“এথেন্স কি মহানগরী, সোফিয়া?”
“একদিন ছিল! কিন্তু এখন তা ধ্বংসপ্রাপ্ত, আমাদের ‘গণ’ একদিন মহান দারয়োশদের কঠোর শিক্ষা দিয়েছিল তাকে ক্ষুদ্র ফিলিপ মাথা নত করতে বাধ্য করেছে।”
“কেন এমন হল সোফিয়া?”
“পার্শবদের অনেক আক্রমণের প্রতিকার করেও এথেন্সের কিছু মনীষীদের মাথায় খেয়াল চাপল যে, যতদিন পর্যন্ত আমরা পার্শবদের তুলা একটি বড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা না করতে পারছি ততদিন আমাদের নিস্তার নেই।”
“আহা, তক্ষশিলা! তুমিও বিষ্ণুগুপ্তের মতো লোক সৃষ্টি করেছ!”
“তক্ষশিলা, বিষ্ণুগুপ্ত—এ সব কি, নাগ!?”
“তক্ষশিলা! আমার জন্মভূমি, আমাদের ‘গণ’ও মহানদারয়োশ এবং তাদের উত্তরাধিকারীদের অনেকবার মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিল কিন্তু আমার সহপাঠী বিষ্ণুগুপ্ত এখন সেই কথাই বলছে যা একদিন ফিলিপের সাহায্যকারী এথেন্সের নাগরিকরা বলেছিল।”
“তক্ষশিলা ও কি আমাদের মতো ‘গণ’?”
“হ্যাঁ, ওইরুপ ‘গণ’! আর আমাদের তক্ষশিলায় কেউ দাস নেই, সেখানকার জমিতে পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে সকলেই অ-দাস হয়ে যায়।”
“আহা, করুণাময়ী তক্ষশিলা! তাই নাগ, আমি প্রথম দিন থেকেই দেখছি যে দাসদের সঙ্গে ব্যবহার করতে তুমি জান না।”
“আর আমি কখনও তা তোমাকে জানতেও দেব না। আমি বিষ্ণুগুপ্তকে বলেছি যে, যদি তুমি মগধকে তক্ষশিলা গ্রাস করতে সাহায্য কর তা’হলে তক্ষশিলার পবিত্র ভূমি দাসত্বের কলঙ্ক-মুক্ত থাকবে না!”
“মগধ কি নাগ!”
“হিন্দের (হিন্দুস্থানের) ম্যাসিডোনিয়া—তক্ষশিলার পূর্বে এক বিশাল হিন্দুরাজ্য। পার্শবদের আক্রমণ আমরা প্রতিরোধ করে আসছি, কিন্তু জিতে জিতেও আমরা দুর্বল এবং হারার মতো হয়ে গেছি। বস্তুত তক্ষশিলা একা পার্শব শাহানশাহের মোকাবিলা করতে পারে না, কিন্তু আমি এর প্রতিরোধের একমাত্র প্রতিকার হিসেবে বলেছি, নিজেদের সমস্ত গণগুলিকে সংঘবদ্ধ হতে।”
“কিন্তু নাগ! আমাদের দেশে এও করে দেখা হয়েছে। আমাদের মতো হেল্লা জাতিকে দিয়ে ‘গণ-সংঘ’ তৈরী করে পার্শবদের মোকাবিলা করেছে কিন্তু সে সংঘ স্থায়ী হতে পারল না। ‘গণ-সংঘের’ মধ্যে নিজ নিজ গণের স্বতন্ত্রতার ওপর এত নজর যে, সেখানে সংঘকে ছেড়ে দিতে কেউ রাজি নয়।”
“তা’হলে কি আমিই ভুল প্রমাণিত হব এবং বিষ্ণুগুপ্ত সঠিক!”
“হ্যাঁ। সে বলে, আমাদের শত্রু যতটা শক্তিশালী গণের সীমা নষ্ট করে যদি একটি মহান ‘গণ’ তৈরী করা যায় তবে হয়ত সম্ভব হতে পারে, কিন্তু ‘গণ’ এ কথা স্বীকার করতে রাজী হবে না।”
“হয়ত তোমার বন্ধু ঠিকই বলেছে, নাগ! কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত এথেন্সের স্বতন্ত্রতা ছেড়ে দেবার কথা মনে আসতে দিইনি।”
“তা’হলে সোফিয়া! ‘গণ’ হয়েও এথেন্স কেন এ দাসত্বকে স্বীকার করল?”
