“তারা কতটা সাফল্য লাভ করেছে তা আমি কাছে থেকে দেখেছি।”
“কাছে থেকে?”
“হ্যাঁ, আমি প্রাচীতে মগ্ধ পর্যন্ত দেখেছি। আর নন্দের রাজত্ব, যা আমাদের পূর্ব গান্ধারের (তক্ষশিলা) তুলনায় নরক, তাও দেখেছি। গরীবদের দাবিয়ে দেওয়ার শক্তি তার আছে এবং মেহনতকারী কৃষক, শিল্পী ও দাসেরা যে তাতে কত নিপীড়িত তার বর্ণনা করা যায় না।”
“এ সবের কারণ হল নন্দের রাজ্যে তক্ষশিলার মতো কোনো স্বাভিমানী স্বতন্ত্রতাপ্রেমী, গণ (প্রজাতন্ত্র) সম্মিলিত হয়নি।”
“সম্মিলিত হয়েছে, বিষ্ণুগুপ্ত! লিচ্ছবিদের গণ গান্ধার থেকেও শক্তিশালী ছিল, কিন্তু এখন বৈশালী মগধের চরণদাসী আর লিচ্ছবিরা মগধ-শিকারীদের জবরদস্ত ডালকুত্তা। বৈশালীতে দেখবে, দেশটা উজাড় হয়ে যাচ্ছে; গত দেড়শ’বছরের মধ্যে জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশও এখন অবশিষ্ট নেই। শতাব্দী ধরে অর্জিত স্বতন্ত্রতা, স্বাভিমানী ভাব—এ সব এখন মগ্ধ রাজার সৈন্য বানাবার কাজে লাগানো হচ্ছে। একবার বড় রাজ্যের হাতে নিজেকে অর্পণ করলে তার হাত থেকে রেহাই পাওয়া বড় মুস্কিলের ব্যাপার।’
“বন্ধু নাগদত্ত! আমিও একদিন এই মতই পোষণ করতাম, কিন্তু এখন আমি মনে করি যে, ছোট ছোট গণের যুগ আর নেই। আর বড় গণ (প্রজাতন্ত্র) ও সংঘ গড়ে তোলবার চিন্তা স্বপ্নমাত্র। যুগের প্রয়োজনাকেই মেনে চলা উচিত। কিন্তু তুমি কি পশ্চিমের যাবার জন্য তৈরি হচ্ছ?”
“হ্যাঁ, প্রথমে পার্শবদের দেশ। আমাদের মতো তাদেরও গণ আছে, তাই নিজের চোখে দেখতে চাই যে কিভাবে তারা মহান দারয়োশ ও তার বংশধরদের উদ্দেশ্য সফল হতে দেয়নি।”
“আর আমিও যাচ্ছি! প্রাচ্যকে দেখব। দেখব যে, সমস্ত জম্বুদ্বীপকে একত্রিত করার শক্তি মগধের আছে কি নেই। চল, আমরা পড়া শেষ করে ধর্নাজন ও পরিবারপোষণ করা যায় এমন জায়গায় গিয়ে কাজ করি। বন্ধু, তুমি আয়ুবেদশাস্ত্র পড়ে বৈত্য হয়ে ভালোই করেছ, কেন না কোথাও গিয়ে থাকবার পক্ষে এ খুবই লাভজনক বিদ্যা। আমি জানি না বলে এখন অনুতাপ হচ্ছে।”
“তুমি ওর চেয়ে ও লাভজনক জ্যোতিষ বিদ্যা এবং সামুদ্রিক তন্ত্রমন্ত্র জানো।”
“মিত্র! তুমি তো জানো, এ বিদ্যা স্রেফ ফাঁকিবাজী।”
“কিন্তু বিষ্ণূগুপ্ত, এই বিদ্যা সত্য কি মিথ্যা তাতে চাণক্যের কি যায় আসে!”
