মল্লিকার অবস্থা খুবই সমৃদ্ধশালী ছিল। কৌশলের মতো রাজ্যের সেনাপতির ঘর সমৃদ্ধ হওয়াটা স্বাভাবিক। মল্লিকার দশটি বীরপুত্র। তারা প্রত্যেকেই রাজসেনা বাহিনীর উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিল। বন্ধুল মল্ল এক যুগ পর্যন্ত রাজার ওপর নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিল। এর মধ্যে অনেকেই তার শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্য জনপদের কোনো লোককে এত উচ্চপদে কাজ করতে দেখে তারা পছন্দ করত না। ঈৰ্ষাপরায়ণ লোকেরা রাজার কাছে তার নামে অপবাদ রটাতে শুরু করল। রাজাও কিছুটা বোকাবুদ্ধির লোক ছিল। তারা রাজার কাছে গিয়ে এই বলে উসূকাল যে, বন্ধুল মল্ল রাজাকে নির্বোধ বলে প্রচার করছে। শেষটায় রাজার কাছে এমন কথাও বলল যে, সেনাপতি রাজ্য কেড়ে নিতে চেষ্টা করছে। প্ৰসেনজিতেরও সেটা ঠিক বলে মনে হল। তখন রাজা ও বন্ধুল মল্ল তাদের নিজ নিজ শক্ৰদের হাতে। খেলতে লাগল।
চিন্তাক্লিষ্ট বন্ধুলকে একদিন মল্লিকা জিজ্ঞেস করল, ‘প্রিয়! তুমি এত কি ভাবছ?’
‘রাজা আমার ওপর সন্দেহ করতে শুরু করেছে।’
‘তাহলে সেনাপতির পদে ইস্তফা দিয়ে চল না কুসীনারা চলে যাই। সেখানে আমাদের জীবিকার্জনের জন্যে কর্মান্ত (ক্ষেত্র) আছে।’
‘এর অর্থ হল রাজাকে শত্রুর হাতে ছেড়ে দেওয়া। দেখছি না, মগধরাজ অজাতশত্রু। কতবার কাশী আক্রমণ করল। আমরা একবার তাকে বন্দী করেছিলাম। মহারাজ উদারতা দেখিয়ে রাজকন্যা বজ্রার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তাকে ছেড়ে দিল। কিন্তু অজাতশত্রু সমগ্র জম্বু দ্বীপের রাজচক্রবর্তী হতে চায়, সে এ বিয়েতে চুপ হওয়ার পাত্র নয়। তার গুপ্তচরে রাজধানী ছেয়ে গেছে। আমাদের জন্য প্ৰতিবেশী অবন্তিরাজার জামাতা বৎসরাজ উদয়নের উদ্দেশ্যও ভালো নয়-সেও সীমান্তে প্রস্তুত হচ্ছে। এ সময়ে শ্রাবন্তী ছেড়ে চলে যাওয়াটা খুবই কাপুরুষের কাজ মল্লিকা!’
‘আর এটা মিত্রদোহের কাজও বটে।’
‘মল্লিকা! আমি নিজের কথা চিন্তা করি না। যুদ্ধে অনেক বার আমি মৃত্যু কবলিত হয়েও বেঁচে গিয়েছি। তাই কখনও যদি মৃত্যু আমাকে গ্রাস করে, তা হলেও সেটা আমার কাছে বড় কথা হবে না।’
পাটরানী মল্লিকা ছিল মালীর কন্যা। সাধারণ এক মালীর মেয়ে হয়েও নিজের গুণে প্রসেনজিতের পাটরাণী হয়েছিল-কিন্তু সে বেঁচে নেই। থাকলে লোকের কথায় রাজার কান এতটা ভারী হত না। একদিন রাজা সীমান্তে বিদ্রোহ দমনের নাম করে বন্ধুল মল্লের পুত্রদের পাঠিয়ে দিল। তারা জয়লাভ করে যখন ফিরছিল তখন উল্টো খবর দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বন্ধুল মল্লকে পাঠাল। এই চক্রান্তে বন্ধুল আর তার দশ পুত্রই এক