“তা’হলে আমরা তার অভিনয়ও করতে প্রস্তুত, কিন্তু পুরূরবার ভুমিকায় তোমাকেই অভিনয় করতে হবে।”
“আমার আপত্তি নেই, সামান্য অভ্যাস করলে তেমন মন্দ অভিনয় করব না।”
“আমরা চিত্রপটও তৈরী করিয়ে নেব।”
“চিত্রপটের ওপর আমাদের পুরূরবার দেশের দৃশ্য অঙ্কিত করতে হবে। চিত্র অঙ্কন আমিও কিছু কিছু করি। সময় পেলে আমিও সাহায্য করতে পারব।”
“তোমার নির্দেশ মতো দৃশ্যাঙ্কন করা হবে। পাত্র-পাত্রীর বেশভূষা সম্বন্ধেও তোমাকেই নির্দেশ দিতে হবে, সৌম্য!”
“আর পাত্র-পাত্রী নির্বাচন?”
“পাত্র-পাত্রী তো এখনই ঠিক করা যাবে না, সৌম্য! তবে তাদের সংখ্যা কম রাখতে হবে।”
“কত রাখা উচিত?”
“ষোলো থেকে কুড়ি জন আমরা অনায়াসে সংগ্রহ করতে পারবে।”
“আমি ষোলো পর্যন্তই রাখার চেষ্টা করব।”
“পুরূরবা তো তুমিই সাজবে, সৌম্য! আর উর্বশী-চরিত্র আমাদের প্রভাকে দিয়ে কেমন হবে? আজ তো তুমি আর অভিনয় দেখলে।”
“আমার অনভ্যস্ত চোখে নিখুঁত মনে হয়েছে অভিনয়।”
“তা’হলে প্রভাকেই উর্বশী হতে হবে। আমাদের দলে যাকে যে কাজ দেওয়া হবে তাকে তাই করতে হয়।”
প্রভার চোখ কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত হয়ে উঠেছিল, কিন্তু দলপতি তরুণের “কি প্রভা?” বলার পর প্রভা সংযত হয়ে জবাব দিল, “আচ্ছা।”
৪
অশ্বঘোষ, যবন-তরুণ বুদ্ধপ্রিয়ের সঙ্গে কয়েকটি যবন নাটকের প্রাকৃত রূপান্তর পড়ল এবং তাদের কলাকৌশল নিয়ে আলাপ-আলোচনা করল। যবন কলাবিদ্যাকে স্মরণীয় করে রাখবার জন্যে নাটকের চিত্রপট সমূহের সে নামকরণ করল যবনিকা। সংস্কৃত, প্রাকৃত,গদ্যপদ্য দু’রকমভাবেই লিখল সে। এই সময় প্রাকৃত ও সংস্কৃতের এতটা আবেদন ছিল যে, সম্ভান্ত্র পরিবারগুলোতে তা অনায়াসবোধ্য ছিল। এই ‘উর্বশী-বিয়োগ’ হল প্রথম ভারতীয় নাটক এবং অশ্বঘোষ প্রথম ভারতীয় নাট্যকার। এটাই কবির প্রথম প্রয়াস, তবু তা পরবর্তী ‘রাষ্ট্রপাল’, ‘সারিপুত্ত’ ইত্যাদি নাটক থেকে কম সুন্দর হয়নি।
রঙ্গমঞ্চ তৈরীর সময়, অভিনয় অভ্যাসকালে খাওয়া-দাওয়ার কথাও মনে থাকত না তরুণ কবির। এই সময়গুলোই সে জীবনের সুন্দরতম সময় বলে মনে করত। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রভা আর সে পরস্পরের সঙ্গ লাভ করত। সাঁতারের প্রতিযোগিতার দিন তাদের হৃদয়ে যে প্রেমবীজ রোপিত হয়েছিল এখন তাই অঙ্কৃরিত হতে থাকল ধীরে ধীরে। যবন তরুণ-তরুণীর অশ্বঘোষকে আত্মীয়র মতোই দেখত কাজেই এ ব্যাপারে সহায়ক হওয়াই তারা সৌভাগ্য মনে করত। একদিন অশ্বঘোষ নাট্যশালার বাইরে অবস্থিত ক্ষুদ্র উদ্যানে এসে একটা আসনের ওপরে বসল। এই সময়ে প্রভাও সেখানে এসে হাজির হল। প্রভা তার স্বাভাবিক মধুর কণ্ঠে বলল, “উর্বশী-বিয়োগ’ রচনা করবার সময় তোমার মনে কি ছিল কবি?”
“উর্বশী আর পুরূরবার কাহিনী।”
“কাহিনী তো আমিও জানি, কিন্তু উর্বশীকে অপ্সরা রূপে তুমি বার-বার সম্বোধন করছিলে কেন!”
