“তা’হলে আমি বলব যে, প্রয়োজনীয় যা কিছু তাই হল কর্তব্য।”
“তবে তো উচিত-অনুচিতের মধ্যে কোনো প্রভেদ থাকবে না।”
“থাকবে বন্ধু! আমার প্রয়োজনীয় কথার অর্থ শুধু একজনের প্রয়োজন নয়।”
“একটু পরিষ্কার করে বল,বিষ্ণুগুপ্ত!”
“আমাদের এই তক্ষশিলা গান্ধারের কথাই ধর না কেন! আমাদের কাছে নিজ স্বতন্ত্রতা কত প্রিয় এবং সেটা খুব স্বাভাবিকও বটে। কিন্তু আমাদের দেশ এত ছোট যে তার পক্ষে বড় শত্রুর মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। যতদিন পর্যন্ত মাত্র, পশ্চিম গান্ধারের মতো ছোট ছোট প্রজাতন্ত্রগুলি আমাদের প্রতিবেশী ছিল ততদিন সুখেই ছিলাম। কখনও কখনও যু্দ্ধ হত বটে কিন্তু পরিণামে সামান্য কিছু লোকই মরত শুধু। আমার স্বাতণ্ত্রা অপহৃত হয়নি। কারণ আরও ছিল, তক্ষশিলা জয় করা—কণ্টকাকীর্ণ রাজ্য জয় করা কারও পক্ষে সহজ ছিল না। কিন্তু যখন পার্শবরা (ইরাণী) পশ্চিমের প্রতিবেশী হয়ে দাঁড়াল তখন আমাদের স্বাতন্ত্র্য শুধু তাদের ক্বপার ওপর নির্ভর করে রইল। এখন আমাদের স্বতন্ত্রতা রক্ষার জন্য আবশ্যক পার্শবদের মতো শক্তিশালী হওয়া।”
“শক্তিশালী হওয়ার জন্য কি করা উচিত?”
“ক্ষুদ্র প্রজাতন্ত্রে কাজ হবে না। ছোট-ছোট স্বতণ্ত্র জনপদের জায়গায় বিশাল রাজ্য কায়েম করতে হবে।”
“সে বিশাল রাজ্যে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র জনপদের কি কোনো স্বাধিকার থাকবে?”
“সকলেই রাজ্যকে আপন বলে মনে করবে।”
“খুবই গোলমালের কথা বিষ্ণুগুপ্ত! দাস কি কখনও প্রভূকে আপন মনে করে?”
“তবে শোন বন্ধু নাগদত্ত,স্থান পাওয়াটা শুধু ইচ্ছা বা খেয়ালের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে যোগ্যতার ওপর।যদি তক্ষশিলা—গান্ধারদের যোগ্যতা থাকে তবে তারা ওই বিশাল রাজ্যও শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করবে। তা না হলে সাধারণভাবেই থাকবে।”
“গোলামের স্থান অধিকার করে?”
“কিন্তু বন্ধু! দারয়োশ রাজ্য পশ্চিম গাণ্ধাররা যে স্থান পেয়েছে তার থেকে এ গোলাম স্থান অনেক ভালো হবে। আচ্ছা আমার বক্তব্য ছেড়েই দাও। তুমিই বল না, আমাদের স্বতন্ত্রতা রক্ষা করার জন্য কি করা উচিত। এ কথা খুবই সত্যি যে, আমাদের মতো ক্ষুদ্র জনপদের পক্ষে আপন অস্তিত্ব রক্ষা করা দীর্ঘকাল আর সম্ভব নয়।”
“আমি বলব বিষ্ণুগুপ্ত! প্রথমত আমাদের নিজস্ব গণ-স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা উচিত যা কোনো রাজার বশ্যতা স্বীকার করবে না। কিন্তু আমি জানি, আমাদের মতো একটি ক্ষুদ্র গণের (রাষ্টের) পক্ষে স্বতণ্ত্রতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের কর্তব্য হল, সমস্ত উত্তরাপথের (গান্ধারের) গণগুলিকে (রাষ্ট্রগুলিকে) সংঘবব্ধ করা।”
“ সে সংঘে প্রত্যেকটি গণ স্বতণ্ত্র থাকবে—না, সংঘ সর্বোপরি থাকবে?”
