যাজ্ঞবল্ক্য অনেকগুলি পরিষদে বিজয়ী হয়েছিল। এবার সে বিদেহ (তির্হুত) এর জনক পরিষদে খুব বড় রকমের একটা জয়লাভ করল, এবং তার শিষ্য সোমশ্ৰবা হাজার গরু তাকে দান করল। যাজ্ঞবল্ক্য বিদেহ থেকে আরম্ভ করে কুরু পর্যন্ত সেই গরুগুলিকে হাঁকিয়ে আনার কষ্ট স্বীকার করবে কেন? সেগুলিকে ব্ৰাহ্মণদের মধ্যে ভাগ করে দিল। এ জন্য ব্ৰহ্মবাদী যাজ্ঞবল্ক্যের প্রচুর খ্যাতি হল। হ্যাঁ, হীরে-মুক্তা সোনা, দাসদাসী এবং অশ্বরথএ সমস্ত অবশ্যই সে নিজের সঙ্গে নিয়ে এসেছিল।
ষাট বছর হল প্রবাহণের মৃত্যু হয়েছে তখন যাজ্ঞবল্ক্য জন্মায়নি। কিন্তু একশ’ বছর বয়স অতিক্রম করেও লোপা এখনও কর্মক্ষম আছে, পঞ্চালপুরের বাইরে রাজ-উদ্যানে ললিতা আম-কলা-জাম গাছগুলির ছায়ায় থাকতে সে পছন্দ করত। আজীবন সে প্রবাহণের চিন্তাধারার বার বার বিরোধিতা করেছে, কিন্তু এই সূদীর্ঘ ষাট বছরে সে প্রবাহণের দোষগুলো ভুলে গেছে। আজ তার স্মৃতিপটে জেগে রয়েছে–সারা জীবনের প্রেম। বৃদ্ধার চোখের জ্যোতি ম্লান হয় নি। ব্ৰহ্মবাদীদের ওপর আজও সে খাপ্পা। একদিন পঞ্চালপুরে ব্ৰহ্মবাদিনী গার্গী এসে উঠল। রাজোদ্যানের পাশেই গার্গীকে বিশেষ সম্মানের সঙ্গে থাকতে দেওয়া হল। জনকের পরিষদে যজ্ঞবল্ক্য যেভাবে ধোঁকা দিয়ে তাকে পরাস্ত করেছিল, গার্গী তা ভুলতে পারেনি। যদি আর কোনো প্রশ্ন কর তবে তোমার মাথা থাকবে না, গার্গী!’ গার্গী ভেবেছিল ওটা কথার কথা! ও কাজ শুধু উগ্রলোহিত–পাণিরাই (অপরের রক্তে যে হাত রাঙায়) করতে পারে।
গার্গী লোপার পিতৃকুলের মেয়ে। লোপা তার বিশেষ পরিচিত। যদিও ব্রহ্মবাদ সম্বন্ধে তার মত উলুটো। এ-বার যাজ্ঞবল্ক্য তার বিরুদ্ধে যে রকম নিচ অস্ত্র প্রয়োগ করেছে তাতে গার্গী একেবারে রেগে আগুন। তাই যখন তার প্রপিতামহের পিসীমার কাছে এল, তখন তার মনোভাবের নিশ্চয়ই কিছুটা পরিবর্তন হয়েছিল। লোপা কাছে এলে গার্গীর কপালে ও চোখে চুমু খেয়ে আলিঙ্গন করে জিজ্ঞেস করল, ‘শরীর কি রকম আছে?’
গার্গী বলল, ‘আমি বিদেহ থেকে এসেছি, পিসী!’
‘মল্লযুদ্ধ করতে গিয়েছিলি কি মা?’
