“আর যদি তুমি পৃথিবীসুদ্ধ লোককে দেখাবার জন্য বৈদ্যের স্ত্রী হতে চাও, তা’হলে চিঠিতে তোমার নামও লিখিয়ে নেব।”
সোফিয়া ছল-ছল চোখে নাগদত্তের হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, “নাগ! তুমি কত উদার, তোমার মনের গভীরতা তুমি জানাতে চেষ্টা কর না। তুমি কত সুন্ধর কিন্তু তুমি কখনও এখানে তোমার প্রতি আকৃষ্টা পুষ্পরাগ এবং নীলিমা চোখে দেখনি? নাগ! রোশনা কতবার আমারকাছে তোমার জন্য প্রেম নিবেদন করেছে! তার কোন এক আধমরা ভাই আছে তাই তার বাপ-মা চায় রোশনকে তার সঙ্গে বিয়ে দিতে, কিন্তু সে চায় তোমাকে।”
“ভালোই হয়েছে যে আমি জানিনি, জানলে অস্বীকার করতে হত। সোফিয়া! আমি প্রাসাদপোষিতাদের জন্য নয়। আমি বোধহয় কারুর জন্যেই নয়। আমার সঙ্গে যে প্রেম করবে তার সুখ-নিদ্রার সুযোগ ঘটবে না। কিন্তু যদি তুমি চাও তবে শাহানশাহার চিঠিতে তোমার নাম নিজ স্ত্রী বলে লিখিয়ে নেব। যবন দেশে যদি তোমার কোনো প্রিয়পাত্র জুটে যায় তা’হলে তোমাকে নিজের পথ দেখতে হবে।”
বৈদ্য নাগদত্তের সব জায়গা থেকেই ডাকা আসত। সে হিন্দু বৈদ্য পার্শব শাহান-শাহ দারয়োশের একদা চিকিৎসক ছিল, আর তার চিকিৎসা ছিল অদ্ভুত রকমের।
পর্শুপুরীতে থাকাকালীন সে যবন-ভাষা শিখেছিল, তার ওপর সোফিয়া তার সহচারিণী। সে ম্যাসিডোনিয়া ঘুরে দেখল এবং ফিলিপের পুত্র অলিকসুন্দরের গুরু আরিস্টোটলের সঙ্গে পরিচিত হল।
নাগদত্ত নিজেও একজন দার্শনিক কিন্ত ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে আরিস্টোটলের শাহানশাহী তত্ত্বের সঙ্গে তার মতভেদ ছিল। তবুও সে আরিস্টোটলের প্রতি বিশেষ সম্মান দেখিয়ে ম্যাসিডোনিয়া থেকে বিদায় নিল। আরিস্টোটলের যে চিন্তাধারা তার পছন্দ হয়েছিল তা হল, সত্যের পরীক্ষার জন্য বুদ্ধি নয়, জাগতিক পাদর্থেরই প্রয়োজন। আরিস্টেটল প্রয়োগ-প্রমাণিত বস্তুকে উচ্চে স্থান দিত। নাগদত্তের আফসোস ছিল এ জন্য যে, ভারতীয় দার্শনিকরা সত্যকে মন থেকে সৃষ্টি করতে চায়। নাগদত্ত অরস্তর শিষ্য মনস্বীর অনেক প্রশংসা তার গুরুর মুখে শুনেছে এবং সে নিজেও কতবার তার বিষয়ে কথাবার্তা বলেছে। সেই তরুণের মধ্যেশুধুমাত্র অসাধারণ শৌষই ছিল না ছিল অসাধারণ বিচারশক্তিও। নাগদত্ত এথেন্স গিয়ে ফিরে আসার জন্য আরিস্টেটলের কাছ থেকে ছুটি নিয়েছিল, কিন্তু যবন দার্শনিকের সঙ্গে এই তার শেষ দেখা,তা সে কি করে জানবে!
