অভিষেক পুষ্করিণীর ঘাটে কড়া পাহারা। সেখানে লিচ্ছবি পুত্রদের জীবনে মাত্র একবারই স্নান করবার (অভিষেক পাবার) সৌভাগ্য ঘটত-তাও আবার যখন তাকে লিচ্ছবি প্রজাতন্ত্রের ৯৯৯ জন সদস্যের কোনো একটি শূন্যস্থানে নির্বাচিত করা হত তখনই। প্রহরীগণ বাধা দিলে বন্ধুল তাদের চাবুক মেরে তাড়িয়ে দিল এবং মল্লিকাকে স্নান করিয়ে রথে তুলে খুব তাড়াতাড়ি বৈশালী থেকে বেরিয়ে পড়ল। খবর পেয়ে পাঁচ শ’ লিচ্ছবি রথী বন্ধুলের পিছু ধাওয়া করল। মহালি তা শুনে তাদের নিষেধ করল, কিন্তু গর্বিত লিচ্ছবিরা কারুর নিষেধ শোনবার পাত্র ছিল না।
দূরে রথের চাকার শব্দ শুনে মল্লিকা পেছনে ফিরে দেখে বলল, ‘প্রিয়তম! অনেকগুলি রথ পেছনে তাড়া করে আসছে।’
‘প্রিয়ে! রথগুলি যখন একটি রেখার মতো সোজা আসবে তখন আমাকে বলবে।’
মল্লিকা ঠিক সময় মতোই বলল। প্রাচীন ঐতিহাসিকরা বলেন যে, বন্ধুল তখন সজোরে একটি তাঁর নিক্ষেপ করেছিল। আর সে তাঁর না-কি পাঁচ শ’ লিচ্ছবির কোমরবন্ধ। ভেদ করে বেরিয়ে গিয়েছিল। লিচ্ছবিগণ বন্ধুলের কাছে উপস্থিত হয়ে যুদ্ধ করতে আহ্বান জানাল। বন্ধুল তখন বিনীতভাবে বলল, ‘আমি তোমাদের মতো মৃত লোকদের সঙ্গে যুদ্ধ করি না।’
‘আচ্ছা, অন্তত একবার পরীক্ষা করে দেখা যে আমরা কি রকম মৃত।’
‘আমি দু’বার কখনও তাঁর ব্যয় করি না! যাও, ঘরে ফিরে গিয়ে প্রথমেই প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ কর এবং তারপর কোমরন্ধ খুলো’–বলে বন্ধুল মল্ল মল্লিকার হাত থেকে রথের রশি নিল এবং তীরবেগে রুথ চালিয়ে লিচ্ছবিদের চোখের আড়ালে চলে গেল।
ঘরে ফিরে কোমরবন্ধ খোলার পর সত্যি-সত্যিই পাঁচ শ’ লিচ্ছবি যোদ্ধা মারা গেল।
৪.