“গণকে আমি সর্বোচ্চ বলে মনে করি আর সেইভাবেই গাণ্ধার, মাদ্র, মল্ল এবং শিবি প্রভূতি গণগুলির আপন শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে হবে।”
“কেমন করে তা স্বীকার করবে? শেষ পর্যন্ত তো গণকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সৈন্য রাখতেই হবে, বলি (কর) আদায় করতে হবে।”
“গণ(প্রজাতন্ত্র) যেমন তার কাজ সাধারণ মানুষের দ্বারা পরিচালনা করে, তেমনি সংঘ তার কাজ চালাবে গণগুলি সাহায্যে।”
“গণের মধ্যে প্রথম থেকেই আমরা এক জনের (গোষ্ঠী) এক রক্তের পরিবার হিসাবে বাস করে আসছি। আর অনাদিকাল থেকে এই পরিবার অর্থাৎ গণকে মেনে চলতে অভ্যস্ত। কিন্তু গণগুলির মিলিত সংঘ একটি নতুন জিনিস। এখানে রক্তের কোন সম্বন্ধ নেই, বরং এদের মধ্যে অনাদিকাল হতে চলে আসছে রক্তক্ষয়ী দ্বন্ধ ও প্রতিদ্বন্ধিতা। এ ক্ষেত্রে কেমন করে আমরা সবাইকে দিয়ে সংঘের নিয়ম-কানুন স্বীকার করাতে সক্ষম হব? বন্ধ! তুমি যদি এদের পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার করে দেখতে তা’হলে আর তুমি এ কথা বলতে না। যদি বাধ্য করা হয়, তা’হলে সংঘের কথা না হয় ধরলাম যে গণগুলি মেনে নেবে, কিন্তু বাধ্য করাবার শক্তি আসবে কোথ্থেকে?”
“আমি মনে করি যে, সে শক্তি ওরিই মধ্যে থেকে সৃষ্টি করা উচিত।”
“আমি ও মনে করি যে গণগুলির ভেতর থেকে যদি সে শক্তি সৃষ্টি হত তা’হলে খুবই ভালো হত। কিন্তু পার্শবদের কাছে বারবার মার খেয়ে বুঝেছি যে, শক্তি ভিতর থেকে স্বষ্টি হবে না। তাই আমাদের প্রয়োজন, অন্য উপায়ে সে শক্তি সৃষ্টি করা।”
“রাজাকে মেনে নিয়েও?”
“শুধু তক্ষশিলা নয়। তক্ষশিলা গান্ধারের মতো জনপদগুলির জন্য একজন রাজা অর্থাৎ রাজচক্রবর্তীকেও স্বীকার করে নিলে কোনো ক্ষতি নেই।”
“তা’হলে পার্শব দারয়োশকেই বা কেন রাজা বলে মেনে নাও না?”
“পার্শব দারয়োশ যে আমাদের লোক নয় তা তুমি নিজেও ভালোভাবেই জানো। আমার জম্বূদ্বীপের লোক।”
“আচ্ছা, তা’হলে নন্দকে স্বীকার করে নাও।”
“আমরা যদি উত্তরাপথের সব গণগুলিকে সংঘবদ্ধ করতে না পারি, তা’হলে নন্দকে স্বীকার করে নিতে আপত্তি করা উচিত নয়। পশ্চিম গান্ধারদের মতো দারয়োশের অধীন হওয়া ভালো—না নিজেদের জম্বুদ্বীপের চক্রবর্তীর অধীনতা স্বীকার করা ভালো?”
“বিষ্ণুগুপ্ত তুমি এখনও রাজ-শাসিত দেশ দেখনি, যদি দেখতে তা’হলে বুঝতে যে, সেখানে সাধারণ লোকেরও দাসদের অপেক্ষা বেশী অধিকার নেই।”
“স্বীকার করছি। আমি পশ্চিম গান্ধার ছাড়া আর কোথাও যাইনি; কিন্তু দেশ ভ্রমণের ইচ্ছা আমার খুবই আছে। আমি লেখাপড়া শেষ করে পর্যটনে বার হব। বিদেশী দাসত্বের হাত থেকে বাঁচতে হলে ক্ষুদ্র গণ্ডী ভেঙে ফেলা সম্পর্কে দ্বিমত থাকতে পারে না। পোরাস আর দারয়োশদের সফলতার এই হল চাবিকাঠি।”
