‘এ কথাও স্বীকার করতে হবে, আমাদের দাসদের বাপ মায়ের হৃদয়ও নেই।’
তাদের কথার মাঝে একটি বৃদ্ধ দাস বলল, ‘আর এও একজন দাসীরই পুত্র, যার সম্বর্ধনার জন্যে এতসব তোড়জোড় হচ্ছে।’
‘কে দাদা?’
‘এই কোশল রাজকুমার বিদুডভ।’
‘দাসীর পুত্র?’
‘হ্যাঁ, মহানাম শাক্যের সেই বুড়ি দাসীকে জানো না? আমাদের মতো কেলো নয়–নিশ্চয়ই কোনো শক্যের ঔরস-জাত হবে!’
‘ হ্যাঁ, ঐ দাসীর পেটে মহানামের একটি মেয়ের জন্ম হয়। তার রঙ খুবই ফর্সা আর দেখতেও খুব সুন্দরী; তাকে যেন শাক্যকন্যা বলেই মনে হত।’
‘মনে না হবার কারণ কি? মেয়ে যদি সুন্দরী হয়-তা সে দাসীকন্যা হোক না কেন, মালিক তাদের খুবই যত্নে লালনপালন করে।’
‘কোশলরাজ প্রসেনজিৎ কোনো এক শাক্য কুমারীকে বিয়ে করতে চাইল, কিন্তু শাক্যরা নিজেদের কুলীনশ্রষ্ঠ মনে করে, তাই তারা কেউই নিজ কন্যাকে রাজার সঙ্গে বিয়ে দিতে চাইল না। কিন্তু পরিষ্কার করে এ কথা বলার জো নেই, পাছে কৌশলরাজ রাগ করেএ ভয়ও ছিল। শেষ পর্যন্ত মহানাম তার দাসী কন্যাকে শাক্যকুমারী বলে পরিচয় দিয়ে প্ৰসেনজিতের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল। সেই বার্ষভ-ক্ষত্রিয়ার পুত্র বিদুডভ রাজকুমার।’
‘কিন্তু এখন তো এও শাক্যদের মতোই আমাদের রক্তপিপাসু হবে!’
***
বাজনা বাজতে লাগল, শাক্যরা কৌশল-রাজকুমারকে মহা ধুমধামের সঙ্গে স্বাগত জানাল, যদিও মনে মনে দাসীপুত্র বলে সকলে তাকে ঘৃণা করত। বিদুডভ নিজ মাতুলকুলের সম্বর্ধনা গ্ৰহণ করে মাতামহ মহানামের আশীৰ্বাদ নিয়ে খুশী মনে কপিলাবাস্তু থেকে বিদায় নিল। দাসীপুত্রের পদার্পণে সংস্থাগার অপবিত্র হয়েছিল, তাই তার শুদ্ধির প্রয়োজনে দাসদাসীরা ধুয়ে মুছে শুদ্ধি করতে লেগেছিল। একজন দাস বিদুডভের উদ্দেশ্যে গালি পাড়ছিল। এদিকে বিদুড়ভের একজন সৈনিক নিজের ভল্ল সংস্থাগারে ফেলে গিয়েছিল, তাই নিতে এসে এই সব কটুক্তি শুনতে পেয়ে সব কথা বিদুডভকে জানোল। সে কপিলাবাস্তু শাক্যহীন করুবার প্রতিজ্ঞা করল, আর তা পরবর্তীকালে করেও ছিল। তার ক্রোধের অনুলক্ষ্য ছিল প্ৰসেনজিৎ, যে তাকে দাসীর গর্ভে জন্ম দিয়েছিল।
দীর্ঘকারায়ণ নিজের মামা ও মামাতো ভাইদের মৃত্যুকে ভুলতে পারল না। অন্য দিকে প্রসেনজিৎ তার সমস্ত ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করবার জন্য অধিক মাত্রায় বিশ্বাস ও মধুরতা। দেখাতে চাইছিল। একদিন মধ্যাহ্ন ভোজনের পর তার বুদ্ধদেবকে স্মরণ হল। কয়েক যোজন দূরে শাক্যদের কোনো এক গ্রামে বুদ্ধদেব অবস্থান করছেন শুনে প্রসেনজিৎ দীর্ঘকারায়ণ সব কিছু সৈন্য নিয়ে সেখানে রওনা হল। বুদ্ধদেবের বাসগৃহে যাবার সময় তার মুকুট, খড়গ ও অন্যান্য রাজ চিহ্নগুলি কারায়ণের হাতে দিয়েছিল। বিদুডভের সঙ্গে কারায়ণের যোগ ছিল। রাণীকে সেখানে ত্যাগ করে রাজ্য মধ্যে গিয়ে বিদুড়ভকে রাজা বলে ঘোষণা করুল; আর নিজে রওনা হল শ্রাবন্তীর পথে।
