‘আমরা এক সঙ্গে দশ বছর তক্ষশিলায় পড়াশুনা করেছি, তিনি তাই আমাকে স্নেহ করেন এবং আমার গুণগ্রাহী।’
‘কুসীনারার মন্ত্ররা নিশ্চয়ই সেটা জানে। মহালিচ্ছবি যখন এখানে এসে তোমার সঙ্গে ছিল তখন কুসীনারার অনেক লোকই তোমার গুণকীর্তন শুনেছে তার কাছে।’
‘কিন্তু মল্লিকা! আমার প্রতি তারাই ঈৰ্ষা করে, যারা আমার গুণের কথা জানে। গুণী এবং সর্বপ্ৰিয়া হওয়াটাই হল প্রজাতন্ত্রের ঈর্ষার বড় কারণ। আমি নিজের জন্যে মোটেই ভাবি না, কিন্তু আমার দুঃখ এই জন্যে যে, এত কষ্ট করে মন্ত্রদের সেবার জন্যে তক্ষশিলাতে অস্ত্ৰ-বিদ্যা শিখেছিলাম, তা কোনো কাজে লাগাতে পারলাম না। আজ যেমন বৈশালীর লিচ্ছবীিদের কৌশল এবং মগধ নিজেদের সমতুল্য মনে করে, তখন কিন্তু কুসীনারা কোশলরাজকে নিজেদের চেয়ে বড় বলে স্বীকার করত না। আমি ভেবেছিলাম যে, পাবা অনুপিয়া ও কুসীনারাদি ন’টি মল্লকে আমরা স্নেহবন্ধনে বেঁধে লিচ্ছবিদের মতো নিজেদের একটি সম্মিলিত সুদৃঢ় মল্ল প্রজাতন্ত্র গঠন করব। ন’টি মল্ল যদি পরস্পর মিলিত হত তাহলে প্ৰসেনজিৎ আমাদের দিকে চোখ তুলে চাইতেও সাহস করত না। তা আর হল না, এটাই আমার দুঃখ।’
বন্ধুলের গৌরকান্তি স্নান হওয়াতে মল্লিকার দুঃখ হল, সে তার মনকে বিষয়ান্তরে নিয়ে যাবার জন্যে বলল, ‘প্রিয়তম, তোমার বন্ধুরা শিকারে যাবার জন্যে হয়ত তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে, আর আমিও যেতে চাই। ঘোড়ায় চড়ে যাবে–না পায়ে হেঁটে?’
‘গবয় (নীলগাই) শিকার ঘোড়ায় চড়ে হয় না মল্লিকা, আর হাঁটু পর্যন্ত অন্তর্বােস পরে তিন্ন হাত লম্বা এলোমেলো উত্তরাসঙ্গ উড়িয়ে আর এই রকম নীটস্কো খুস্কো কাল-নাগিনীর মতো চুল দুলিয়ে কেউ শিকার করতে যায়?’
‘এ-সব বুঝি তোমার ভালো লাগে না?’
‘খারাপ!’ বলার সঙ্গে সঙ্গে মল্লিকার টুকটুকে ঠোঁটে চুম্বন করে বন্ধুল বলতে লাগল, ‘মল্লিকা নামের সঙ্গেও যার মিল আছে তাকেও আমার খারাপ লাগতে পারে না, কিন্তু শিকার করতে গেলে জঙ্গলে ঝোঁপের মধ্যে ছুটোছুটি করতে হয় যে।’
‘আচ্ছা, তাহলে তোমার সামনেই বেঁধে ফেলি।’ এই বলে মল্লিকা অন্তর্বাস কষে পরল, আর চুলগুলি সামনে খোঁপা বেঁধে বলল, ‘আমার চাদর দিয়ে পাগড়ী বেঁধে দাও, বন্ধুল!’
পাগড়ী বেঁধে দিয়ে বন্ধুল তার কাচুলির ভেতর থেকে উন্নত ক্ষুদ্র-বিল্ব-স্পর্ধী স্তন অর্ধালিঙ্গন করে বলল, ‘আর এ স্তন?’
‘সব মল্লকুমারীদেরই স্তন হয়।’
‘কিন্তু এ কত সুন্দর?’
‘তাতে কি! কেউ কি এ জিনিস কেড়ে নেবে?’