“উর্বশী যে অপ্সরাই ছিল, প্রভা!”
“তা ছাড়া তুমি উর্বশীর বিয়োগের পর নদী, সরোবর, পর্বত, বন সব জায়গাতে পুরূরবাকে বিহ্বল অণ্বেষণকারীরূপে চিত্রিত করেছ।”
“পুরূবাকে ঐ অবস্থায় ওটাই স্বাভাবিক ছিল।”
“সব শেষে ‘উর্বশী-বিয়োগ’-এর গায়ক লতাকুঞ্জে বসে অশ্রুধারাকে বীণার মতো গীতসঙ্গী করে নিয়েছিল কেন?”
“গায়ক ও অভিনেতার এমনি তন্ময়ভাবে এসে যাওয়াই স্বাভাবিক,প্রভা!”
“উহু,তুমি আমাকে সত্যি কথাটাই বলতে চাইছ না।”
“কেন? তোমান কি মনে হয়?”
“আমার মনে হয়, তুমি পুরাণের কোনো উর্বশীর গান রচনা করনি।”
“তবে?”
“তোমার উর্বশী হচ্ছে—উর-বশী (হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী), আর সেই অপ্সরা ছিল—অপ অর্থাৎ সরযূর জল, সরা অর্থে সন্তরণকারিণী।”
“তারপর?”
“তোমার উর্বশীকে পুরূরবা হিমালয়ের মতো পর্বত বা কোনো বনভূমি, নদী, সরোবর, এ সব খুঁজে ফেরেনি, তোমার পুরূরবা উর্বশীকে খুঁজে ফিরছিল সাকেতের সরষু নদীতে, পুষ্পোদ্যানের ভিতরকার সরোবর, আর লতাগুল্মের ভিতরে।”
“তারপর?”
“পুরাণোল্লিখিত কোনো পুরূরবার দুঃখে বিগলিত হয়ে তোমার চোখের জল ঝরেনি, জল ঝরেছিল তোমার নিজেরই তপ্ত হৃদয়কে শান্ত করতে।”
“এ-বারে আমিও একটা কথা বলব প্রভা?”
“বল, এতক্ষণ তো আমিই অনর্গল বকে গেলাম।”
“সেদিন লতাকুঞ্জ থেকে বেরিয়ে আসবার সময় আমি তোমার এই মনোহর নীল নয়ন দুটি আমার চেয়েও আরক্ত এবং সিক্ত দেখেছিলাম।”
“তোমার গান দিয়ে আমাকে কাঁদিয়েছিলে কবি।”
“আর তোমার বিরহ দিয়ে আমাকে গীত রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।”
“কিন্তু কবি, তোমার গানের উর্বশী ছিল পাষাণী! অন্তত তুমি সেইভাবেই তাকে চিত্রিত করেছিল।”
“তার কারণ, আমি নিরাশ হয়ে পড়েছিলাম।”
“কি ভেবে?”
“আমার মনে হয়েছিল এই অচিরপ্রভাকে (বিদ্যুৎ) আমি আর কখনও দেখবার সৌভাগ্য লাভ করব না—সে কবেই হয়ত ভুলে গেছে আমাকে।”
“তুমি এতটা নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলে কবি?”
“যতক্ষণ পর্যন্ত আত্মবিশ্বাসের অন্য কোনো অবলম্বন না পাওয়া যায়, ততক্ষণ নিজেকে নিঃস্ব ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় না প্রভা।”
“তুমি শুধু সাকেতেরই নও, এই বিস্তৃত ভূখণ্ডের মহিমান্বিত কবি। সাকেতের সন্তরণ প্রতিযোগিতায় বিজেতা বীর তুমি। তোমার বিদ্যার খ্যাতি সাকেতবাসীর মুখে মুখে। আর তোমার সম্পর্কে তরুণীদের মনোভাব বলতে গেলে বলতে হয়, সাকেতের সুন্দরীগণ তোমাকে চোখের মণি করে রাখতে চায়।”
“কিন্তু ও সবে কি হবে? আমার কাছে আমার উর্বশীই সবটুকু। সেই সন্তরণ প্রতিযোগিতার পর যখন দু’সপ্তাহ তার দখো পেলাম না, তখন আমার মনে হতে লাগল যেন এ জীবনের কোনো মূল্য নেই। সত্যি বলছি, আমার হৃদয়কে এত দুর্বল হয়ে পড়তে আর কখনও দেখিনি। আর িএক সপ্তাহ যদি তোমাকে দেখতে না পেতাম হা’হলে কি যে করে বসতাম বলতে পারি না।”
