীকার করেছেন যে ইংরেজদের ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য যেসব সুযোগ সুবিধে দেওয়া হয়েছিল, তাঁর অপব্যবহার সম্বন্ধে এটা বলতেই হবে যে ইংরেজরা যেভাবে দস্তকের ব্যবহার করেছে, তা [ফারুখশিয়রের] ফরমানে কখনওই বলা হয়নি। এই ফরমান শুধু কোম্পানিকেই শুল্কমুক্ত বাণিজ্য করার সুবিধে দিয়েছিল কিন্তু ইংরেজরা এই দস্তক দিয়ে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য শুধু নয়, দেশীয় ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যও শুল্কমুক্ত করে দিত।৩৫ সুতরাং ওপরের তথ্যপ্রমাণ ও বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট যে দস্তকের যথেচ্ছ অপব্যবহার নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজদ্দৌল্লার অভিযোগ যথার্থ, একে তাঁর ‘মিথ্যা অজুহাত’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
.
নবাবের অপরাধী প্রজাদের আশ্রয়দান
নবাবের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করে নবাবেরই অপরাধী প্রজাদের কলকাতায় আশ্রয় দিয়ে নবাবকে অগ্রাহ্য করার প্রকৃষ্ট নমুনা কৃষ্ণদাসের ঘটনা। নবাব আলিবর্দি খানও এরকম অবৈধ ও বেআইনি আশ্রয়দানের জন্য কয়েকবার জোরালো প্রতিবাদ করেছিলেন।৩৬ কৃষ্ণদাসকে কলকাতায় আশ্রয়দানের পেছনে ইংরেজদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। কৃষ্ণদাস রাজবল্লভের পুত্র আর রাজবল্লভ ছিলেন ঢাকার নবাব নওয়াজিস মহম্মদের ঘনিষ্ঠ কর্মচারী এবং সে সুবাদে ঘসেটি বেগমের দলভুক্ত। রাজবল্লভের বিরুদ্ধে সরকারি তহবিল তছরুপের অভিযোগ ছিল এবং সেটা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। রাজবল্লভ ভয় পেয়ে ওয়াটসকে অনুরোধ করেন কৃষ্ণদাসকে কলকাতায় আশ্রয় দেওয়ার জন্য । ওয়াটসের ধারণা হয়েছিল ঘসেটি বেগমের দল, যার অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন কৃষ্ণদাসের পিতা রাজবল্লভ, মসনদ দখলের লড়াইয়ে নিশ্চিত সাফল্য লাভ করবে। তাই তিনি কলকাতার গভর্নর রজার ড্রেককে (Roger Drake) লেখেন কৃষ্ণদাসকে কলকাতায় আশ্রয় দিতে কারণ ‘রাজবল্লভকে ইংরেজদের কাজে লাগে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি লাগতে পারে’।৩৭ কৃষ্ণদাস সপরিবারে ৫৩ লক্ষ টাকার ধনরত্ন নিয়ে কলকাতায় আশ্রয় নেন আলিবর্দির মৃত্যুর বেশ কয়েকদিন আগে।৩৮ এরপরে কিন্তু ওয়াটস বুঝতে পারেন যে সিরাজদ্দৌল্লার নবাব হওয়া সম্বন্ধে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই এবং ড্রেককে লেখেন যে কৃষ্ণদাসকে এ অবস্থায় কলকাতায় রাখা মোটেই সমীচীন নয়। ড্রেক তাতে কর্ণপাতও করেননি।৩৯ কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দিয়ে ইংরেজরা শুধু নবাবের কর্তৃত্বকেই অমান্য ও অবজ্ঞা করেনি, মসনদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সিরাজের যে বিরোধী দল তার সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছিল। সুতরাং এটা পরিষ্কার যে নবাবের অপরাধী প্রজাদের অন্যায়ভাবে কলকাতায় আশ্রয়দানের জন্য ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজের যে অভিযোগ তা খুবই ন্যায়সঙ্গত।
সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে ইংরেজদের যে সংঘর্ষ এবং নবাবের কলকাতা আক্রমণের (জুন ১৭৫৬) আগের যে ঘটনাবলি তা বিশ্লেষণ করে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে কলকাতার ইংরেজদের কঠোর ও অনমনীয় মনোভাব এ সংঘর্ষকে অপরিহার্য করে তোলে। কোম্পানির কর্মচারীদের লেখা থেকেই আমাদের বক্তব্যের প্রচুর সমর্থন পাওয়া যাবে। এ সংঘর্ষ বাধার তিনদিন আগে পর্যন্ত সিরাজ কূটনৈতিক দৌত্যের মাধ্যমে একটা আপস মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর পাঠানো দূত নারায়ণ সিং ও খোজা ওয়াজিদের দৌত্য নিস্ফল হল মূলত গভর্নর ড্রেকের ‘যুদ্ধং দেহি’ মনোভাবের জন্য। ইংরেজদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য সিরাজ কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি অবরোধ করেন। ইংরেজরা আত্মসমর্পণ করার পর নবাব কলকাতা আক্রমণ ও দখল করেন।৪০ এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে বিশেষ করে নবাবের দূত নারায়ণ সিংকে কলকাতা থেকে বহিষ্কার করা নিয়ে, কোম্পানির কর্মচারী রিচার্ড বেচার যে মন্তব্য করেছেন, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:৪১
Could it be ever imagined any Prince would suffer a set of merchants to protect from him any of his subjects, much less a man who had enjoyed a considerable post under the government or would tamely put up with the insult to his messenger? …turning the messenger away will be construed an insult by the whole world.
.
অভ্যন্তরীণ ‘সংকট’
প্রাক্-পলাশি বাংলায় অভ্যন্তরীণ সংকট প্রসঙ্গে যে বক্তব্য তাঁর আলোচনা প্রয়োজন। প্রথমে রাজনৈতিক সংকট। সত্যিই কি এমন কোনও সংকট দেখা দিয়েছিল? আমাদের উত্তর, মোটেই না। সাধারণভাবে বলা হয় যে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় নিজামতের সঙ্গে ব্যবসায়ী/মহাজন শ্রেণি, ভূস্বামী ও অভিজাতবর্গের যে নতুন শ্রেণিবদ্ধতা গড়ে উঠেছিল তা সিরাজদ্দৌল্লার নবাব হওয়ার পরে একেবারে ভেঙে পড়ে কারণ তিনি তাঁর ব্যবহারে ওইসব শ্রেণির লোকজনদের তাঁর প্রতি বিরূপ করে তোলেন। এর ফলেই রাজনৈতিক সংকট। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এই শক্তিজোটকে একটি মজবুত ও সংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা বা একে একটি বিশিষ্ট শক্তিসংঘ হিসেবে গণ্য করা মোটেই ঠিক হবে না। এটি ছিল স্বার্থান্বেষী কিছু ব্যক্তির একটি জোট, যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নবাবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করেছিল—কোনও বিশেষ শ্রেণি বা গোষ্ঠীর জোট নয়। এটা মনে রাখা দরকার যে নিজামতের দিক থেকে উক্ত ব্যক্তিসমষ্টিকে (যা শ্রেণিনির্ভর নয়) ক্ষমতার অংশীদার করে নেবার কোনও সচেতন প্রচেষ্টা ছিল না। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় যে বড় বড় জমিদার বা বড় বড় ব্যাঙ্কার ও ব্যবসায়ীর উদ্ভব, তা নবাবদের এই উদ্দেশ্যে অনুসৃত কোনও নীতির ফল নয়— এটা মুর্শিদকুলির শাসনতান্ত্রিক ও রাজস্বনীতির সংস্কারের পরোক্ষ ফল। তা ছাড়া, এই তথাকথিত জোটবন্ধন একেবারেই শ্রেণিভিত্তিক নয়— ফলে এর কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছিল না। আবার এ শক্তিজোট একেবারে অখণ্ড এবং নিশ্ছিদ্র কোনও সংগঠনও নয়। বারে বারে তার মধ্যে ফাটল দেখা গেছে। তাই সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার পর ‘নতুন শ্রেণিগত জোটবদ্ধতা’ ভেঙে পড়েছিল এবং তাতে রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়, যার ফলে ইংরেজরা বাংলা বিজয়ে উদ্বুদ্ধ হয়— এ বক্তব্য খুব সমীচীন বলে মনে হয় না।৪২
