‘পিসীমা, আমি কিন্তু এইভাবে বুঝিনি।’
‘তুমি কেন, অনেকেই বোঝেনি। তবে বিদেহরাজ জনক এর রহস্য (উপনিষদ) বুঝে। আর যাজ্ঞবল্ক্য এটা ভালোই বুঝে–যেমন আমার পতি প্রবাহণ বুঝত। প্রবাহণ কোনো দেবতা, দেবলোক, পিতৃলোক, যজ্ঞ বা ব্ৰহ্মবাদে নিজে বিশ্বাস করত না। তার অখণ্ড বিশ্বাস ছিল ভোগে, আত্মসুখে। সে নিজের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ভোগেই অর্পণ করেছিল। মরবার তিনদিন আগেও বিশ্বামিত্র কুলের পুরোহিতের সুবৰ্ণকেশী কন্যা তার রূতিগৃহে এসে রাত্রিবাস করেছিল। এদিকে বাঁচবার কোনো আশাই ছিল না, তবু সে বিশ বছরের তরুণী সুন্দরীর সঙ্গে রাত্রিবাস করত।’
‘পরিষদে জয়লাভ করে যাজ্ঞবল্ক্য যে সমস্ত গাভী পেয়েছিল তা দান করে দেয় ব্ৰাহ্মণদের মধ্যে কিন্তু বিদেহ রাজার কাছ থেকে পাওয়া সুন্দরী দাসীদের অন্তঃপুরে নিয়ে এসেছে, পিসীমা।’
‘আমি তো সেই কথাই বলছিলাম, যাজ্ঞবল্ক্য প্রবাহণের পাক্কা চেলা। ও ব্ৰহ্মবাদ দেখলি তো? আর তুই দেখছিস দূর থেকে। যদি কাছ থেকে দেখবার সুযোগ পেতিস বেটি, তাহলে ওদের আসল চরিত্র বুঝতে কোনো মুস্কিল হত না।’
‘তবে কি পিসীমা, তুমি সত্যি সত্যিই মনে কর যে, আমি যদি আর কোনো প্রশ্ন করতাম তাহলে আমার মাথা পড়ে যেত?’
‘নিশ্চয়ই! কিন্তু যাজ্ঞবল্ক্যের ব্ৰহ্মতেজে নয়। দুনিয়াতে কত মাথাই না নিঃশব্দে দেহত্যুত হয়েছে!’
‘আমার মাথা ঘুরছে।’
‘আজ? আমার মাথা ঘুরছে তখন থেকে যখন আমার জ্ঞান হয়েছে। সমস্ত ছলনা, খালি কথার কারসাজি। প্রজাদের পরিশ্রমার্জিত ফল বিনা পরিশ্রমে ভোগের পথই হল। রাজবাদ, ব্ৰহ্মবাদ ও যজ্ঞবাদের মূল কথা। এই জালিয়াতি থেকে প্রজাদের কেউ বাঁচতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত ওরা নিজেরা সচেতন না হচ্ছে। আর তাদের সচেতন হতে দেওয়া এ স্বাৰ্থবাদীরা মোটেই পছন্দ করে না।’
‘মানব হৃদয় কি আমাদের এ প্রবঞ্চনাকে ঘৃণা করতে প্রেরণা দেবে না?’
‘দেবে মা দেবে! আর আমি একমাত্র সেই আশাতেই বেঁচে আছি।’*
———-
* ১৪৪ পুরুষ আগেকার কাহিনী। এই সময় আদি ঋষিরা-বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র ও ভরদ্বাজ ঋগ্বেদের শ্লোকসমূহ রচনা করেছিলেন। আর পঞ্চালভূমির রাজন্যবর্গ এইসব আর্যপুরোহিতদের সাহায্যে পুরাকালের গণতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থার মূলে চূড়ান্তভাবে আঘাত হানতে পেরেছিল।
০৯. বন্ধুল মল্ল (কাল : ৪৯০ খৃষ্টপূর্ব)
পূর্ণ বসন্ত কাল। গাছগুলির পাতা ঝরে গিয়ে নবপল্লবিত হয়েছে। শাল বৃক্ষগুলি তার শ্বেতপুষ্পের সুগন্ধ ছড়িয়ে বনভূমি আমোদিত করছে। সূর্য-কিরণ প্রখর তেজে দীপ্ত হতে এখনও দেরী আছে। শালের গহন বনে শুকনো পাতার ওপর মানুষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। দু’জন তরুণ-তরুণী পথ চলতে চলতে থমকে দাঁড়িয়ে নিরীক্ষণ করতে লাগল একটি বড় বলীক (উই টিপি)। তরুণীর গৌরকান্তি মুখের ওপর কুঞ্চিত পিঙ্গল কেশরাশি চারিদিকে বেপরোয়ার মতো ছড়িয়ে থাকার সৌন্দর্য যেন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তরুণ তার বলিষ্ঠ হাতখনি তরুণীর কাঁধের ওপর রেখে বলল, ‘মল্লিকা! এই বলীক দেখে এত তন্ময় হলে কেন?’
