“এত স্বার্থপর হয়ো না। তুমি তোমার দেশের এক অমর কবি। দেশ তোমার কাছে কত আশা রাখে। তুমি কি জানো, তোমার এই ‘উর্বশী-বিয়োগ’ নাটকের কত খ্যাতি?”
“আমি তো কিছুই শুনিনি।”
“গত সপ্তাহে এক ব্যবসায়ী ভরূকচ্ছ (ভড়ৌচ) থেকে এখানে এসেছিল। ভরূকচ্ছে যবন নাগরিকেরা বহু সংখ্যায় বাস করে। আমরা সাকেতের যবনরা তো হিন্দু বনে গেছি, কিন্তু ভরূকচ্ছাবাসী যবনেরা আপন ভাষা বিস্মত হয়নি। যবন দেশগুলো থেকে ভরূকচ্ছতে ব্যবসায়ী এবং বিদ্বান ব্যক্তিদের আগমন হয়ে থাকে। আমার এই বন্ধুটি যবন-সাহিত্যে পণ্ডিত, সে তোমার এই নাটকের অনুলিপি পড়ে শ্রেষ্ঠ দুই যবন-নাট্যকার এমপীদোকল এবং য়ুরোপিদ্এর প্রতিভার সঙ্গে তোমার তুলনা করেছে। সে এই নাটকের অনুলিপি নিয়ে গেছে। ভরূকচ্ছ থেকে মিশরে অনবরতই জলপোত যাতায়াত করে। এইসব কথা যখন আমার কানে এল, তখন অসীম গর্বে আমার বুক ভরে উঠল।”
“তোমার হৃদয়ের এই গর্বটুকুই আমার জীবনসর্বস্ব,প্রভা!”
“তোমার নিজের মূল্য তুমি জানো না, কবি।”
“আমার এই মূল্যের উৎস তুমিই প্রভা! আর এখন তা আমার অজানা নেই।”
“না না, এটা উচিত নয়। প্রভার প্রেমিক অশ্বঘোষ আর মহান কবি অশ্বঘোষকে পৃথক দৃষ্টিতে দেখাই তোমার কর্তব্য। প্রভার প্রেমিক অশ্বঘোষের জন্য যা কিছু চাও কর, কিন্তু মহান কবিকে এর অনকে উর্ধ্বে উঠতে হবে, সমগ্র বিশ্বের দরবারে তার প্রতিভাকে ছড়িয়ে দিতে হবে।”
“তুমি যেমন বলবে আমি সেইভাবেই চলব প্রভা।”
“নিজেকে এত বড় সৌভাগ্যশালিনী রূপে কখনই কল্পনা করতে পারিনি।”
“কেন?”
“মনে হত, তুমি আমাকে ভুলে গিয়ে থাকবে।”
“এত সাধারণ ছিলে তুমি?”
“তোমার সামনে তাই ছিলাম, এখনও আছি।”
“তোমাকে দেখেই কবিতার এক নতুন উৎসের সন্ধান পেলাম আমি। আমার কবিতায় এখন নতুন প্রেরণা, নতুন আনন্দ। ‘উর্বশী-বিয়োগ’ গীত আর নাটক দুই-ই তোমার প্রেরণায় প্রাণবন্ত। নাটককে আমি স্বদেশের নিজস্ব বস্তুরূপে গড়ে তুলছি প্রভা! কিন্তু তুমি কেন ভাবলে যে, আমি তোমাকে ভুলে যাব?”
“কোনো দিক থেকেই আমি নিজেকে তোমার উপযুক্ত ভাবতে পারিনি। তারপর যখন তোমার গুণাবলীর পরিচয় পেলাম তখন তোমার আশা একবারেই ত্যাগ করলাম। সাকেতের সুন্দরীদের শুধু তোমার নামেই উণ্মাদ হয়ে উঠতে দেখতাম—এ থেকেও নিশ্চয়ই আশা করবার কিছু ছিল না। তা’ছাড়া শুনেছিলাম তুমি উচ্চ কুলের ব্রাহ্মণ। যদিও আমি ব্রাহ্মণকুলের পরবর্তী উচ্চকুলজাত যবন-রাজপুত্রের কন্যা, তবু যে ব্রাহ্মণকুল মাতা-পিতা থেকে সাত পুরুষ উর্ধ্ব পর্যন্ত সম্পর্কিতের খোঁজ-খবর না নিয়ে বিয়ে করে না তার কি করে আমাদের প্রেমকে স্বাগত জানাবে?”
