সেনাপতি পুষ্যমিত্র আপন প্রভুকে হত্যা করে সমগ্র মৌর্য সাম্রাজ্যকে অধিকার করতে সমর্থ হয়নি। সারা পাঞ্জাব যবনরাজ মিনান্দরের দখলে চলে গেল; এবং পুষ্যমিত্রের পুরোহিত ব্রাহ্মণ পতঞ্জলি-পুষ্যমিত্রের সময়ে এই নগরের নাম সাকেতই ছিল—অযোধ্যা নয়।
পুষ্যমিত্র, পতঞ্জলি এবং মিনান্দরের সময় থেকে আমরা আরও দুশ’বছর পিছিয়ে আসছি। এই সময়েও সাকেতে বড় বড় শ্রেষ্ঠী বসবাস করত। লক্ষ্মীর বসতি ফলে সরস্বতীরও অল্পবিস্তর আগমন হতে লাগল এবং ধর্ম ও ব্রাহ্মণেরা স্বভাবতঃই এসে পড়ল। এইসব ব্রাহ্মণদের মধ্যে ধন-বিদ্যা সম্পন্ন একটি কুল ছিল। এই কুলাধিপতির নাম মুছে গিয়েছে কালের প্রবাহে, কিন্তু কুলাধিপত্মীর নাম অমর করে রেখেছে তার পুত্র। এই ব্রাহ্মণীর নাম সুবর্ণাক্ষী, তার চোখ ছিল সোনার মতো কাঁচাহলুদ রঙ-এর। তৎকালে কাঁচাহলুদ রঙ বা নীল রঙ-এর চোখ সারা ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় জাতের মধ্যেই দেখতে পাওয়া যেত। কাঁচাহলুদ রঙ-এর চোখ থাকা কোন দোষের ছিল না। ব্রাহ্মণী সুবর্ণাক্ষীর এক পুত্র তার মতোই সুবর্ণনেত্র এবং পিঙ্গল কেশধারী ছিল। তার গায়ের রঙ ছিল মায়ের মতোই সুগৌর।
২
সময়টা বসন্তকাল। আমের মঞ্জরী চারিদিকে আপন সুগন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। বৃক্ষরাজি পুরনো পত্রসমূহ ত্যাগ করে নতুন পত্রাবলীতে ভূষিত হয়েছে। চৈত্রের শুক্লানবমী তিথি। সাকেতের নর-নারী সন্তরণ প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে সাকেতবাসীরা বসন্তোৎসব পালন করে। এই সাঁতার প্রতিযোগতিরায় তরুণ-তরুণী উভয়েই একঘাটে নগ্নদেহে অংশগ্রহণ করে। তরুণীদের মধ্যে বহুসংখ্যক কর্পূরশ্বেত যবনী (গ্রীক-নারী) ছিল, যাদের সুন্দর-সুডৌল দেহ যবন শিল্পীর নির্মিত অনুপম মর্মর মূর্তির অনুরূপ।
আর ছিল সোনালী বা পীত কেশধারিণী সুবর্ণাক্ষী ব্রাক্ষণকুমারীগণ, সৌন্দর্যের দিক থেকে তারা যবনীদের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। এ ছাড়া ছিল ভ্রমরকৃষ্ণ কেশবিশিষ্টা ধূসরবর্ণা বহুসংখ্যক বৈশ্য তরুণী, তাদের তারুণ্যের মাদকতাও কম আকর্ষণীয় ছিল না। আজকের দিনে সাকেতের প্রতিটি কোণ থেকে কৌমার্যরুপরাশি সরযুতীর এসে উপস্থিত হয়েছে। তরুণীদের মতো নানা কুলের তরুণেরাও গাত্রাবরণ উম্মেচন করে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়বাড় জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। তাদের ব্যায়ামপুষ্ট সুডৌল সুন্দর দেহ কর্পূরশ্বেত, ধূসর প্রভূতি বিভিন্ন রঙের। তরুণ-তরুণীদের সৌন্দর্য উপভোগ করবার জন্য আজকের এই প্রতিযোগিতা মহোৎসবের চেয়ে বড় আর কোনো উৎসবেরই অনুষ্ঠান হত না। প্রতি বছর এই উৎসবের ভিতর দিয়ে কতজনেই না স্বয়স্বরা হয়ে উঠত। বাপ মায়েরা এ বিষয়ে তরুণ-তরুণীদের উৎসাহিতই করতেন। তখনকার দিনে এটাই ছিল সর্বজনমান্য শিষ্টাচার।
