ক্ষপত্র বলল,“এ কথা আমাকে এ হিন্দু বৈদ্যও বলেছিল।”
আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠে ক্ষত্রপানী বলল,“হিন্দু বৈদ্য শুনেছে—কি আমার অসুখ; আমার অসুখ কি সেরে গেছে বৈদ্য?”
“হ্যাঁ, অসুখ সেরে গেছে, কিন্তু মহাক্ষত্রপানী! একটু বিশ্রাম নিতে হবে। আমি ভাবছি যে কত তাড়াতড়ি আপনাকে পর্শুপুরী যাওয়ার উপযুক্ত করে তোলা যায়; আমার নিকট অভূতপূর্ব রসায়ন আছে, হিন্দুদের রসায়ন আপনাকে দিচ্ছি। একটু একটু দ্রাক্ষা এবং ডালিমের রস দিয়ে খেতে হবে।”
“বৈদ্য! তুমি রোগ চেন, অন্যরা তো গাধার চেয়ে গাধা! তোমার নির্দেশ মতোই চলব। রোশনা!”
ষোড়শী সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “মা।”
“বেটি! তোমার চোখের জল মুছে ফেল। ওই হাকিমগুলো আমাকে মেরে ফেলত। কিন্তু এখন আর কোনো চিন্তুা নেই। হিন্দু বৈদ্যকে অহ্বর মজদা পাঠিয়েছেন। এর যেন কোনো কষ্ট না হয়। বৈদ্য আমাকে যা খেতে বলবে তা তুমি নিজ হাতে আমাদে দিও।”
বৈদ্য রোশানাকে কয়েকটি কথা বলে বাইরে চলে গেল। ক্ষত্রপের চেহারা ম্লান হয়ে গিয়েছিল। বৈদ্য কিছু ঔষধ ভুর্জপত্রের টুকুরোয় বেঁধে ক্ষত্রপের নিকট দিয়ে যখন নিজে পান্থশালায় ফিরে যেতে চাইল তখন ক্ষত্রপ বলল,“আমাদের সঙ্গেই তুমি থাক।”
“কিন্তু আমি দরবারে থাকবার পদ্ধতি জানি না।”
“তবুও মানুষের-সঙ্গে থাকার আচার-ব্যবহার তুমি ভালোই জানো। ভিন্ন ভিন্ন জাতির ভিন্ন আচার ব্যবহার।”
“আমি থাকলে আপনার পরিচারিকাদের কষ্ট হবে।”
“আমি একদম আলাদা একটি তোমাকে দিচ্ছি। ুমি কাছে থাকলে আমি নিশ্চিত থাকব।”
“মহাক্ষত্রপানীর জন্য আর কোনো চিন্তার কারণ নেই। হাকিমরা অসুখ ঠিকমতো নির্ধারণ করতে পারেনি। আমি আর দু’ঘণ্টা পরে এলে বাঁচবার কোনো আশা ছিল না। কিন্তু তাঁর অসুখ সেরে গেছে।”
ক্ষত্রপের আগ্রহের জন্য বৈদ্য বাদশাহী পান্থশালায় থাকতে রাজী হল।
ক্ষত্রপানী চতুর্থ দিন থেকে উঠে বসতে লাগল এবং তোর চেহারার ম্লানতা খুব তাড়াতাড়ি মিলিয়ে যেতে লাগল। সবচেয়ে প্রসন্ন হল রোশনা। দ্বিতীয় দিন সে ক্ষত্রপের দেওয়া তার নিজের মহামূল্য দু’বছরের চোগাটি (পরিধেয় বস্ত্রখণ্ড) এনে বৈদ্যকে দিল। আজকের এই চোগা, সোনালী কোমর বন্ধনী আর স্বর্ণখচিত পাদুকায় সজ্জিত নাগদত্তের সঙ্গে সেদিনের সেই খরমুজ-খাওয়া লোকটির মিল ছিল না।
ক্ষত্রপানী এখন লঘু আহার গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছে। ষষ্ঠ দিনের সন্ধ্যাবেলা সে বৈদ্যকে ঢেকে পাঠাল। বৈদ্যকে মহাক্ষত্রপানী কাছে এল বসতে বলল এবং বসার পরে বলল,“বৈদ্য! আমি তোমার নিকট বড়ই কৃতজ্ঞ। এই নির্জন পথিমধ্যে মজদা তোমাকে আমায় বাঁচাবার জন্য পাঠিয়েছেন। তোমার জন্মস্থান কোথায়?”