“বড় দুঃখের বিষয় প্রভা, অশ্বঘোষ তোমায় এইভাবে ব্যথিত করে তুলেছিল।”
“তা’হলে তুমি…” প্রভা বলতে বলতে থেমে গেল।
প্রভার অশ্রুপূর্ণ নয়ন চুম্বন করে, তার কণ্ঠলগ্ণ হয়ে অশ্বঘোষ বলল, “ অশ্বঘোষ চিরদিন তোমরাই থাকবে প্রভা। তুমি আর তাকে পর ভাবতে পারবে না।”
প্রভার দুই চোখ বেয়ে টস্টস্করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল, আর অশ্বঘোষ তার কণ্ঠলগ্ন হয়ে সেই জল মুছিয়ে দিতে থাকল।
‘উর্বশী-বিয়োগ’ একাধিকবার অতি চমৎকারভাবে অভিনীত হল। সাকেতের সমস্ত সম্ভ্রান্ত নর-নারী এই নাটকের অভিনয় দেখল। এর আগে তারা কোনোদিন ভাবতেই পারেনি যে, নাট্যকলা এত পূর্ণ, অভিনয় এত উচ্চশ্র্রেণীর হতে পারে। শেষ দৃশ্যে যবনিকা পতনের পর কয়েকবারই অশ্বঘোষ মঞ্চে উঠে বলেছে, ‘আমি এই নাটকের সব কিছুই যবন রঙ্গমঞ্চ থেকে সংগ্রহ করেছি’, কিন্তু তার নাটক এতটা স্বদেশী প্রভাবাপন্ন ছিল যে, কেউই তার কোনোখানে বিদেশীয়ানার এতটুকুও গন্ধ পায়নি।
অশ্বঘোষের সংস্কৃত ও প্রাকৃত গীত এবং কবিতা সাকেত এবং কোশলের সীমা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছিল, কিন্তু নাটক ছড়িয়ে পড়ল আরও অনেক দূর পর্যন্ত। উজ্জয়িনী, দশপুর, সুপ্পারক, ভরূকচ্ছ, শাকলা (শিয়ালকোট), তক্ষশিলা, পাটলিপুত্র ইত্যাদি মহানগরীর যেখানে বহুল সংখ্যায় যবনরা বসবাস করত এবং তাদের নাট্যশালা ছিল সে সব জায়গায় অশ্বঘোষের নাটক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। রাজা-রাজড়া, ব্যবসায়ী সকলের দ্বারা সমানভাবে সমাদৃত হল সেইসব নাটক।
৫
রঙ্গমঞ্চে অশ্বঘোষের অভিনয় এবং যবন কন্যার সঙ্গে তার প্রেমের ব্যাপার অশ্বঘোষের পিতা-মাতার কাছে অজানা থাকবার কথা নয়। কথাটা শুনে অশ্বঘোষের পিতা রীতিমতো চিন্তিত হলেন এবং সুবর্ণক্ষীকেও বুঝিয়ে বললেন। মাতা যখন পুত্রকে বললেন যে, আমাদের ব্রাহ্মণকুলের পক্ষে এমন সম্বন্ধ করা অধর্ম, তখন ব্রাহ্মণ্যধর্মের সমগ্র শাস্ত্রে সুপণ্ডিত অশ্বঘোষ মাতাকে পুরাণ থেকের ঋষিদের আচরণের শত শত প্রমাণ দিল (যার থেকে কিছু অংশ পরে সে নিজের ‘বজ্রচ্ছেদিকা’র লিপিবদ্ধ করেছে—যা বজ্রদিকোপনিষদ্নামে উপনিষদগুলির মধ্যে অঙ্গীভূত হয়ে রয়েছে)।
সব শুনে মা বললেন, “এ সব ঠিকই বাবা, কিন্তু আজকের ব্রাহ্মণেরা এই পুরাণোক্ত আচরণকে মানতে চায় না।”
“তা’হলে ব্রাহ্মীপদের জন্য আমি এক নতুন সদাচার উপস্থিত করব।”
মা অশ্বঘোষের যুক্তিসমূহতের সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না, কিন্তু যখন সে বলে বসল যে, প্রভার আর আমার জীবন কখনও স্বতন্ত্র হয়ে থাকতে পারে না, তখন তিনি পুত্রের পক্ষে মত দিয়ে বললেন, “তুইই আমার যথাসর্বঙ্গ বাবা।”