‘দেখ এটা কত উঁচু, প্রায় দুই মানুষ সমান হবে।’
‘হ্যাঁ, ঠিকই, এটা সাধারণ উই টিপির চেয়ে বড়, কিন্তু বলীকের উচ্চতা এর চেয়ে বেশি দেখা যায়। তোমার হয়ত মনে হতে পারে বর্ষা শুরু হলে এর থেকে কি সত্যিই আগুন ও ধোঁয়া বেরোয়?’
‘না, ওটা বোধহয় কিংবদন্তী মাত্র। কিন্তু এই পিঁপড়ের মতো ছোট এবং কোমল রক্তমূখী সাদা পোকাগুলি কেমন করে এত বড় বল্মীক তৈরি করল?’
‘মানুষের শরীরের উচ্চতার সঙ্গে যদি তার হাতে-গড়া বাসস্থান মাপা যায় তাহলে তাও এই রকমই কয়েক গুণ বড় হবে। এ একটা উইপোকার কাজ নয়। শত সহস্ৰ উইপোকা মিলিতভাবে এই কাজ সম্পন্ন করেছে। মানুষও এইভাবেই মিলিত হয়ে নিজের কাজ করে।’
‘তাই আমিও ঔৎসুক্যের সঙ্গে লক্ষ্য করছিলাম যে, এদের নিজের মধ্যে কতই না মিল। এদের আমরা কত ক্ষুদ্র প্রাণী ভেবে থাকি, এরাও শত সহস্ৰ এক সঙ্গে মিলে নিজেদের জন্যে প্রাসাদোপম বাসস্থান নির্মাণ করেছে। আমার দুঃখ হয়, আমাদের মন্ত্ররা এই উইয়ের কাছে থেকে কোনো শিক্ষাই গ্ৰহণ করেনি।’
‘মানুষ মিলে-মিশে থাকতে কারুর চাইতে কম যায় না, বরং মানুষ যে আজ শ্ৰেষ্ঠ প্রাণী হতে পেরেছে তারও কারণ হচ্ছে একতা। আর এই জন্যেই মানুষ আজ এত বড় বড় নগর ও গ্রাম তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে; তাই তাদের জলযান দিগন্তহীন সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দ্বীপ-দ্বীপান্তরের ধনরত্বে সংগ্রহ করেছে; আর এই জন্যেই হাতী-গণ্ডার-সিংহ মানুষের কাছে হার মানতে বাধ্য হচ্ছে।’
‘কিন্তু মানুষের ঈর্ষা? এই ঈর্ষা যদি মানুষের না থাকত–কত ভালো হত।’
‘তুমি মল্লদের ঈর্ষার কথা মনে করে বলছ?’
‘হ্যাঁ, তারা যে তোমায় ঈর্ষা করে। আমি কখনো তোমাকে অন্যের নিন্দা বা অপকার করতে দেখিনি, তোমার মধুর ব্যবহারে দাস ও কর্মকাররা পর্যন্ত কত খুশী–তবু বহু সন্ত্রান্ত মন্ত্র তোমার প্রতি প্ৰতিহিংসা পোষণ করে।’
‘কারণ, তারা আমায় দেখছে সর্বজনপ্রিয়া হতে। আর গণে (প্রজাতন্ত্রে) সর্বজনপ্রিয়কেই লোকে হিংসা করে, সর্বজন-প্রিয়রাই তো গণ-প্রধান বলে গণ্য হয়।’
‘কিন্তু তোমার গুণাবলী দেখে তাদের প্রসন্ন হওয়া উচিত। মন্ত্রদের মধ্যে কেউ তক্ষশিলায় এত সম্মান পেয়েছে বলে আজ পর্যন্ত শোনা যায় নি। তারা কি জানে না যে, কৌশলরাজ প্রসেনজিৎ পত্রের পর পত্র পাঠাচ্ছেন তোমাকে আহবান করে?’