ছেলেবেলা থেকে এক সঙ্গে খেলাধূলা ও পড়াশুনার সাথী—তক্ষশিলার নাগদত্ত কাপ্য এবং বিষ্ণুগুপ্ত চাণক্যের বিদ্যার্থী জীবনের এই শেষ দেখা। একাধিকবার তক্ষশিলা পার্শবদের হস্তগত হয়েছিল, আর তার স্বাধীনতা বাঁচাবার জন্য দু’জনেই নিজ নিজ বিবেচনা অনুসারে পথ খুজে বেড়াচ্ছিল।
২
চারিদিক বৃক্ষ-বনস্পতিবিহীন, ছোট ছোট নগ্ন পাহাড়। সেখানে সবুজের আশায় চোখ পিপার্সাত হয়ে উঠছিল। পাহাড়ের মাঝখানটায় বিস্তীর্ণ উপত্যকা—তার মধ্যেও কচিৎ কোথাও জল এবং বনস্পতির চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। এই উপত্যকার ধারে ধারে সার্খের (ক্যারাভ্যাম) রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে সর্বদা লোক যাওয়া-আসা করত। আর সার্থ এবং তার পশুদের আরামের জন্য পাস্থাশালা নির্মিত হয়েছিল। আশেপাশের অবস্থা দেখে এ রকম আশা করা যেত না যে এই পান্থশালায় সমস্ত সুখ-সুবিধা আছে। এই মরুভূমিতে এত জিনিস কোথা থেকে আসা তা জানা যায়নি। এই পর্বতের মধ্যে একাধিক পান্থশালা ছিল; তাদের কোনোটা সাধারণ রাজকর্মচারীদের জন্য, কোনোটা সৈনিকদের আবাসস্থল, কিছু ব্যবসায়ীদের জন্য, আর একটা থাকত বাদশাহ্দের প্রাস্থ-প্রাসাদ হিসেবে। সেখানে শাহ্আর তাঁর ক্ষত্রপরা বিশ্রাম করত।
আজ বাদশাহী পাস্থ-প্রাসাদের কেউ এসেছে। পান্থশালার আস্তাবলে ঘোড়া বাঁধা, আঙ্গিনায় অনেক দাস-কর্মচারী। কিন্তু সকলের চেহারায় ঐদাস্যের ভাব ফুটে উঠছিল। এত লোকের সমাগমেও পান্থ-প্রাসাদ আশ্চর্য রকমের নীরবতায় মগ্ন। এমন সময় দরজা দিয়ে হস্তদস্ত হয়ে তিনজন রাজকর্মচারী বেরিয়ে এল এবং তারা সাধারণ পান্থশালার মধ্যে ঢুকে পড়ল। তাদের বহু মূল্যের বস্ত্র ও আভিজাত্যপূর্ণ চেহারা দেখার সঙ্গে সঙ্গে অন্য লোকেরা ভয় ও সম্মানের সঙ্গে একধারে সরে দাঁড়াল। সেখানে কোনো বৈদ্য আছে কিনা তারা প্রশ্ন করল। অবশেষে সাধারণ পান্থশালার খবর পাওয়া গেল যে, সেখানে একজন হিন্দু বৈদ্য আছে।
এখানে এমনিতেই বৃষ্টি কম তাতে বর্ষাঋতু অনেক আগেই শেষ হয়েছে। মনাক্কা, বাদাম, আঙ্গুর, খরমুজের মতো ফল সস্তায় বিক্রী হচ্ছিল। রাজকর্মচারীটি যখন বৈম্ভের নিকট গেল তখন সে একটি বড় খরমুজ কাটছিল। তার আশেপাশে তারেই মতো ভিক্ষুকের বেশে আরও অনেক বসে ছিল, তাদের সামনেও খরমুজ। রাজকর্মচারীকে দেখেই অন্যান্যরা ভর্য়াত হয়ে সরে দাঁড়াল।
একজন বলল,“প্রভূ! ইনি হিন্দু বৈদ্য।”
বৈদ্যের ময়লা কাপড়ের দিকে তাকিয়ে রাজকর্মচারীর মুখে একটু বিরক্তি প্রকাশ পেল। পুনরায় সে তার চেহারার প্রতি তাকাল। তার চেহারা ওই কাপড়ের সঙ্গে মানাচ্ছিল না। তার মূখে ভয় ও দৈন্যের লেশমাত্র নেই। তার নীল চোখের দীপ্তি রাজকর্মচারীটিকে প্রভাবিত করল। তার ললাটের কুঞ্চিত ভাব বিলীন হয়ে গেল। সে কিছুটা শিষ্ট স্বরে প্রশ্ন করল,“তুমি বৈদ্য?”
“হ্যাঁ।”
“কোথাকার?”
“তক্ষশিলার।”
তক্ষশিলার নাম শুনে রাজকর্মচারী আরও নম্র হয়ে বলল, “আমাদের বক্ষু-সোগ্দেরক্ষত্রপের স্ত্রী শাহানশাহের বোনের অসুখ। তুমি তার চিকিৎসা করতে পারবে?”