অনেকক্ষণ পর্যন্ত বুদ্ধের উপদেশ শুনে প্রসেনজিৎ বাইরে এল। রাণী তাকে সব কথা বলল। সব শুনে সেখান থেকে প্রসেনজিৎ রাজগৃহ (রাজগীর) গিয়ে নিজের আত্মীয় মগধরাজ অজাতশত্রুর কাছ থেকে পরামর্শ ও সাহায্য নেওয়া ঠিক করল। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে দীর্ঘ পথশ্রমে পথিমধ্যেই শরীর অচল হয়ে পড়ল, সন্ধ্যার গোধূলি লগ্নে যখন রাজগৃহে পৌঁছল তখন নগরদ্বার বন্ধ হয়ে গেছে। সেই রাত্র নগর উপান্তে একটি কুটিরে প্রসেনজিতের মৃত্যু হল। সকালে রানীর বিলাপ শুনে অজাতশত্রু ও বজ্রা ছুটে এল, তখন জাঁকজমকের সঙ্গে শবদাহ করা ছাড়া আর কি-ই বা করবার ছিল!
বন্ধুলকে হত্যার এই হল প্রতিশোধ-দাসপ্রথার এই হল পরিণাম। *
————–
* আজ থেকে একশ’ পুরুষ আগেকার একটি ঐতিহাসিক কাহিনী। এই সময় সামাজিক বৈষম্য খুবই বেড়ে গিয়েছিল। ধনী ব্যবসায়ী-শ্রেণী সমাজের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল। এই সময়ের মধ্যে জন্মেছেন অনেক পথ প্রদর্শক–যারা নরক থেকে মানুষকে উদ্ধার করে পরলোকের পথ দেখান। কিন্তু যে নরকের অগ্নিকুণ্ড গ্রামে দাউদাউ করে জ্বলছিল তার দিকে সবাই চোখ বুজে ছিল।
১০. নাগদত্ত (কাল : ৩৩৫ খৃষ্টপূর্ব)
“বিষ্ণগুপ্ত! উচিত কাজের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। আমরা মানুষ তাই আমাদের কিছু কর্তব্য আছে। আর সেই জন্যে আমাদের উচিত-অনুচিত সম্বন্ধে খেয়াল রাখা দরকার।”
“কর্তব্য কি ধর্ম নয়?”
“আমি ধর্মকে ছলনা বলে মনে করি। ধর্ম কেবলমাত্র পরম্বাপহারীদের শাস্তিতে পরের ধনকে উপভোগের সুগোগ দেয়। ধর্ম কি কখনও গরীব এবং দূর্বলের কোনো খবর রাখে? পৃথিবীতে এমন কোন জাত নেই যারা ধর্ম মানে না। দাসেরও যে মানুষ—ধর্ম কি তা কখনও স্বীকার করে? দাসেদের কথা ছেড়েই দিলাম, কিন্তু স্ত্রী-জাতির প্রতি—তা সে অ-দাস হোক না কেন, ধর্ম কি কখনও ন্যায় করেছে? টাকা হলেই তুমি দু-চার-দশ কিংবা একশ বিয়ে করতে পার। সেই স্ত্রী দাসী ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না; ধর্ম কিন্তু একে উচিত কাজ বলেই মনে করে। আমি যে কর্তব্যের কথা বলছি সেটা ধর্মজাত কর্তব্য নয়, সুস্থ মানুষের মন যেটাকে কর্তব্য বলে মনে করে।”
*আজ থেকে একশ’পুরুষ আগেকার একটি ঐতিহাসিক কাহিনী। এই সময় সামাজিক বৈষম্য খুবই বেড়ে গিয়েছিল। ধনী ব্যবসায়ী-শ্রেণী সমাজের মধ্যে গুরুত্বপূর্ন স্থান অধিকার করে ছিল। এই সময়ের মধ্যে জন্মেছেন অনেক পথ প্রদর্শক—যাঁরা নরক থেকে মানুষকে উদ্ধার করে পরলোকের পথ দেখান। কিন্তু যে নরকের অগ্নিকুণ্ড গ্রামে গ্রামে দাউদাউ করে জ্বলছিল তার দিকে সবাই চোখ বুঁজে ছিল।
