অশ্বঘোষ একদিন প্রভাকে মা’র কাছে পাঠিয়ে দিল। মার তার রূপ আর গুণের পরিচয় পেয়ে এবং তার বিনম্র স্বভাবে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে আশীর্বাদ করলেন। কিন্তু অশ্বঘোষের পিতা একে স্বীকার করে নিতে পারছিলেন না।
তিনি একদিন অশ্বঘোষকে ডেকে বললেন, ‘পুত্র, আমাদের শ্রোত্রিয়দের শ্রেষ্ঠ হল ব্রাহ্মণকুল। পঞ্চাশ পুরুষ থেকে শুধু কুলীন ব্রাহ্মণ কন্যারাই আমাদের ঘরে বধূ রূপে আসছে। আজ যদি তুমি প্রভাকে বিবাহ কর তো আমরা এবং পরবর্তী বংশধরেরা চিরকালের জন্য সমাজে জাতিভ্রষ্ট হয়ে থাকব।”
অশ্বঘোষের পক্ষে প্রভাকে ত্যাগ করা একেবারেই অচিস্ত্যনীয় ব্যাপার বুঝে অশ্বঘোষের পিতা প্রভার পিতামাতার কাছে গিয়ে অনুনয়-বিনয় করলেন, কিন্তু তাঁদের কিছুই করবার ছিল না। পরিশেষে তিনি প্রভার কাছেই তাঁদ নিবেদন পেশ করলেন। প্রভা বলল,“আমি অশ্বঘোষের কাছে আপনার কথা বলব।”
৬
প্রভা আর অশ্বঘোষ পরস্পরের অভিন্ন সাথী। কি সরযূতীর, কি পুষ্পোদ্যান, কি নৃত্যশালা-নাট্যশালা, কিম্বা অপর কোনো জায়গায় একজন থাকলে আর একজনও থাকবেই। সূর্যের প্রভার মতোই প্রভা অশ্বঘোষের হৃদয়-পদ্মকে বিকাশিত কররে রেখেছে। রূপালী চাঁদের আলোয় প্রায়ই তারা সরষূতীরে যেত। সেকানে তারা জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করত। এমনি এক জ্যোৎস্নালোকে একদিন সরষুর কালো জলের ধারে শ্বেত শিলাসনে বসে অশ্বঘোষ আপন আনসপটে প্রভার চিত্র অঙ্কন করছিল। তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “প্রভা তুমিই আমার কবিতা, তোমারই প্রেরণা পেয়ে আমি ‘উর্বশী-বিয়োগ’ লিখেছি। তোমার রূপরাশি আমাকে বহু সুন্দর কাব্য রচানায় উদ্বদ্বু করবে। কবিতা হল অন্তরের অভিব্যক্তি, বাইরের জিনিস নয়; কিন্তু বাইরের অভিব্যক্তিই যে অন্তরে বিকাশিত হয় এ তত্ত্ব তুমিই আমাকে শিখিয়েছ।”
অশ্বঘোষের কথা শুনতে শুনতে প্রভা সেই শীতল শিলাসনের ওপর শুয়ে পড়ল। অশ্বঘোষ সযন্তে তার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। ওপর দিকে তাকিয়ে আয়ত দৃষ্টি মেলে প্রভা অশ্বঘোষের শ্রীমণ্ডিত মুখখানা দেখতে লাগল। অশ্বঘোষের কথা শেষ হলে প্রভা বলল,“তোমার সব কথাই আমি মেনে নিতে রাজি। সাকার-সৌন্দর্য থেকে প্রেরণা না পেলে কাব্য কখনও পূর্ণ রূপে বিকাশিত হতে পারে না। আমি তোমার কাব্যের মূর্তিময় প্রকাশ, আবার আমিই বিকাশিত করছি তোমার অন্তরের কাব্যরূপকে। কিন্তু কবিতা তো শুধু আমার সৌন্দর্যের কথা নয়। সে দিন আমি বলেছিলাম, তোমার ভিতরে দু’জন অশ্বঘোষকেই উপলিদ্ধ করতে হবে। আবার দুয়ের মধ্যে মহান যুগকবি অশ্বঘোষকেই মূখ্য হয়ে উঠতে হবে। কারণ, সে শুধু একটি ব্যক্তির নয়, সমগ্র বিশ্বজনের সে প্রতিনিধি। কালকারামের সেই বিদ্বান ভিক্ষুর কথা মনে আছে? পরশু যাঁকে’ আমরা দু’জনে দেখতে গিয়েছিলাম?”
