“তোমার মনে করাটা ঠিকই নাগ!”
“তা’হলে তোমার প্রিয়তমকে এখানে নিমন্ত্রণ করবার কিংবা যদি সে এখানে না আসতে পারে তবে সেখানে গিয়ে দেখা করবার অনুমিত আমাকে দাও।”
“কিন্তু, তুমি এতটা উতলা হচ্ছ কেন?”
“সত্যিই কি আমি অস্থির হচ্ছি? তুমি ভূল বলছ না?” নাগদত্ত নিজেকে সামলিয়ে নিতে চেষ্টা করল।
সোফিয়ার ভয় হতে লাগল যে পাছে সে অশ্রু সম্বরণ করতে না পারে। সে অন্যদিকে মুখফিরিয়ে বলল, “দেখা করতে পার কিন্তু তোমাকে এথেন্সের তরুণের বেশ ধারণ করতে হবে।”
“বেশ, কাল তুমি যে নতুন স্যাণ্ডেল কিনে এনেছআমি তা পরে নেব।”
“যাও, পরে এস, ইতিমধ্যে আমি আমার প্রিয়তমের জন্য মালা নিয়ে নিচ্ছি—লিদিয়া তার জন্যে মালা গাঁথছে।”
“বেশ”—বলে নাগদত্ত অন্য ঘরে চলে গেল। সোফিয়া বৈঠকখানার বড় আয়নার সামনে দাঁঢ়াল। সে নিজের কাপড় এবং ফুলে ভূষণের ওপর একবার হত বুলাল, আর একগাছা মালা আয়নার পিছনে রেখে আস্তে করে ঘরের দরজায় গিয়ে বলল,“নাগ! দেরী হয়ে যাচ্ছে, আমার প্রিয়তম আবার কোনো প্রমোদশালায় চলে না যায়!”
“তাড়াতাড়ি করছি সোফী?”
“আমি সাহায্য করব?”
“সে তোমার দয়া।”
নাগদত্ত নতুন স্যান্ডেল পরল। নাগদত্তের মুখের দিকে চাইতে সোফিয়ার সাহস হল না। সে তার হাত ধরে বলল,“ প্রথমে আয়নায় নিজের নতুন পোশাক দেখে নাও।”
“তুমি তো দেখে দিয়েছ সোফী! সেটাই ভালো। বিনীত পোশাকই প্রয়োজন।”
“হ্যাঁ, আমার তো বিনীত-পোশাক বলেই মনে হচ্ছে কিন্তু একবার দেখে নেওয়াটা মন্দ নয়।” সোফিয়া নাগদত্তকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল, নাগদত্ত তার নিজের পোশাক দেখতে লাগল। তখন সোফিয়া মালা বের করে বলল, “এ মালা ইম প্রিয়তমের জন্য তৈরী করেছি।”
“বেশ সুন্দর মালা সোফী!”
“জানি না, তার কি রকম লাগবে—তার দূসর চুলে লাল টুকটুকে গোলাপ মালা।”
“সুন্দর দেখবে।”
“তোমার মাথার ওপর রেখে একটু দেখব?”
“সেটা তোমার ইচ্ছা। আমারও চুল ধূসর।”
“তাই তো পরীক্ষা করে নিতে চাই।” মালা নাগদত্তের মাথার ওপর রেখে তাকে জিজ্ঞাসা করল,“তা’হলে তুমি আজ আমার প্রিয়তমকে দেখতে চাও নাগ? এখুনি দেখতে চাও তো এই দেখ।”
আয়নায় নাগদত্তের প্রতিবিম্ব পড়ল। সোফিয়া জলভরা চোখে বলল, “এই আমার প্রিয়তম!” আর পরক্ষণেই নিজের বাহুপাশে নাগদত্তকে বেঁধে তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিল। নাগদত্ত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সোফিয়া তখন ঠোঁট সরিয়ে নিজের কপোল নাগদত্তের কপোলের সঙ্গে মিলিয়ে বলল,“আমার প্রিয়তম!”
