নগরোদ্যানে গিয়ে বিশেষ সম্মানের সঙ্গে সকলের কাছে এই দুই প্র্রতিযোগীর পরিচয় দেওয়া হল, এবং দু’জন লজ্জাবনত মুখে পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হল।
৩
সাকেতের পুষ্পোদ্যান ছিল পুষ্যমিত্রের শাসনের স্মারক। এর র্নিমাণ কাজে সেনাপতি প্রচুর অর্থ এবং শ্রম নিয়োগ করেছিলেন। যদিও এখন পুষ্যমিত্র বংশের শাসন আর নেই, সাকেতও অন্য কোনো রাজার রাজধানীতে পরিণত হয়নি, তবু নিগমকে (নগর-সভা) সাকেতের গৌরব মনে সুরক্ষিত করে রাখা হয়েছে, যেমন রাখা ছিল দুশ’বছর আগের পুষ্যমিত্রের শাসনকাল। উদ্যানের মধ্যস্থলে এক পুষ্করিণী। পুষ্করিণীয় স্বচ্ছ নীল জলে নানা বর্ণের পদ্ম ফুটে থাকত এবং হংসমিখুনের দল সাঁতার কেটে ফিরত, চারিদিকে শ্বেতপাথরের বাঁধানো ঘাট যায় সোপানশ্রেণী স্ফাটকের মতোই স্বচ্ছ। সরোবরের ধার ঘেঁষে সবুজ দূর্বাচ্ছাদিত প্রশস্ত তটভুমি। এর ওপর কোথাও গোলাপ, জুঁই, বেল ইত্যাদি ফুলের কেয়ারি, আবার কোথাও তমাল, বকুল, অশোক বৃক্ষের ছায়া। আবার কোথাও বা লতাগুল্মে ঘেরা কুমার-কুমারীগণের ক্রীড়াক্ষেত্র। উদ্যান মধ্যে মাটি, পাথর আর সবুজে আচ্ছাদিত কয়েকটি মনোরম পাহাড়। উদ্যানের কোনো কোনো জায়গায় ফোয়ারা থেকে ঝরণা-ধারায় জল উৎসারিত হচ্ছে।
অপরাহ্ণে এক লতাগুল্মের কাছে সাকেতের তরুণ-তরূণীদিগের ভিড়, কিন্তু চারিদিকে নীরবতা। সকলেই লতাগুল্মের দিকে কান পেতে ছিল, আর লতাগুল্মের ভিতরে শিলাচ্ছাতিদ আসনে বসে সেই তরুণ, এক মাস আগে সন্তরণ প্রতিযোগিতায় যে এক তরুণীর সঙ্গে যুগ্মবিজয়ী হয়েছিল। তার দেহে মস্বণ সুক্ষ্ম কাপড়েরর পোশাক, দীর্ঘ পিঙ্হল কেশরাশি মাথায় জটার আকারে বাঁধা, হাতে বীণা—তরুণের আঙ্গুল স্বচ্ছন্দ গতিতে মনোহর সুর সৃষ্টি করে চলেছে। অর্ধনুদ্রিত নয়নে স্বরচিত গীত গেয়ে গাওয়ার তাগিদ ছিল, কারণ গায়ক-কবি জানে, তার শ্রোতাদের মধ্যে প্রাকৃত প্রেমিকের সংখ্যাই বেশী। কবি নিজের নবরচিত ‘উর্বশী-বিয়োগ’ গেয়ে শোনাল—উর্বশী লয়প্রাপ্ত হয়ে গেল আর পুরুরবা উর্বশীকে আপ্সরা (জলবিহারিণী) বলে ডাকতে ডাকতে পর্বত, সরোবর, বন, সকল জায়গায় খুঁজে ফিরতে লাগল। অপ্সরার দর্শন সে পেল না, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর বাতাসে ভেসে এল। গানে পুরুরবার অশ্রুবর্ষণের সময় গায়কেরও চোখের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল এবং সমগ্র শ্রোতুমণ্ডলী ও অভিভূত হয়ে পড়ল সেই গান শুনে।
সঙ্গীত শেষ হবার পর এক এক করে সবাই চলে যেত লাগল। অশ্বঘোষ বাইরে এলে কিছু তরুণ-তরুণী তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তার মধ্যে আর্ট্র আরক্ত-নয়না প্রভাও ছিল। একজন তরুণ এগিয়ে এসে বলল, “মহাকবি!”