‘এ যে বন্ধুলের তা তারা জানে।’
‘না, মল্লিকা! তোমার আপত্তি না থাকলে আমি চাদর দিয়ে বেঁধে দি।’
‘কাপড়ের বাইরে থেকে দেখে কি তোমার তৃপ্তি হচ্ছে না?—মল্লিকা মুচকি হেসে বন্ধুলের মুখে চুম্বন করে বলল। বন্ধুল তার কাচুলিটা সরিয়ে দিয়ে শুভ্ৰ স্ফটিকশিলার মতো বুকের ওপর সেই আরক্ত সুডৌল স্তন চাদর দিয়ে বেঁধে দিল। মল্লিকা আবার কাচুলিটি পরে বলল, ‘এখন তো তোমার বিপদ কেটে গেছে বন্ধুল?’
‘বন্ধুলের নিজের জিনিসের জন্যে কোনো ভয় নেই প্রিয়ে! তুমি এখন খুব দ্রুত ছুটলেও ও দুটো বেশি দুলবে না।’
‘সমস্ত মল্ল তরুণ-তরুণীরা শিকারী বেশে সজ্জিত হয়ে এই তরুণ-যুগলের প্রতীক্ষা করছিল। তারা আসতেই সবাই ধনুক, খড়গ, ভল্ল বাগিয়ে রওনা হল। নীলগাই-এর মধ্যাহ্ন। বিশ্রামের জায়গা তাদের মধ্যে কারো কারো জানা ছিল। তাদের প্রদর্শিত পথ ধরেই মল্লরা চলল। বড় বড় গাছের অল্প পত্ৰহীন ছায়ার নিচে নীলগাইয়ের একটি দল বসে রোমন্থন করছিল। যুথপতি একটি বড় নীলগাই, খাড়া কান আগু পিছু করে পাহাড় দিচ্ছিল। মন্ত্ররা দু’দলে ভাগ হয়ে গেল—এক দল হাতিয়ার বাগিয়ে একটি গাছের আড়ালে গিয়ে বসল। অন্য দলটি আবার দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে জায়গাটি ঘিরবার জন্যে এগোতে লাগল। যেদিক থেকে এই দু’দল মিলাবার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল সে ধার থেকেই বাতাস আসছিল। নীলগাইটি তখনও তার হরিণের মতো ছোট লেজটি নাড়ছিল, দল দুটি মিলাবার আগেই অন্যান্য গাইগুলিও উঠে দাঁড়িয়ে নাক ফুলিয়ে কান সামনের দিক করে চঞ্চল হয়ে সেদিকে দেখতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যেই বুঝতে পারল যে, তারা বিপদগ্ৰস্ত হয়ে পড়েছে, তাই বাতাসের গতির সঙ্গে তারাও ছুটতে লাগল। তখনও পর্যন্ত বিপদ স্বচক্ষে দেখেনি। তাই মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে দেখছিল।
লুকিয়ে থাকা শিকারীদের কাছে এসে একবার তারা পেছন দিকে তাকিয়ে, এমন সময় ধনুকের টঙ্কার শোনা গেল। যুথপতি নীলগাইটির ঠিক কলিজা লক্ষ্য করে বন্ধুল অব্যৰ্থ শরসন্ধান করল। সঙ্গে সঙ্গে মল্লিকা এবং আরও অনেক বাণ ছুড়ল। কিন্তু বন্ধুলের বাণ ব্যর্থ হলে শিকার যে পালাত–সে কথা নিশ্চিত। নীলগাইটি সেখানেই পড়ে গেল। দলের অন্যান্য গরুগুলি ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিকে সেদিক ছুটিল, বন্ধুল কাছে গিয়ে দেখল শিকার শেষ নিশ্বাস নিচ্ছে। রক্তের চিহ্ন অনুসরণ করে চলতে চলতে এক ক্রোশ দূরে আর একটি গবয়কে মাটিতে লুটানো অবস্থায় পাওয়া গেল এই সাফল্যের জন্যে আজকের বনভোজনে আনন্দ-উচ্ছাস বেশি।
কিছু লোক নিধুম আগুন প্ৰজলিত করতে লেগে গেল, আর মন্ত্র স্ত্রীলোকেরা রান্নার জন্য হাঁড়িপাত্র প্রস্তুত করল। কিছু পুরুষ নীলগাই-এর চামড়া খুলে মাংসখণ্ড কাটতে লাগল। সর্ব প্রথম আগুনে পোড়ানো কলিজা ও সুরা-চষক (মদের পাত্র) সকলের সামনে। পরিবেশন করা হল। মাংস কাটতে বন্ধুলের দু’হাত আটকা ছিল, তাই মল্লিকা নিজের হাতে ওর মুখে মাংস ও মদের পেয়ালা তুলে দিল।