শ্ৰাবস্তী জম্বু-দ্বীপের মধ্যে তখন সব চাইতে বড় নগরী ছিল। প্রসেনজিতের রাজ্যে শ্রাবন্তী ছাড়াও সাকেত এবং বারাণসী নামে দুটি মহানগরী ছিল। শ্রাবন্তীর সুদত্ত (অনাথপিণ্ডদ), মৃগার এবং সাকেতের অর্জনের মতো আরও অনেক কোটিপতি ব্যবসায়ী কাশী কৌশলের সম্মিলিত রাজ্যে বাস করত। তারা ব্যবসায়ের জন্যে তামলিপ্ত হতে আরম্ভ করে পূর্ব সমুদ্র (বঙ্গোপসাগর) এবং ভরুকচ্ছ (ভরোঁচি) ও সুপ্পারক (সোপারা) হয়ে পশ্চিম সমুদ্র (আরব সাগর) দিয়ে সুদূর দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত যেত। ব্ৰাহ্মণ সামন্তরা (মহাশালেরা) ক্ষত্রিয়, সামন্তদের সমতুল্য ছিল না বটে, কিন্তু তবুও সমাজের মধ্যে তারা উচ্চস্থান অধিকার করে ছিল। ঐশ্বর্যে সামন্তরা তাদের কাছে খুবই নগণ্য ছিল। সুদত্ত জেত রাজকুমারের উদ্যান।’জেতবন’ অজস্র কার্যাপণ (মুদ্রা) দিয়ে ক্রয় করেছিল এবং গৌতম বুদ্ধের জন্যে সেখানে জেতবন বিহার তৈরি করেছিল। মৃগারের পুত্র পুন্নবর্ধনের বিবাহে প্রসেনজি নিজে সদলবলে সাকেতে গিয়ে কন্যার পিতা অৰ্জ্জুন শ্ৰেষ্ঠীর অতিথি হয়েছিল। অৰ্জ্জুনের কন্যা তথা মৃগারের পুত্রবধূ বিশাখা নিজের হারের মূল্য দিয়ে সহস্র প্রকোষ্ঠের একটি সাততলা বিশাল বিহার নির্মাণ করে তার নাম রেখেছিল ‘পূর্বারাম মৃগার মাতা প্রাসাদ’। দেশ-দেশান্তরের ধন-রত্ন জড় হয়ে এইসব শ্ৰেষ্ঠীর কাছে আসত।
জৈবলী, উদালক এবং যাজ্ঞবল্কা ঋষিগণ যজ্ঞবাদকে গৌণ, দ্বিতীয় স্থান দিয়েও বাস্তবিক নিস্তারের জন্যে ব্ৰহ্মবাদের সুদৃঢ় নৌকা নির্মাণ করেছিল। জনকের মতো নৃপতিগণও বড় রকমের পুরস্কার দিয়ে ব্ৰহ্মসম্বন্ধনীয় শাস্ত্রার্থ-পরিষদ আহবান করতে লাগল, আর এগুলির মধ্যে থেকেই বেদের বাইরে চলার পথ প্রশস্ত হল। তখন দেশের মধ্যে স্বতন্ত্র চিন্তাধারার জোয়ার এসেছিল। আর বিচারক (তীর্থঙ্কর) বিচার (মতবাদ) সাধারণ সভায় লোকের নিকট উপস্থিত করত। কোথাও তার স্বরূপ মামুলি উপদেশ (অববাদ সূক্ত) রূপে হত, কোথাও কোনো বাদের আহ্বান ঘোষণা রূপে জম্বুর (জাম্) শাখা পুঁতে বেড়াত। প্রবাহণ ছাপ্পান্ন পুরুষকে ভুলিয়ে রাখার জন্যে ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকারের অনেকগুলি উপায় উদ্ভাবন করেছিল, যেমন প্ৰব্ৰজা (সন্ন্যাস), ধ্যান তপ ইত্যাদি। তখন উপনিষদের শিক্ষার বাইরের আচাৰ্যও নিজ স্বতন্ত্র বিচারের সঙ্গে প্ৰব্ৰজ্যা (সন্ন্যাস) ও ব্রহ্মচর্যের ওপর বিশেষ জোর দিত। অজিত কেশকম্বল একেবারেই জড়বাদী ছিল। সে ভৌতিক (জড়) পদার্থ ছাড়া আত্মা, ঈশ্বরভক্তি, নিত্য-তত্ত্ব অথবা স্বৰ্গ-নরক-পুর্নজন্মবাদ মানত না; তবুও সে নিজে গৃহত্যাগী ব্ৰহ্মচারী ছিল। তখনকার সামন্ত