জায়গায় প্রাণ দিল। যখন এ ঘটনার সংবাদ মল্লিকার কাছে পৌঁছাল। তখন সে বুদ্ধ ও তার ভিক্ষুসংঘকে ভোজন করাতে যাচ্ছিল। তার তরুণী পুত্রবধুরা খুব ভক্তি সহকারে নানা রকম খাবার তৈরি করেছিল। মল্লিকার হৃদয় দগ্ধ হতে লাগল। কিন্তু সে নিজেকে এতদূর সংযত করল যে, তার চোখ দিয়ে এতটুকু অশ্রুকণা গলিত হওয়া তো দূরের কথা, মুখ পর্যন্ত স্নান হল না! : সে চিঠিটা নিজের আঁচলে বেঁধে সমস্ত সংঘকে ভোজন করাল। ভোজনের পরে বুদ্ধের উপদেশাবলী শ্রদ্ধার সঙ্গে শুনল। তারপর চিঠিটা পড়ে শোনাল। বন্ধুলের পরিবারে যেন বজ্ৰপাত হল। মল্লিকার খুবই ধৈৰ্য কিন্তু সেই তরুণী বিধবাদের সান্ত্বনা দেওয়া বুদ্ধের পক্ষেও সহজ কাজ ছিল না।
কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর প্রসেনজিৎ সত্য ঘটনা জানতে পেরে খুবই শোকার্তা হলেন। কিন্তু তখন আর কিছু করবার উপায় ছিল না। প্রসেনজিতের মনের সান্ত্বনার জন্য বন্ধুলের ভাগিনেয় দীর্ঘকারায়ণকে নিজের সেনাপতি নিযুক্ত করল।
৫.
শীতকাল, কপিলাবাস্তুর আশেপাশের ক্ষেতে গম, ভুট্টা ও হলুদ রঙ-এর সরষে ফলেছে। আজ নগর খুবই সাজানো হয়েছে, কোনো কোনো জায়গায় তোরণ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে সংস্থাগারটিকে বেশি করে সাজানো। তিন দিন কঠোর পরিশ্রমের পরে আজ একটুখানি অবসর পেয়ে কয়েকজন দাস একটি ঘরের কোণে বসে গল্প করছিল।
কাকু বলল, ‘আমাদের দাসদের জীবন কি কোনো মানুষের জীবন? আমরা মানুষ না হয়ে যদি গরু হয়ে জন্মাতাম তা হলেও ভালো ছিল। তখন তো আর আমাদের মানুষের মতো অনুভূতি থাকত না।’
‘ঠিকই বলেছ কাকু!’ কাল আমার প্রভু দণ্ডপাণি লোহা লাল করে আমার স্ত্রীকে ছ্যাকা দিয়েছে।’
‘কেন ছ্যাঁকা দিল?’
‘কেন করল, সে কথা তার কাছে কে জিজ্ঞাসা করবে? তারা তো দাসদের পতি-পত্নী সম্বন্ধও মানতে রাজি নয়। এ সত্ত্বেও এই দণ্ডপাণি নিজেকে নিগংঠক শ্রাবক (জৈন) বলে। সে এমনি নিগংঠক যে মাটির কীট সরাবার জন্যে নিজের কাছে ময়ুরের পাখনা রাখে। দোষের মধ্যে হল যে, আমার মেয়ে কিছুদিন ধরে কঠিন অসুখে ভুগে অজ্ঞান হয়ে পড়লে আমার স্ত্রী সেই সংবাদ আমাকে দিতে এসেছিল। হতভাগী মেয়ে শেষ পর্যন্ত বাঁচল না। তা মরে গিয়ে ভালোই হয়েছে। সংসারে আমাদের মতোই তো ওকেও বাঁচতে হত! সত্যিই কাকু, আমাদের দাসদের কোনো জীবনই নয়! শুধু এই নয়, আমার মনিব বলছিলেন যে, এ ধুমধাম শেষ হলেই আমার স্ত্রীকে বেচে দেবে।’
‘তবে ওই কষাই দণ্ডপাণি লোহা দিয়ে দাগিয়েও কি তৃপ্তি পেল না?’
‘না ভাই। বার বছর পরে মেয়েটিকে পঞ্চাশ নিষ্কে (স্বর্ণমুদ্রা) বেচে দেওয়ার কথা ছিল। বিশ্বাস কর, আমরা জেনেশুনেই না-কি তার পঞ্চাশ নিষ্ক নষ্ট করে দিয়েছি।’