“অদ্ভুত মেধাবী মনে হয় তাঁকে।”
“ঠিকই, আর বহু দেশও ঘুরেছেন। তাঁর জম্ম মিশরের সেকেন্দ্রিয়া নগরে।”
“তা আমি শুনেছি; কিন্তু একটা কথা আমি বুঝতে পারি না প্রভা, যবনরা কেন বৌদ্ধধর্মকে মেনে চলে!
“কারণ, ব্যেদ্ধধর্ম যবনদের স্বতন্ত্র প্রকৃতি এবং স্বাধীন মনোবৃত্তির অনুকূল।”
“কিন্তু বৌদ্ধধর্ম তো সকলকেই বৈরাগী, তপস্বী এবং ভিক্ষুতে পরিণত করে!”
“বৌদ্ধদের মধ্যে গৃহী অপেক্ষা ভিক্ষুর সংখ্যা অনেক কম এবং বৌদ্ধ গৃহী গার্হস্থ্য জীবরনর রসগ্রহণে কারও অপেক্ষাই পশ্চাৎপদ নয়।”
“এই দেশে আরও কত ধর্ম প্রচলিত রয়েছে, বৌদ্ধধর্মের প্রতিই যবনদের এত পক্ষপাতিত্ব কেন? এ কথাও ঠিক বুঝতে পারি না।”
“এখানে বৌদ্ধর্মই সবচেয়ে উদার। আমাদের পূর্বজগণ যখন ভারতে এল, তখন সকলেই ম্লেচ্ছ বলে তাদের ঘৃণা করত। আমি কিন্তু আক্রমণকারী যবনদের কথা বলছি না, এখানে যারা বসতি স্থাপনকল্পে এসেছিল বা ব্যব্সার সূত্রে যাতায়াত করত, তাদের সম্বদ্ধেও এই মনোভাব ছিল। কিন্তু বৌদ্ধরা তাদের মোটেই ঘৃণা করত না। যবনেরা বস্তুত নিজ দেশেও বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পৌত্র অশোকের সময় বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু যবনদের ভিতর ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের ধর্মরক্ষিত এ দেশে এসে ভিক্ষু হননি, মিশরের বিহারেই তিনি ভিক্ষু হয়েছিলেন।”
“আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই প্রভা।”
“নিশ্চয়ই দেখা করবে। তিনি তোমাকে আরও গভীর দার্শনিক তত্ত্ব বলতে পারবেন শুধু বৌদ্ধধর্মের সম্বন্ধেই নয়, যবন-দর্শন সম্বন্ধেও।”
“যবনদের ভিতরও দার্শনিক রয়েছেন?”
“অনেক মহান দার্শনিক আছেন, যাঁদের বিষয়ে ভদন্ত ধর্মরক্ষিত তোমাকে বলতে পারবেন। কিন্তু বৌদ্ধ-দর্শনের কথা শুনে প্রভার প্রতি যেন তোমার বৈরাগ্য না আসে প্রিয়তম।” –এই বলে প্রভা আপনর বাহুপাশে অশ্বঘোষকে বেধেঁ ফেলল।
“কালকারামের কিচু কিছু কথা আমার কাছেও খুব আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। ভাবছিলাম , যদি আমাদের সমগ্র দেশ কালকারামের মতো হত?”
প্রভা বলল, “না প্রিয়তম, আমাকে ছেড়ে তুমি কালকারামে চলে যেও না।”
“প্রাণ থাকতে তোমাকে ছেড়ে যবন ধর্মরক্ষিত, পারশী সুমনের দেশ-দেশান্তরের বিদ্বান ভিক্ষু বাস করেন আর আমাদের দেশের ব্রাক্ষণ থেকে চন্ডাল পর্যন্ত সমস্ত কুলের ভিক্ষুরাও বাস করেন। সবাই এক সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া । করেন, এক সঙ্গেই জ্ঞানার্জনে সমাবিষ্ট হন। কালকারামের সেই কৃষ্ণবর্ণ বৃদ্ধ ভিক্ষুর নাম কি প্রভা?”