’হ্যাঁ, মল্লযুদ্ধই হয়েছে পিসীমা। ব্ৰহ্মবাদীদের পরিষদ মল্লযুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই নয়। মল্লযুদ্ধের মতোই ওখানে প্রতিন্দ্বন্দ্বীকে ছলে-বলে পর্যুদস্ত করার চেষ্টা হয়।’
‘তাহলে তো কুরু-পঞ্চলের অনেকেই ব্ৰহ্মবাদী আখড়ায় নেমে থাকবে।’
‘কুরু-পঞ্চাল তো এখন ব্ৰহ্মবাদীদের দুর্গ।’
‘আমার সামনেই ব্ৰহ্মবাদীদের একটি ছোট স্ফুলিঙ্গ নিক্ষেপ করেছিল প্রবাহণ, আর তাও সৎ উদ্দেশ্যে নয়। আজ তা দাবানল হয়ে সমস্ত কুরু-পঞ্চালদের জ্বলিয়ে এখন বিদেহ পর্যন্ত পৌঁছেছে।’
‘পিসীমা আমি তোমার কথার সত্যতা এখন কিছুটা বুঝতে পারছি। বস্তুত, এটা ভোগ অর্জনের একটা প্রশস্ত পথ। বিদেহে যাজ্ঞবল্ক্য লক্ষ-লক্ষ টাকার সম্পত্তি পেয়েছে, অন্য সব ব্ৰাহ্মণেরও প্রচুর ধন-রত্ন নিয়ে এসেছে।’
‘এ যে যজ্ঞের থেকেও বেশি লাভের ব্যবসা, মা! আমার স্বামী একেই রাজা ও ব্ৰাহ্মণদের মজবুত নৌকা বলত। তাহলে যাজ্ঞবল্ক্য জনকের পরিষদে বিজয়ী হল, আর তুমি কিছুই বলতে পারলে না?’
‘যদি বলারই কিছু না থাকত। তবে গঙ্গায় এত দূর নৌকা পাড়ি দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল?’
‘নৌকাতে এলে! রাস্তায় চোর-ডাকাত ধরেনি?’
‘না পিসীমা! নৌকার সারিতে যোদ্ধারা সঙ্গে থাকে। আমরা ব্ৰহ্মবাদীরা কখনো এত মুর্থ নই যে, একলা-দোকলা নিজেদের প্রাণ সঙ্কটময় করে পথ চলব।’
‘যাজ্ঞবল্ক্য তাহলে সকলকেই পরাস্ত করেছিল?’
‘একে পরাস্ত করা বলে না।’
‘কেননা, প্রশ্নকর্তারা যাজ্ঞবল্ক্যের জবাব শুনে চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়েছে।’
‘তুমিও?’
‘হ্যাঁ, আমিও। কিন্তু তার কথার ধমকে আমাকে চুপ করতে হয়েছে।’
‘কথার ধমকটা আবার কি?’
‘ব্ৰহ্ম সম্বন্ধে প্রশ্ন করে যাজ্ঞবল্ক্যকে এমনভাবে নাস্তানাবুদ করেছিলাম যে তার বেরোবার পথ ছিল না। তখন সে আমাকে এমন কথা বলল, যা আমি কখনও তার কাছে শুনব বলে আশা করিনি!’
‘কি কথা গো মেয়ে?’
‘সোজাসুজি আমায় ধমক দিয়ে বলল, গার্গী আবার যদি কোনো প্রশ্ন কর, তা’হলে আর তোমার মাথা থাকবে না।’
‘তুমি ও রকম হবে সে আশা করিনি। কিন্তু আমি সব কিছুই আশঙ্কা করেছিলাম, গার্গী। যাজ্ঞবল্ক্য প্রবাহণের উপর্যুক্ত প্ৰশিষ্য। প্রবাহণের মিথ্যাবাদকে সে ষোলকলায় পূর্ণ করেছে। তুমি যে আর কোনো প্রশ্ন করনি, সেটা ভালোই করেছ।’
‘তুমি কি করে জানলে পিসীমা’।
‘নিজের চোখে তোমার কাঁধের ওপর মাথাটা দেখতে পাচ্ছি।’
‘তাহলে পিসীমা, তুমি কি বিশ্বাস করছ যে, আমি যদি আর কোনো প্রশ্ন করতাম, তবে আমার মাথা পড়ে যেত?’
‘নিশ্চয়ই। তবে, যাজ্ঞবল্ক্যের ব্ৰহ্ম-বলে নয়, অন্য লোকের মাথা যেভাবে পড়তে দেখা যায়, সেইভাবে।’
‘না পিসীমা, তা কি কখনও হতে পারে?’
‘হতে পারে না? তুই এখনও শিশু আছিস, গার্গী। তুই ভাবিস এ ব্ৰহ্মবাদ আর কিছুই নয়। খালি মনের পাখা মেলে কল্পনা, মনের বিলাস। না, গাণী–তা নয়। এর পেছনে রাজারাজড়াদের, ব্ৰাহ্মণ ও পরিশ্রম-ভোগীদের মস্ত বড় স্বাৰ্থ লুকানো আছে। যে লগ্নে এই ব্ৰহ্মবাদ জন্মলাভ করেছিল সেই সময় এর জন্মদাতা আমার পাশেই শয়ন করত। যোদ্ধারহাতে লোহার কৃপাণ যেমন শক্তি যোগায় তেমনি এই ব্ৰহ্মবাদ রাজসত্তাও ব্রহ্মণ্যসত্তাকে দৃঢ় করেছে।’