বীরের জননী, গণতন্ত্রের বিজয়ধ্বজাধারিণী এথেন্স নগরে সে ততটাই শ্রদ্ধা ও প্রেমের সঙ্গে উপস্থিত হল যতটা যে তক্ষশিলার জন্য করত। নগর পুনরায় উর্বর হয়েছিল কিন্তু সোফিয়া বলল যে, এখন সেই পুরনো এথেন্স নেই। বেন্স জুপিটারের মন্দির এখনও অমর কারকার্যের সুন্দর কীর্তিতে অলঙ্কৃত। কিন্তু সোফিয়া একদিন এথেন্স নাগরিকদের প্রাণে যে উৎসাহ,যে জীবন-স্পন্দন দেখেছিল আজ আর তা নেই।
সোফিয়ার বাবার জমির ওপর তৈরী ঘরের মালিক একজন ম্যাসিডোনিয়ার ব্যবসায়ী। সে ঘর দেখে সোফিয়া এতদূর উদ্বিগ্ন হল যে, সে নিজেই তার স্বভাব-গাম্ভীর্যের বিরুদ্ধাচরণ করল। কিন্তু, সে কথা কম বলত। কখনও তার চোখ অশ্রুজলে ভরে যেত আবার কখনও সে পাথরের মূর্তির মতো হয়ে থাকব। নাগদত্ত বুঝতে পারল যে, নিজের প্রিয় বাল্যস্থানের ঐ রকম অবস্থা দেখে তার মনে বিকার জন্মেছে। শেষটায় সোফিয়ার মর্মান্তিক শোকচ্ছায়া নাগদত্তকেও আচ্ছন্ন করে ফেলল।
যখন সোফিয়া প্রকৃতিস্থ হল তখন সে একদম বদলে গেল। নিজের সাজ-সজ্জার ওপর তার কখনও বিশেষ খেয়াল ছিল না। কিন্তু এখন সে গণতন্ত্রী এথেন্সের তরুণীদের মতো নিজের খোলা সোনালী চুলগুলিকে ফুলের মালা দিয়ে খোঁপা বাঁধতে লাগল। তার শরীরের ওপর যবন-সুন্দরীদের পা পর্যন্ত ঝোলানো বিশেষ পছন্দ-করা সুন্দর কঞ্চুক এবং পায়ে অনেকগুলি ফিতা-যুক্ত স্তান্ডেল পরল। তার সুন্দর সাদা কপাল, লাল টুকটুকে ঠোঁটের তারুণ্যে—সৌন্দর্য এবং স্বাস্থ্যের অদ্ভুত সংমিশ্রণ ছিল। নাগদত্ত আশ্চর্য হল না বরং অপার আনন্দ লাভ করল।
এ ব্যাপারে নাগদত্ত একদিন প্রশ্ন করায় সোফিয়া বলল; “প্রিয় নাগ! আমি এতদিন পর্যন্ত জীবনটাকে একমাত্র শোক এবং অতীত চিন্তার বস্তু বলে মনে করে এসেছি কিন্তু এখন সে ধারণা আমার ভুল বলে মনে হচ্ছে। জীবন সম্বন্ধে এ রকম একপেশে দৃষ্টিভঙ্গী জীবনের মূল্যকে কমিয়ে দেয় ্বংে কার্য-ক্ষমতাকেও দুর্বল করে ফেলে। নাগ! শেষ পর্যন্ত তুমিও তক্ষশিলার ভবিষ্যতের জন্য কম চিন্তা করছ না, তবে তুমি মাথা ঠাণ্ডা রেখেই উপায় উদ্ভাবনের জন্য সমস্ত শক্তি নিয়োগ করছ।”
“সোফী! তোমাকে এতটা আনন্দিত দেখে আমি খু্বই খুশি।”
“কেন আনন্দ হবে না, আমি এথেন্সে ফিরে এসে নিজের প্রিয়কে খুঁজে পেয়েছি।”
নাগদত্ত হর্ষোল্পাসে পুলকিত হয়ে বলল,“খুবই আনন্দের কথা যে, তুমি এতদিন পরে নিজের প্রেয়কে ফিরে পেয়েছ।”
“নাগ! আমি দেখছি যে তুমি মানুষ নও, দেবতাদের চেয়েও বড়, ঈর্ষা তোমাকে স্পর্শ করতে পার না।”
“ঈর্ষা! ঈর্ষার এখানে প্রয়োজন কি? সোফী! আমি কি তোমাকে যবন দেশে পৌঁছে দেবার দাসিয়ত্ব নিইনি? আমি কি তোমাকে বলিনি যে, তুমি সেখানে গিয়ে তোমার প্রিয়কে খুঁজে নিও?”
“হ্যাঁ তা বলেছিলে।”
“তোমার এ অস্বাভাবিক আনন্দ দেখে আমার মনে হচ্ছিল যে, তুমি নিশ্চয়ই অসাধারণ কোনো প্রিয় বস্তু পেয়েছ।”
