‘প্রত্যেকটা খোঁটার মধ্যে লোহার শলাকা ছিল। পঞ্চম খোঁটাটা কাটা পর্যন্ত আমি জানতে পারিনি। ষষ্ঠ খোটা কাটার পর আমি ঝিন্-করে ওঠা পরিষ্কার একটা শব্দ শুনতে পাই আমি ধোঁকাবাজী বুঝতে পারলাম। যদি শব্দটা শুনতে না পেতাম তাহলে সপ্তম খোটাও নিশ্চয় কাটতে পারতাম। কিন্তু শব্দ শোনার পর আমার মন বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ল।’
‘এ রকম বিশ্বাসঘাতকতা যারা করেছে তারা খুবই নীচ!’
’কে এ রকম করেছে তা আমি জানতে পারিনি। রোজ মল্লের ওপর আমার কোনো রাগ নেই। কেননা সে উচিত কথাই বলেছিল, আর তার মতের সঙ্গে গণের বেশির ভাগ সদস্য একমত ছিল। কিন্তু আমার দুঃখ ও রাগ হচ্ছে এই জন্যে যে, কুসীনারায় আমাকে স্নেহ করার লোকের এত অভাব!’
‘তা’ হলে বন্ধুল তুমি কুসীনারার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছ?’
‘কুসীনারা আমার মাতৃতুল্য, এ দেশ আমাকে লালন-পালন করে বড় করেছে। কিন্তু এখন আমি আর কুসীনারায় থাকব না।’
‘কুসীনারা ছেড়ে চলে যেতে চাও?’
‘হ্যাঁ! কারণ, কুসীনারায় এখন বন্ধুল মল্লের কোনো প্রয়োজন নেই।’
‘তাহলে কোথায় যাবে?’
’মল্লিকা, তুমি আমার সঙ্গী হবে?’ – উদ্বিগ্ন মুখে বন্ধুল জিজ্ঞাসা করল।
’আমি তোমার ছায়ার মতো, বন্ধুল!’ মল্লিকা বন্ধুলের লাল চোখ দুটিতে চুম্বন করল আর মুহূর্তের মধ্যে তার রুক্ষতা বিলীন হয়ে গেল।
‘মল্লিকা! তোমার হাত আমাকে দাও।’ মল্লিকার হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বন্ধুল বলল, ‘তোমার এ হাত আমার শক্তির উৎস, এ হাত পেলে বন্ধুল যে কোনো জায়গায়। নিৰ্ভয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে।’
‘প্রিয়তমা! তবে কোথায় যাবে ঠিক করলে এবং কবেই বা যাবে?’
‘মুহূর্তকালও আর দেরী করতে চাই না, কেননা খোঁটার মধ্যে লৌহশিলাকার খবর গণপতি পাবেই এবং তারপর আবার সে আমার পরীক্ষার দিন ঠিক করবে। কাজেই লোকের উৎসাহ প্ৰকাশ পাবার আগেই আমাদের যাত্রা করা চাই।’
‘অন্যায়ের বিচার হতে কেন দিচ্ছ না?’
‘কুসীনারা আমার সম্বন্ধে তার মত প্ৰকাশ করেছে, মল্লিকা! এখানে আমার প্রয়োজন নেই-অন্তত এ সময়। কুসীনারায় যখন আমার প্রয়োজন হবে, তখন আবার ফিরে আসব।’
সঙ্গে নিয়ে চলার উপযোগী প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বন্ধুল এবং মল্লিকা সেই রাতেই কুসীনারা ছেড়ে চলে গেল। দ্বিতীয় দিন অচিরাবতীর (রান্তী নদীর) তীরে অবস্থিত ব্ৰাহ্মণদের মল্লগ্রামে। (মলীও, গোরখপুর) পৌঁছাল। সেখানে বন্ধুলের একজন বন্ধুও ছিল, কিন্তু বন্ধুল তার সঙ্গে দেখা করল না। সে গ্রামে গিয়েছিল। এই ভেবে যে, সেখান থেকে নৌকাযোগে শ্রাবন্তী (সহেট-মহেট, গোঞ্জ জিলা) চলে যাবে। মল্লগ্রামে শ্ৰেষ্ঠী সুন্দত্তের লোক বাস করত; তার সাহায্যে নৌকা যোগাড় করা সহজ হল।
২.