“মহাকবি! আমি যে কবিই নই সৌম্য!’
“আমাকে আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করতে দাও কবি। সাকেতে আমাদের যবনদের একটি ছোট নাট্যশালা রয়েছে।”
“নাচের জন্য? আমারও নাচের সখ আছে।”
“নাচের জন্যেই শুধু নয়, ওখানে আমরা অভিনয়ও করে থাকি।”
“অভিনয়!”
“হ্যাঁ কবি, কিন্তু যবন-রীতির অভিনয়ে এক বিশেষত্ব আছে। তাদের অভিনয়ে বিভিন্ন স্থান-কালের পরিচায়ক বড় বড় চিত্রপট থাকে, আর সমস্ত ঘটনাকেই বাস্তবের রুপে দেখাবার চেষ্টা করা হয়।”
“কি পরিতাপের কথা, সৌম্য! সাকেতে জন্মগ্রণণ করেও আমি এমন অভিনয় এখনও দেখলাম না!”
“আমাদের অভিনয়ের দর্শক এখানকার যবন-পরিবার এবং কিছু ইষ্ট মিত্র—এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ, এ জন্য বহু সাকেতবাসী যবন-অভিনয়…..”
“নাটক বলা উচিত, সৌম্য!”
“হ্যাঁ, যবন-নাটক। আজ আমরা এক নাটক মঞ্চস্থ করব। আমাদের ইচ্ছা তুমিও আমাদের নাটক দেখ।”
“নিশ্চয়ই। তোমাদের মতো মিত্রগুলীর অসীম অনুগ্রহ।”
অশ্বঘোষ ওদের সঙ্গে চলল। নাট্যশালায় মঞ্চের কাছে তাকে বসতে দেওয়া হল। অভিনয় হচ্ছিল কোনো এক যবন বিয়োগান্ত নাটক প্রাকৃত ভাষায়, যবন কুলপুত্র-পুত্রীগণ বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছিল। অভিনেতা এবং অভিনেত্রীগণের পোষাক-পরিচ্ছদও ছিল যবন-দেশীয়দের মতো। বিভিন্ন দৃশ্যপট যবনরীতি অনুযায়ী অঙ্কিত ছিল। নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করছিল অশ্বঘোষের পরিচিতা প্রভা। তার অভিনয় কৌশল দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল সে। অভিনয়ের মাঝে বিরতির সময় পূর্বপরিচিত যবন তরুণ ‘উর্বশী-বিয়োগ’ গানের অনুরোধ জানাল। কোনো রকম আপত্তি না করে বীণা হাতে অশ্বঘোষ রঙ্গমঞ্চের ওপর উঠে এল। তারপর স্বরচিতা গানের গভীরতায় নিজে কাঁদল অপরকেও কাঁদাল। নাটক শেষ হয়ে যাবার পর সমস্ত অভিনেতা, কুমার-কুমারীদের সঙ্গে কবির পরিচয় করানো হল। অশ্বঘোষ বলল, “সাকেতে থেকেও আমি এই অনুপম বলা সম্বন্ধে অজ্ঞ রয়ে গেছি। মিত্রমণ্ডলীর কাছে আমি অসীম কৃতজ্ঞ যে, তোমরা আমাকে এক অজ্ঞাত প্রভালোক দর্শন করালে।”
‘প্রভালোক’ কথাটি উচ্চারণ করার সময় কয়েকজন-তরুণী প্রভার দিকে তাকিয়ে মুখে টিপে হাসল। অশ্বঘোষ পুনরায় বলল, “আমার একটা কথা মনে হচ্ছে। তোমরা যেমন আজ যবন-নাটকের প্রাকৃত রূপান্তর অভিনয় করলে—মনে হয়, চেষ্টা করলে আমরা স্বদেশের কথা নিয়ে চমৎকার নাটক চরনা করতে পারি।”
“আমাদেরও পূর্ণ আস্থা আছে কবি, তুমি ইচ্ছা করলে মুল যবন-নাটক থেকেও ভালো নাটক রচনা করতে পার।”
“এতটা বল না, সৌম্য! যবন-নাট্যকারদের শিষ্য হওয়ার যোগ্যতাই যথেষ্ট, আমি তাই চেষ্টা করব। আচ্ছা আমি যদি ‘উর্বশী-বিয়োগ’ নিয়ে নাটক লিখি?”