“সোফী! আমি নিজেকে তোমার যোগ্য বলে মনে করি না।”
“নিজেকে আমি জানি। নাগ, এখন থেকে আমৃত্যু তোমার সঙ্গেই থাকব।”
নাগদত্তের অশ্রুর বাঁধ ভেঙে পড়ল, সে বলল, “মৃত্যু পর্যন্ত!”
৫
সলামীসের উপসাগর, যেখানটায় যবন নৌ-সৈন্যরা পার্শবদের বড় একটা যুদ্ধে পরাজিত করেছিল। নাগদত্তের খুবই ইচ্ছা ছিল সেটা দেখার। দু’জনেই পথা চলছিল। নাগদত্ত নিজের ভেতর নতুন উৎসাহ পাচ্ছিল এবং আস্তে আস্তে তার মন তক্ষশিলার দিকে ধাবিত হচ্ছিল। যখন দু’জনে রাস্তায় একটি গাছের নীচে বিশ্রাম করছিল তখন সোফিয়া বলল, “নাগ! ফিলিপ মারা গেছে, অলিকসুন্দর ম্যাসিডোনিয়ার রাজা হয়েছে আর সে শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী তৈরী করছে।”
“হ্যাঁ, সে সমস্ত যবন সাগরের (ভূমধ্য) পার্শ্ববর্তী অঞ্চল অধিকার করতে চাইছে। তার মধ্যে পূর্ব এবং দক্ষিণ (মিশর) অঞ্চল তো পার্শবদের হাতে।”
“তার মানে হল যে, সে পাশবদের সঙ্গে যু্দ্ধ করতে চায়।”
“আর এইভাবে গণতন্ত্রী যবনদের নিকট হতে নিজ রাজ্যে প্রতিষ্ঠায় সাহায্য নিয়ে এক ঢিলে দু’পাখী মারতে চায় সোফিয়া! শাহানশাহের যবন সাগর থেকে হটে যেতে হবে যদি স্বাদীনতা-প্রেমী যবনগণকে রাজভক্ত করানো সম্ভব হয়।”
“এ সবই আরিস্টোটলের শিক্ষা যা, তার সাহস বাড়াল!”
“র্দাশনিক আরিস্টোটল!”
“হ্যাঁ,আর তার গুরু প্লেটো একটি আর্দশ ‘গণ’-এর কল্পনা করেছিল কিন্তু সেও তাতে সাধারণ জনাতাকে রাখতে চেয়েছিল। আরিস্টোটল আদর্শ গণের জায়গায় আদর্শ রাজচক্রবর্তীর কল্পনা করে। কি জানি এই যবন-চক্রবর্তীর সন্ধানে বেরিয়েছে।”
“যবন এবং হিন্দু চক্রবর্তীদের সিন্ধুতীরে মিলন হবে না-কি?”
“হবে,প্রথম কিংবা দ্বিতীয় পুরুষে। কিন্তু পৃথিবী তখন কত ছোট হয়ে যাবে!”
সমুদ্র তীর হতে তারা নৌকায় করে সলামীসের দিকে রওনা হল। সমুদ্র শান্ত, বাতাস একেবারেই বন্ধ। সোফী এবং নাগদত্ত দু’জনেই বিগত শতাব্দীর ধ্বংস করতে সাহায্য করেছিল। অনেক দূর চলে যাওয়ার পর খুব বড় তুফান উঠল। দু’জনেরই মনে হল, যেন বিগত শতকের ঐতিহাসিক তুফান কিন্তু তখনই তাদের দৃষ্টি ভয়ভীত নৌকারোহীদের ওপড় পড়ল। আর দেখল যে পাল ছিঁড়ে গেছে এবং নৌকা ডুবছে।
সোফিয়া নাগদত্তকে নিজের বাহুপাশে বেঁধে বুকে বুক মিলিয়ে রইল। হাসি মুখে সে বলল,“মৃত্যু পর্যন্ত আমরা এক সঙ্গে থাকব।”
“হ্যাঁ, মৃত্যু পর্যন্ত”—বলে নাগদত্ত সোফিয়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিল আর দু’জনেই দু’জনের বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হল!
