“কেন পারব না,আমি তো বৈদ্য।”
“কিন্তু, তোমার এই পোশাকে?”
“পোশাকে তো আর চিকিৎসা করবে না, চিকিৎসা করব আমি।”
“কিন্তু, এ খুব বেশী ময়লা।”
“আজ আমার এগুলি বদলাবারই কথা। এক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা কর”—বলে বৈদ্য পরিহিত বস্ত্রের চেয়ে পরিস্কার একটি পশমের চোগা পরল, এবং হাতে ঔষধের মোড়ক ভর্র্তি একটি চামড়ার থলি নিয়ে রাজকমচারীর সঙ্গে চলল।
বাদশাহী পান্থশালার অঙ্গনে গাধার বিষ্ঠা কিংবা ভিখারী ঠগদের কোনো আস্তানা ছিল না। সেখানকার সব জায়গাই পরিষ্কার। ওপরে যাওয়ার সিঁড়িতে নানা রঙের গাল্চে বিছানো, সিঁড়ির দু’দিকটায় সুন্দর কারুকার্য করা এবং ঘরের মেঝেতে মহামূল্যবান ফরাস বিছানো। দরজায় দ্বিধাবিভক্ত সূক্ষ্ম পর্দা ঝোলানো, তার পাশে মার্বেল পাথরের মূর্তির মতো অনেক সুন্দরী নীরবে দাঁড়িয়ে। দরজায় গিয়ে রাজকর্মচারী বৈদ্যকে দাঁড়াবার জন্য ইশারা করল এবং একটি সুন্দরীর কানে কানে কিছু বলল। সে খুব আস্তে আস্তে দরজা খুলল। ভিতরকার পর্দার জন্য সেখানটায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তরুণী ফিরে এল এবং বৈদ্যকে তার সঙ্গে যেতে বলল।
ঘরের ভিরে ঢুকতেই মধুর সুগন্ধের সুরভি বৈদ্যের নাকে এল। ক্ষিপ্র দৃষ্টিতে সে ঘরের চারিদিকে তাকাল। গৃহসজ্ঝার নিপুণতায় সূক্ষ্ম রুচির পরিচয় বহন করছিল। ফরাস, পর্দা, মসনদ, দীপদানী, চিত্র এবং মূর্তিগুলি সবই এ রকম ভাবে সাজানো ছিল যে, বৈদ্যি ইতিপূর্বে কখনও দেখেনি। সম্মুখে একটি গদীর ওপর দেওয়ালের পশে দু’তিনটি মসনদ ছিল, তার একটিতে একজন মাঝারি বয়সের বয়সের স্থুলকারয় পুরুষ বলে। তার আকর্ণবিস্তৃত গোঁফে শাদা রঙ ধরেছি। তার পিঙ্গল চোখে রাত্রি জাগরণও তীব্র দুশ্চিন্তার ছাপ। তার কাছে এক অনুপম সুন্দরী রমণী উপবিষ্ট যার রঙ মাখনের মতোই নয়, মাখনের চেয়েও অধিক কোমল বলে মনে হচ্ছিল। তার কপোলের ওপরটা ছিল হালকা লাল কিন্তু এখন তা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। পাতলা ঠোঁটের সঙ্গে শুক চঞ্চুরই উপমা দেওয়া যায়। ধমুকের মতো বাঁকা ক্ষীণ ভ্রু-যুগল সোনালী ;তায় দীর্ঘ পক্ষবিশিষ্ট নীল চোখ বিষন্ন ও আরত্তিম । কেশদাম সুবর্ণ সূক্ষ জালে সজ্জিত। সোনালী ভেলভেটের কাঁচুলি ও লাল লালোয়ার তার অঙ্গাবরণ। সেই অনিন্দাকান্তি অঙ্গে মণিমুত্তার অলস্কার বাহূল্য মনে হচ্ছিল। এ দু’জন ছাড়াও ঘরের ভেতর আরও অনেক সুন্দরী দাড়িয়ে ছিল। তাদের চেহারা ও বিনীতভাব দেখে বৈদ্য বুঝতে পারল যে, এরা সবাই ক্ষত্রপের অন্তঃপুরপরিচারিকা। পুরুষ বলতে সেখানে শুধু ক্ষত্রপই ছিল। সে একবার বৈদ্যের মাথা হতে পা পর্যন্ত দেখল কিন্তু তার নীল নেত্রের দিকে তাকিয়ে ক্ষত্রপের বুঝতে অসুবিধা হল না যে, যদি আমি আমার পোশাক একে পরিয়ে দিই তা’হলে এই পশুপুরীর (পর্সপোলীস) সুন্দরতম তরুণদের মধ্যে তাকে ও একজন বলে গণ্য করা যাবে।
ক্ষত্রপ বিনীতভাবে বলল,“তুমি তক্ষশিলার বৈদ্য?”