“তক্ষশিলা।”
“তক্ষশিলা ! খুব প্রসিদ্ধ নগর, বিদ্যার জন্য বিখ্যাত। তুমি তার রত্ন!”
“না, আমি সেখানকার একজন সাধারণ নতুন বৈদ্য।”
“কিন্তু তারুণ্য গুণের বৈরী নয়। তোমার নাম কি বৈদ্যরাজ?”
“না প্রদত্ত কাপ্য।”
“পুরো নাম বলা আমার পক্ষে কষ্টকর। নাগ বলাই যথেষ্ট, কেমন?”
“যথেষ্ট, মহাক্ষত্রপানী!”
“তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
“এখন তো যাচ্ছি পর্শুপুরী(পর্সপোলীস)।”
থাকতে পেতে। কিন্তু সোফিয়া! তুমি আমাকে প্রভু বলো না। দাসপ্রথার কথা শুনলে আমার গায়ে জ্বর আসে।”
“কিন্তু আমি যে তোমার দাসী।”
“তুমি দাসী নও। আমি ক্ষত্রপ-দম্পতিকে বলে দিয়েছি যে, সোফিয়াকে আমি দাসত্ব বন্ধন থেকে মুক্ত করলাম।”
“তা’হলে এখন আর আমি দাসী নই!”
“না, তুমি এখন আমার মতোই স্বতন্ত্র ও স্বাধীন এবং এখন তুমি যেখানে যেতে চাইবে আমি তোমায় সেখানে পৌছিয়ে দিতে চেষ্টা করব।”
“কিন্তু, যদি তোমার কাছেই থাকতে চাই, তা’হলে তাড়িয়ে দেবে না তো?”
“সম্পূর্ণভাবে সেটা তোমার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।”
“দাসত্ব মানুষকে কতই না খর্ব করে? পিতৃগ্রহে আমি আমাদের দাসদের দেখেছি, তারা আমোদ-প্রমোদ করত; কিন্তু আমি কখনও বুঝতে পারিনি যে তাদের হাসির মধ্যে এত ব্যথা লুকিয়ে ছিল। আমি যখন নিজে দাসী হলাম তখন অনুভব করলাম—দাসত্ব কি রকম নরক!”
“তুমি কেমন করে দাসী হলে, সোফী? যদি কষ্ট না হয় তবে বল।”
“আমার বাবা এথেন্স নগরের একজন সম্ভ্রান্ত নাগরিক ছিলেন। যখন স্যাসিযেনিয়ার রাজা ফিলিপ আমাদের নগর জয় করল, তখন বাবা পরিবারের লোকদের নিয়ে নৌকায় করে এশিয়ায় পালিয়ে এলেন। আমরা মনে করেছিলাম যে সেখানে আশ্রয় পাব, কিন্তু যে নগরে গিয়ে আমরা অবতরণ করলাম,কয়েক মাস বাদেই পার্শবরা তার ওপর আক্রমণ করল। নগরের পতন হল, আর পালানো-দৌড়ানোর মধ্যে কে কোথায় গিয়েছে, কত নাগরিককে পার্শবরা বন্দী করেছে জানি না। আমি দেখলাম, আমি সেই বন্দীদের একজন। আমি সুন্দরী ছিলাম, তার ওপর বয়সে তরুণী বলে তারা আমাকে সেনাপতির নিকট পাঠিয়ে দিল। সেনাপতির নিকট হতে বাদশার কাছে এলাম। বাদশার নিকট আমার মতো শত শত তরুণী ছিল, সে নিজের বোন আসছে শুনে আমাকে তার কাছে পাঠিয়ে দিল। যদিও আমি দাসী, কিন্তু নিজের রুপের জন্য খাস মহলের দাসী ছিলাম। তার জন্যই আমার অনুভূতি সাধারণ দাসীদের মতো হতে পারেনি, তবুও আমি জানি যে এর কি যাতনা! আমারও মনে হত যে আমি মানবী নয়।”
“তা’হলে সোফী, তোমার বাবার সঙ্গে আর দেখা হয়নি?”
“এখনও তিনি বেচে আছেন বলে আমার মনে হয়।এখন তো আমি হাওয়ায় ওড়ানো শুকনো ঝড়ো-পাতা। প্রিয় এথেন্স নগর ধ্বংস হয়ে গেছে, বাবা যদি এখনও জীবিত থাকেন তা’হলেও আমাদের মিলনের স্থান কোথায়?”