শ্ৰাবস্তীর রাজধানীতে কৌশলরাজ প্রসেনজিৎ নিজ সহপাষ্ঠী বন্ধুল মল্লকে স্বাগত জানোল। তক্ষশিলায় থাকতেই প্ৰসেনজিৎ ইচ্ছা প্ৰকাশ করেছিল যে, ‘আমি রাজা হলে, বন্ধুল তোমাকে আমার সেনাপতি হতে হবে।’ রাজা হওয়ার পর সে অনেকবার এর জন্যে বন্ধুলকে লিখে জানিয়েছিল, কিন্তু বন্ধুল কোশল-কাশীর মতো সমৃদ্ধশালী এবং বিশাল রাজ্যের সেনাপতি হওয়ার চাইতে স্বীয় জন্মভূমি কুসীনারার গণের একজন সাধারণ উপসেনাপতির মর্যাদাকেই ওপরে স্থান দিয়েছিল। কিন্তু এখন কুসীনারাই তাকে বিতাড়িত < করল, তাই প্ৰসেনজিতের প্রস্তাব শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করতে সে রাজী হল।
বলল, ‘আমি তোমার প্রস্তাব গ্রহণ করতে রাজী। কিন্তু কয়েকটি শর্ত থাকবে।’
‘সানন্দে তা বলতে পার বন্ধু।’
‘আমি মল্লপুত্র বোধহয় তা তুমি জানি।’
‘হ্যাঁ জানি, এবং আমি তোমাকে কখনও মল্লদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলব না।’
‘আচ্ছা, আর আমার কোনো শর্ত নেই।’
‘মল্লদের সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক আছে আমি তা সর্বদাই বজায় রাখতে চাই, বন্ধু! তুমি বোধহয় জান যে, আমার কোনো রাজ্য-বিস্তারের বাসনা নেই। তবে যদি কোনো কারণে মল্লদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, তাহলে তুমি স্বাধীনভাবে যে কোনো একপক্ষ গ্ৰহণ করতে পারবে বন্ধু। আমি তোমার জন্যে আর কি করতে পারি?’
‘না, মহারাজ! এই যথেষ্ট।’
৩.
বন্ধুল মল্ল কৌশল সেনাপতি নিযুক্ত হল। প্রসেনজি যে রকম নম্র ও উদ্যমহীন রাজা তাতে তার এ রকম একজন সেনাপতিরই প্রয়োজন ছিল। বাস্তবিকই যদি বন্ধুল মল্লকে সে না পেত তাহলে হয়ত মগধ এবং ‘বৎস’ তার রাজ্যের বেশ কিছুটা অংশ অধিকার করে নিত।
শ্রাবস্তী নগরে পৌঁছাবার কিছুকাল পরে মল্লিকার গর্ভলক্ষণ প্রকাশ পেল। বন্ধুল একদিন জিজ্ঞাসা করল, ‘প্রিয়ে তোমার কোনো জিনিসের দোহদ (সাধ) হলে বল।’
‘হ্যাঁ, দোহদ হয় প্রিয়তমা! কিন্তু সেটা বড় দুষ্কর।’
‘বন্ধুল মল্লের পক্ষে কিছুই দুষ্কর নয় মন্ত্রিকা! বল, তোমার কিসের দোহদ।’
‘মল্লদের?’
‘না বৈশালীর লিচ্ছবিদের।’
‘ঠিকই বলেছ। মল্লিকা! তোমার দোহদ খুবই দুষ্কর। কিন্তু যত দুষ্করই হোক বন্ধুল মন্ত্র। সেটা পূর্ণ করবেই। কাল সকালে প্রস্তুত থেক, আমরা দু’জনেই রথে যাব।’
পরের দিন পাথেয় নিয়ে, খড়গ, ধনুক ইত্যাদিতে সজ্জিত হয়ে দু’জনেই রথে যাত্রা করল। কয়েক সপ্তাহ ধরে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একদিন বন্ধুলের রথ বৈশালীর দ্বারে গিয়ে প্রবেশ করল, যেখানে একদল লিচ্ছবির ঈর্ষার জন্যে বন্ধুলের সহপাঠী মহালি বন্ধ হয়েছিল। মহালি ছিল সেখানকার একজন অধ্যক্ষ। বন্ধুল একবার ভাবল যে মহালির সঙ্গে দেখা করবে, কিন্তু তাতে মল্লিকার দোহন্দু-এ বিঘ্ন ঘটতে পারে ভেবে সে নিজের ইচ্ছা দমন করল।