পর মূহুর্তে নৌকা উল্টে গেল—সত্যিই মৃত্যু পর্যন্ত সাথী হয়ে রইল তারা!
১১. প্রভা (কাল : ৫০ খৃষ্টপূর্ব)
সাকেত কখনও কোনো রাজার রাজধানীতে পরিণত হয়নি। বুদ্ধের সমসাময়িক কৌশল-রাজ প্রসেনজিতের একটি রাজপ্রাসাদ এখানে ছিল, কিন্তু রাজধানি ছিল ছয় যোজন দূরে অবস্থিত শ্রাবন্তীতে (সহেট-মহেট)। প্রসেনজিতের জামাতা অজাতশত্রু কৌশলের স্বাধীনতা হরণ করার সঙ্গে সঙ্গে শ্রাবন্তীরও সৌভাগ্য বিলুপ্ত হল। অতীতে সরযুতটে অবস্থিত সাকেত পূর্ব (প্রাচী) থেকে উত্তরের (পাঞ্জাব) যোগাযোগ পথে অবস্থিত থাকায় শুধু জলপথের বাণিজ্রের জন্যই নয়, স্থলপথের বাণিজ্যেরও এক বড় কেন্দ্র ছিল। বহুদিন পযণ্ত তার এই অবস্থা অটুট ছিল। বিষ্ণগুপ্ত চাণক্যের শিষ্য মৌর্ষ মগ্ধ রাজ্যকে প্রথমে তক্ষশিলা পর্যন্ত, পরে যবনরাজ সেলুকাসকে পরাজিত করে হিন্দুকুশ পর্বতমালা থেকে পশ্চিমে হিরাত এবং আমুদরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিল। চন্দ্রগুপ্ত ও তার মৌর্যবংশের শাসনেও সাকেত বাণিজ্য কেন্দ্রের বেশী কিছু ছিল না। মৌর্যবংশ-ধ্বংসকারী সেনাপতি পুষ্যমিত্র প্রথমে সাকেতকে রাজধানীর মর্যাদা দিয়েছিল, কিন্তু তাও সম্ভবত পাটলীপুত্রের প্রাধন্যকে ক্ষুণ্ণ করে নয়। পুষ্যমিত্র অথবা তার শুঙ্গবংশের শানসকালে বাল্মীকি যখন রামায়ণ রচনা করেন, তখন অযোধ্যার নাম প্রচারিত হল। এইভাবেই সাকেত অযোধ্যা বলে পরিচিত হয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, অশ্বঘোষ বাল্মীকির কাব্যের রসাস্বদন করেছিলেন। কালিদাস যেমন চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের আশ্রিত কবি ছিলেন, তেমনি বাল্মীকিও যদি কখনও শুঙ্গবংশের আশ্রিত কবি ছিলেন, তেমনি বাল্মাকীও যদি কখনও শুঙ্গবংশের আশ্রিত কবি থেকে থাকেন অথবা কালিদাস যেমন চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য এবং কুমারগুপ্ত এই দুই পিতা-পুত্রকে তাঁর ‘রঘুবংশ’-এ রঘু এবং ‘কুমারসম্ভব’-এ কুমার রুপে চিত্রিত করেছেন, তেমনি বাল্মীকি যদি শুঙ্গবংশের রাজধানীর মহিমাকে উন্নীত করবার জন্যই বৌদ্ধ জাতকের দশরথের রাজধানীকে বারাণসী থেকে সরিয়ে সাকেত বা অযোধ্যায় এনে থাকে এবং শুঙ্গসম্রাট পুষ্যমিত্র বা অগ্নিমিত্রকেই রামরুপে মহিমান্বিত করে থাকেন—তবে বিস্ময়ের কিছু নেই।
