সন্ধ্যা হয়ে এল, তখনও মাংস রান্না শেষ হয় নি। অগ্নিকুণ্ডের পোড়া-কাঠ স্কন্ধাগ্নি (কাঠের গুড়ির আগুন) তখনও নিভে যায় নি, তার লাল আভা যথেষ্ট ছিল। সেই রক্তিম সন্ধ্যায় মল্লরা নাচতে ও গাইতে শুরু করল। মল্লিকা, কুসীনারার সুন্দরতম তরুণী, শিকারীবেশে পূর্ণ সাফল্যের সঙ্গে স্বীয় নৃত্যকৌশল প্রদর্শন করল।
কুসীনারার সংস্থাগার (প্রজাতন্ত্রভবনের সভাগৃহ) আজ জনাকীর্ণ। গণসংস্থার (প্রতিনিধি পরিষদের) সকল সদস্য সদস্যশালার মধ্যে উপবিষ্ট। অনেক দর্শনেছু নর-নারী বাইরের মাঠে দাঁড়িয়েছিল। সদস্যশালার মাথার দিকের একটি উঁচু বেদীতে সভাপতি বসেছিল এসে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ভন্তেগণ! (পূজ্যগণ) শোন, আজ যে কাজের জন্যে আমরা এই সভায় উপস্থিত হয়েছি, তা আমি সকলের কাছে বলছি। আয়ুম্মান বন্ধুল তক্ষশিলা থেকে যুদ্ধবিদ্যা অর্জন করে মল্লদের গৌরব-বর্ধন করে ফিরে এসেছে। তার অস্ত্ৰনৈপুণ্যের কথা কুসীনারার বাইরের লোকও জানে। চার বছর হল সে এখানে এসেছে। আমি গণসংস্থার ছোটখাটো কাজগুলি তাকে করতে দিয়েছি, এবং সে প্রত্যেকটি কাজই খুব তৎপরতার ও সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেছে। গণের এখন উচিত তাকে একটা স্থায়ী পদে। নিযুক্ত করা-উপসেনাপতির পদের জন্য আমি তার নাম প্রস্তাব করছি। ভন্তে গণ! শোন, গণের পক্ষ থেকে আয়ুষ্মান বন্ধুলকে উপসেনাপতির পদে নিযুক্ত করার প্রস্তাব হচ্ছে। যে এ প্রস্তাবের পক্ষে সে নীরব থাক, আর যে বিরুদ্ধে–সে বলতে পোর। ভন্তে গণ! আবার বলছি, আয়ুষ্মান্য বন্ধুলকে গণের পক্ষ থেকে উপসেনাপতির পদ প্ৰদান করার প্রস্তাব করছি। যে এতে রাজী আছে সে নীরব থাক। আর যার আপত্তি আছে সে বলতে পার। ভন্তে গণ! আমি তৃতীয়বার বলছি, আয়ুষ্মান্য বন্ধুলকে গণসংস্থা সহকারী সেনাপতি নিযুক্ত করার প্রস্তাব। করছি। যে আয়ুষ্মান এতে রাজী আছে সে নীরব থাক আর যে রাজী নয়। সে তার বক্তব্য বলতে পার।‘
এমন সময় একজন সদস্য, রোজ মল্ল–চাদর সরিয়ে দিয়ে ডান কাঁধ খালি করে উঠে দাঁড়াল! সভাপতি জিজ্ঞাসা করল, ‘আয়ুষ্মান তুমি কিছু বলতে চাও? ঠিক আছে, তোমার বক্তব্য বল।’
রোজ মন্ত্র সকলকে সম্বোধন করে বলল, ‘ভন্তে গণ! আমি আয়ুষ্মান বন্ধুলের যোগ্যতা? সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ পোষণ করি না। তবে, আমি বিশেষ কোনো কারণে তাকে সহকারী ; সেনাপতি করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করছি। আমাদের গণের নিয়ম আছে যদি কাউকে। উচ্চপদে নিযুক্ত করা হয় তবে তার পরীক্ষা গ্ৰহণ করতে হবে। আমি তাই মনে করি আয়ুষ্মান বন্ধুলের বেলায়ও সে নিয়ম প্রয়োগ করা হোক।’