“নিজের পতন শীঘ্র ডেকে আনার জন্য। ধনীর লোভের জন্যই দাস-প্রথার প্রভাব বাড়ল এবং আস্তে আস্তে মালিকের চেয়ে দাসদের সংখ্যা বেড়ে গেল।”
“এখানে পার্শবদের ভেতর সব চেয়ে কোন প্রথা খারাপ বলে মনে হয়?”
“দাসত্ব, যা আমাদের ওখানেও ছিল। আর বাদশা এবং ধনীদের অন্তঃপুর।”
“তোমাদের ওখানে এ রকম হয় না?”
“আমাদের ওখানে ম্যাসিডোনিয়ার রাজা ফিলিপও একাধিক বিয়ে করতে পারে না। এখানে তো ছোট রাজকর্মচারীও বহু বিবাহ করে।”
“আমাদের দেশেও একধিক বিয়ে দেখা যায়, যদিও তার সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু আমি একে স্ত্রীজাতির দাসত্বের নিদর্শন বলে মনে করতাম। এথেন্স যদি দাসত্ব-প্রথা চালু করে থাকে তবে তক্ষশিলাও বহুবিবাহ প্রথা চালু রেখে সেই একই অন্যায় করেছে।”
“আর অল্পসংখ্যক ঘরেই সম্পদ জমা হওয়া?”
“আমি বিষ্ণুগুপ্তকে বলেছিলাম,‘গণ’-এ এত ধনররত্ন থাকতেও কেন অন্যের শ্যীবৃদ্ধি হচ্ছে না। তুমি রাজার মতো জলের ন্যায় ধন-সম্পদ উড়িয়ে দিতে পার না। এখানে তো তুমি দেখছ সোফী! মূল্যবান মৃগচর্ম, মণি, মুক্তা ইত্যাদি বস্তুর সঙ্গে কি রকম ব্যবহার। এ গোলাপী গাল, এ প্রবাল অধর একবার মনেও করে না যে, এগুলি উৎপন্ন করতে কত সহস্র লোক না খেয়ে মরেছে! আমাদের ঘরের পড়ে যাওয়া জল নিয়েই সমুদ্রের জলরাশি। মাটিতে যারা সোনা ফলায় তারা মরছে না খেয়ে, আর সোনাকে যারা মাটি করে দেয় তারা খাবার নষ্ট করছে। আমি যতবার বাদশার কছে গিয়েছি—প্রত্যেকবারই ফেরবার সময় আমার মাথা ধরেছে। আমি সমস্ত সমৃদ্ধি ভেতর শীতে জমে, গরমে জল হয়ে মরবার মাসুষ ওই কর্মকারদের দুঃখের নিশ্বাস ফেলতে শুনি, আমাকে সতর্ক করে যাওয়া তাদের লাল মদিরা প্রজাদের রক্ত রুপে দেখা যাচ্ছে। পশুপুরীতে আমার তিক্ততা এসেছে তাই তাড়াতাড়ি এখান থেকে পালাতে চাই!”
“কোথায় যেতে চাইছ নাগ?”
“প্রথমে তোমার মতামত জানতে চাই।”
“কোথায় আমি বলব!”
“যবন-লোক(গ্রীস)?”
“খুব ভালো হয়।”
“তবে সেদিকেই যাব।”
“কিন্তু, রাস্তায় আবার আমাকে কেউ যদি কেড়ে নেয় এবং তারপর নাগের মতো ত্রাণকর্তা যদি না পাই!” সোফিয়ার কণ্ঠস্বর খুবই নরম, তার সুন্দর আয়ত নয়ন বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল।
নাগদত্তের তার কানের ওপর ঝুলে-পড়া সোনালী চুলগুলিকে স্পর্শ করে বলল,“আমি তার উপায় ঠিক করে রেখেছি কিন্তু তার জন্যে তোমারও সম্মতি প্রয়োজন।”
“কি?”
“ক্ষত্রপ, ক্ষত্রপানী এবং শাহানশাহার নিকট হতে আমার জন্য চিঠি নিয়ে নেব যে, এ শাহানশাহার সম্মানিত হিন্দু বৈদ্য।”
“তা’হলে আর আমাকে কেউ কেড়ে নেবে না?”