“হ্যাঁ, মহাক্ষত্রপ!”
“আমার স্তীর খুব অসুখ। কাল থেকে অবস্তা অত্যন্ত খারাপের দিকে। আমার নিজের দু’জন বৈদ্যের ঔষধের কোনো ফলই দেখা যাচ্ছে না।”
“আমি ক্ষত্রপের স্তীকে দেখবার পর বৈদ্যদের সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
“তারা এখানে উপস্তিত আছে । আচ্ছা, তবে চল-ভেতরে যাই।”
শ্বেতপাথরের দেওয়াল থেকে যেমনি শ্বেত পর্দাটা সরিয়ে দেওয়া হল, তখনই ভেতরে যাবার রাস্তা দেখা গেল! ক্ষএপ এবং ষোড়শী আগে আগে—বৈদ্য তাদের পেছনে পেছনে চলল। ভিতরে হাতীর দাঁতের পায়াওয়ালা একটি পালঙ্কে বিছানা, তার ওপর ফেনসদৃশ কোমল সাদা শয্যার ওপর রোগিণী শুয়ে ছিল। তার শরীর শ্বেত কদলী-মৃগচর্মের আবরণে ঢাকা শুধুমাত্র চিবুকের উপরিভাগ খোলা। ক্ষত্রপকে আসতে দেখে পরিচারিকা সরে দাঁড়াল। বৈদ্য কাছে গিয়ে দেখল, রোগিণীর চেহারার সঙ্গে ষোড়শীর চেহারায় অবিকল মিল কিন্তু তার তরুণ সৌন্দর্যের স্থলে রোগিণীর ভেতর প্রৌঢ়াবস্থার প্রভাব এবং তার ওপর আবার দীর্ঘ রোগভোগের ঝড়-ঝাপটার চিহ্ন। তার লাল টুকটুকে ঠোঁট এখন ফিকে, পরিপুষ্ট গাল বসে গিয়েছে। চোখ কোটরে ঢুকে গেছে। ক্ষত্রপ মুখ কাছে নিয়ে গিয়ে বলল,“অফ্শা!”
রোগিণী একটুখানি চেয়েই আবার চোখ বন্ধ করল।
বৈদ্য বলল, “আংশিক মূর্চ্ছা।” সে তার হাত বের করে নাড়ী দেখল—বড় কষ্টে নাড়ী পেল। শরীর প্রায় ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল।
ক্ষত্রপ, বৈদ্যের মুখ গম্ভীর হতে দেখল। বৈদ্য একটু ভেবে বলল,“একটুখানি দ্রাক্ষা সুরা চাই, যত বেশী পুরনো হয় ততই ভালো।”
ক্ষত্রপের নিকট এর অভাব ছিল না। রক্তের মতো লাল পুরনো দ্রাক্ষা সুরায় পরিপূর্ণ শুভ্র কাঁচের ঘড়া নিয়ে আসা হল—আর তার সঙ্গে এল মণিমুক্তা খচিত সোনার চষক (পেয়ালা)। বৈদ্য একটি পুঁটলী খুলল এবং ডান হাতের আঙ্গুলের বড় নখ দিয়ে এক রত্তি ওষুধ বের করে রোগিণীকে হাঁ করাতে বলল। হাঁ করাতে ক্ষত্রপের বেশী কষ্ট হল না। সে ঔষধ মুখের ভেতর ঢেলে দিয়ে এক ঢোক সুরা মুখে ঢেলে দিল, রোগীকে গিলতে দেখে বৈদ্য সন্তুষ্ট হয়ে ক্ষত্রপকে বলল, “এখন আমি বাইরে মহাক্ষত্রপের বৈদ্যদের সঙ্গে দেখা করতে চাই, কিছুক্ষণ পরে মহাক্ষত্রপানী চোখ মেলবেন তখন আমার কাছে থাকা প্রয়োজন।” বৈদ্য অন্য ঘরে পার্শব বৈদ্যদের সঙ্গে পরামর্শ করল। রোগিণী সোগ্দ (পার্শব) থেকে আসার সময় যে জর নিয়ে এসেছিল, তখন হতে আজ পর্যন্ত অবস্থা পার্শব বৈদ্যরা বর্ণনা করল। এই সময় পরিচারিকা এসে সংবাদ দিল যে প্রভুপত্নী মহাক্ষত্রপকে ডাকছেন। মহাক্ষত্রপের চেহারার ওপর দিয়ে নতুন আশার ঝলক বয়ে গেল। বৈদ্যকে সঙ্গে করে ভেতরে গেল। ক্ষত্রপানীর চোখ সম্পূর্ণ খোলা—তার চেহারায় জীবনের স্পন্দন দেখা যাচ্ছিল।