শাসনকর্তার সহানুভূতির পাত্র তো সে ছিলই না; বরং তাদের রোষানলের হাত থেকে বাঁচবার জন্যেও নিজের জড়বাদকে ধর্মের রূপ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেছিল। ব্ৰাহ্মণ-সামন্ত, লৌহিত্য-ও পায়াসীর মতো রাজন্য সামন্তগণ কিন্তু জড়বাদী ছিল। আর তারা তাদের মতবাদের জন্যে এতই প্রসিদ্ধ ছিল যে, জড়বাদকে পরিত্যাগ করা লজ্জাজনক কাজ মনে করত। তবুও তাদের জড়বাদ সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর ছিল না।
জড়বাদের প্রচার সত্ত্বেও ব্রাহ্মণ-ক্ষত্ৰিয় সামন্তগণের ও ধনুকের ব্যবসায়ীদের বেশি। আস্থা ছিল গৌতম বুদ্ধের অনাত্মবাদের ওপর-বিশেষত কৌশলের। এর বিশেষ একটি কারণ হল যে, গৌতম নিজে কৌশলের অন্তর্গত শাক্য গণের (শাক্য-প্রজাতন্ত্র) অধিবাসী ছিল। সেও জড়বাদীদের মতো বলত-আত্মা, ঈশ্বর ইত্যাদি নিত্যবস্তু পৃথিবীতে নেই, সর্ব বস্তুই উৎপন্ন হয় এবং অচিরেই বিলীন হয়ে যায়। সংসার কতকগুলি বস্তুর প্রবাহ নয়, বরং ঘটনাবলীর স্রোত। তার প্রচারিত মতবাদ জ্ঞানীরা খুবই যুক্তিসঙ্গত ও হৃদয়গ্রাহী বলে মনে করত। কিন্তু ওই অনাদিবাদে লোক-মর্যাদা, ধনী-গরীব, দাস-স্বামীর প্রভেদ নষ্ট হয়, তাই অজিতের জড়বাদ সামন্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর মধ্যে প্রিয় হতে পারল না। গৌতম বুদ্ধ নিজের অনাত্মবাদ ও জড়বাদের মধ্যে আর কিছু যোগ করে তার তিক্ততা কিছুটা দূর করল। তার মতে আত্মা নিত্য না হলেও চেতনা-প্রবাহ স্বৰ্গ কিংবা নরকের মানুষের মধ্যে এক দেহ হতে আর এক দেহে-এক শরীর-প্রবাহ হতে আর এক শরীর প্রবাহে সঞ্চারিত হয়। এ বিচার অনুযায়ী প্রবাহণ রাজার আবিষ্কৃত হাতিয়ার ছিল, আর তার জন্যেই পুনর্জন্মবাদের পুরোপুরি স্থিতির জায়গা হল। যদি গৌতম বুদ্ধ নিছক জড়বাদেরই প্রচার করত তা’ হলে নিশ্চয়ই শ্রাবস্তী, সাকেত, কৌশাম্বী, রাজগৃহ, ভদ্রকার শ্ৰেষ্ঠীরা অজস্র টাকা ব্যয় করত না এবং ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় সামন্তরা ও রাজারা তার পায়ের ধূলি সেবার জন্যে ভীড় করত না। শ্রাবস্তীর উচ্চশ্রেণীর স্ত্রীলোকদের গৌতমবুদ্ধের মতবাদে অগাধ বিশ্বাস ছিল। প্রসেনজিতের পাটরাণী মল্লিকা দেবী বৌদ্ধধর্মের প্রতি খুব অনুরক্ত ছিল। তার নগরস্থিত শ্ৰেষ্ঠীর, পুত্রবধু তার সখী বিশাখা বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন-স্বরূপ পূর্বারামের মতো একটি মহা-বিহার নির্মাণ করে বুদ্ধদেবকে দান করেছিল। সেনাপতি বন্ধুল মল্লের স্ত্রী পাটরাণী মল্লিকার অত্যন্ত প্রিয় সখী ছিল, তার অনুপ্রেরণায় সেও বুদ্ধের উপদেশাবলী শুনে কিছুদিন পরে বুদ্ধের উপাসিকা হয়ে পড়ল।