রোজ মন্ত্র বসার পরে আরও দু’তিন জন সদস্যও একই কথা বলল। আবার কিছু সদস্য পরীক্ষা গ্রহণের যে কোনো প্রয়োজন নেই তার ওপর বিশেষ জোর দিল। অবশেষে গণপতি বলল, ‘ভন্তে গণ! শোন, আয়ুষ্মান্য বন্ধুলকে সহকারী সেনাপতি নিযুক্ত করতে গণের মধ্যে কিছুটা মতভেদ দেখা দিয়েছে। তাই ছন্দ (ভোট) নেওয়া প্রয়োজন। শলাকা-গ্ৰহাপক (শলাকা বিতরণকারী) ছন্দ-শলাকা (ভোট গুণবার কাঠি) নিয়ে তোমাদের কাছে যাচ্ছে। তার এক হাতের ডালিতে লাল কাঠি এবং অন্য হাতের ডালিতে কালো কাঠি। লাল কাঠি হল প্রস্তাবের পক্ষে আর কালো কাঠি হল প্রস্তাবের বিপক্ষে। সে আয়ুম্মান রোজ মল্লের পক্ষে অর্থাৎ মূল জ্ঞপ্তির (প্রস্তাব)। বিরোধী, সে কালো কাঠি, এবং মূল জ্ঞপ্তির যে পক্ষেসে লাল কাঠি নেবে।’
শলাকা-গ্ৰহাপক ছন্দ-শলাকাগুলি নিয়ে একে এক প্রত্যেক সদস্যের কাছে গেল। সকলেই নিজ নিজ ইচ্ছানুসারে একটি করে শলাকা নিল; শলাকা-গ্ৰহাপক ফিরে এলে গণপতি বাকি শলাকাগুলি গণনা করল। দেখা গেল, লাল শলাকা বেশি আর কালো কম। তার অর্থ হল, সদস্যগণ কালো শলাকাই বেশি নিয়েছে।
গণপতি ঘোষণা করল, ‘ভন্তে গণ! শোন, কালো শলাকা অধিক সংখ্যক সদস্য নিয়েছে। তাই আমি ঘোষণা করছি যে গণ আয়ুষ্মান্য রোজ মল্লের সঙ্গে একমত। এখন তোমরা ঠিক কর আয়ুষ্মান বন্ধুলের কিভাবে পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে!’
ছন্দ-শলাকা ওঠবার পরে অনেকক্ষণ ধরে তর্ক-বিতর্ক চলল, শেষে ঠিক হল যে, বন্ধুল মলুকে কাঠের সাতটা খোটা এক সঙ্গে তরবারী দিয়ে কাটতে হবে।
নির্দিষ্ট দিনে কুসীনারার স্ত্রী-পুরুষের সমাগমে মাঠ ভরে গেল। মন্ত্রিকাও সেখানে উপস্থিত। সাতটি শক্ত কাঠের খোঁটা পাশাপাশি পুঁতে দেওয়া হল। গণপতি আদেশ করার পর বন্ধুল তরবারি বাগিয়ে নিল। সমস্ত জনমণ্ডলী রুদ্ধ নিশ্বাসে দেখতে লাগল। বন্ধুল মল্লের। সুদৃঢ় হাতে সেই ঋজু, দীণু খ দেখে লোকে তার সাফল্য সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত ছিল। বিদ্যুতের মতো উজ্জ্বল বন্ধুলের তরবারী লোকে উঠতে নামতে দেখল—প্রথম খোটা কাটল, তারপর দ্বিতীয়, তৃতীয় এইভাবে ষষ্ঠ খোটা কাটবার সময় বন্ধুলের কানে একটা ধাতব শব্দ ভেসে এল। তাঁর ভ্রূ কুঞ্চিত হয়ে উঠল এবং হতাশায় তার তরবারি থেমে রইল। বন্ধুল তাড়াতাড়ি একবার সবগুলো খোঁটার মাথা দেখে নিল। রাগে তাঁর শরীর কাঁপছিল, মুখ লাল হয়ে গেল, কিন্তু সে একদম চুপ করে রইল।’
গণপতি ঘোষণা করল যে, সপ্তম-খোঁটার মাথা খণ্ডিত হয় নি। কিন্তু তবু লোকের সহানুভূতি বন্ধুল মল্লের প্রতিই ছিল।
ঘরে ফিরে মল্লিকা বন্ধুলের রক্তিম এবং গভীর চেহারা লক্ষ্য করে তাকে সান্ত্বনা দিতে চাইল। বন্ধুল বলল, ‘মল্লিকা! আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। এ রকম যে করা হবে তা আমি আশা করিনি।’