নৌকা থেকে প্রতিযোগী তরুণ-তরুণীরা সরযূর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সরষূর নীল জলে কেশরাশিকে জলের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে দু’হাতে জল কেটে কেটে এগিয়ে যেত লাগল। এদের কাছে কাছে থেকে বহু ক্ষুদ্র নৌকা চলছে। নৌকার আরোহীরা প্রতিযোগী তরুণ-তরুণীদের উৎসাহ দিচ্ছে বা কেউ ক্লান্ত হয়ে পড়লে তাকে নৌকায় তুলে নিচ্ছে।
হাজার হাজার সন্তরণকারীর মধ্যে কারও পক্ষে ক্লান্ত হয়ে হার স্বীকার করাই স্বাভাবিক ছিল। সকল প্রতিযোগীই সর্বোগ্রে যাবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছিল। নদীতটে পৌঁছাবার যখন কিছুটা বাকী, তখন বহু প্রতিযোগীই শিথিল হয়ে পড়তে লাগল। পিঙ্গল এবং পাণ্ডুশ্বেতকেশী দু’জনেই সকলের আগে গিয়ে সমগতিতে পাশাপাশি চলতে আরম্ভ করেছে। তীরের দিকে আরও এগিয়ে গেল তারা-সকলেই ভাবছিল, এদের ভেতর থেকে কেউ একজন আগে বেরিয়ে যাবে; কিন্তু দেখল দু’জনেই গতিই সমান। নৌকা-রোহীদের মধ্যে কেউ কেউ এ-ও শুনল যে, ওদের মধ্যে একজন অপরকে আগে যাবার জন্য উৎসাহ দিচ্ছে।
দু’জনে এক সঙ্গেই তীরে এসে পৌঁছাল। এদের মধ্যে একজন তরুণ, অপরটি তরুণী। উপস্থিত সকলেই হর্ষধ্বনি করে অভিনন্দন জানাল। ওরা দু’জন আপন আপন পোশাক পরে নিল। দর্শকরা সোৎসাহে পুষ্পবর্ষণ করেছে, তরুণ-তরুণী দু’জন পরস্পরকে কাছ থেকে দেখছিল। উপস্থিত সকলে তাদের শুধু সন্তরণ কৌশলেরই নয়, সৌন্দর্যেরও প্রশংসা করতে লাগল।
কে একজন প্রশ্ন করল,“কুমারীকে তো আমি চিনি, কিন্তু কে এই তরুণ সৌম্য?”
“সুবর্ণাক্ষীপুত্র অশ্বঘোষের নাম শোনোনি?”
“না, আমি নিজেদের পুরোহিত কুলকেই শুধু জানি। আমরা হলাম ব্যবসায়ী, এত খবর রাখবার ফুরসৎ কোথায়?”
তৃতীয়, জন বলল,“আরে সাকেত থেকে অশ্বঘোষের বিদ্যার খ্যাতি দূর-দূরান্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, সমস্ত বেদ এবং সকল বিদ্যাতেই পারদর্শী।”
প্রথম, “কিন্তু ওর বয়স তো চব্বিশের বেশী হবে না।”
তৃতীয়,“হ্যাঁ, ওই রকম হবে। এর কবিতা লোকে সুর করে পড়ে আর গায়।’
দ্বিতীয়, জন জিজ্ঞেস করল,“এই কি সেই কবি অশ্বঘোঘ, যার প্রেমগীতি আমাদের তরুণ-তরুণীদের মুখে মুখে ফেরে?”
তৃতীয়,“হ্যাঁ, এই সেই অশ্বঘোষ। কিন্তু কুমারীর কি নাম সৌম্য?”
প্রথম, “সাকেতে আমাদের যবন-কুল-প্রমূখ এবং কোশলের বিখ্যাত ব্যবসায়ী দত্তমিত্রের পুত্রী প্রভা।”
দ্বিতীয়,“তাই বল! এ রকম সৌন্দর্য খুব কমই দেখা যায়। দেহের গড়নে কত কোমল মনে হয়, অথচ সাঁতার কি পটু!”
প্রথম,“এর মা-বাপ দু’জনেরই চমৎকার স্বাস্থ্য, দু’জনেরই বেশ বলিষ্ঠ দেহ।”
