‘এ তো ব্যবসা।’
‘ব্যবসা তো নিশ্চয়ই। আর এতে লোকসানের ভয় নেই। এই জন্যই জ্ঞানী ব্ৰাহ্মণ সমিধ (যজ্ঞকাষ্ঠ) হাতে আমার কাছে শিষ্য হতে আসে। আর আমিও ব্রাহ্মণদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তাদের ব্রহ্মজ্ঞান প্রদান করি।’
‘এ অত্যন্ত নিকৃষ্ট চিন্তা, প্রবাহণ!’
‘তোমার কথা স্বীকার করি। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য সব থেকে উপযোগী পন্থা। বশিষ্ঠ এবং বিশ্বামিত্রের নৌকা হাজার বছরও কাজ দেয়নি। কিন্তু প্রবাহণের নির্মিত নৌকায় দু’হাজার বছর পরও পরাধনভোগী রাজা ও সামন্তরা পার হতে পারবে। যজ্ঞরূপী নৌকাকে আমি অদৃঢ় বলে মনে করি, লোপা! তাই আমি এ দৃঢ় নৌকা নির্মাণ করেছি। এর সাহায্যে ব্ৰাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়গণ মিলিতভাবে ঐশ্বৰ্য ভোগ করতে পারবে। কিন্তু, ব্রহ্মের থেকেও বড় হবে আমার দ্বিতীয় আবিষ্কার, লোপা!’
‘কোন আবিষ্কার?’
‘মরে গিয়ে আবার এ পৃথিবীতে ফিরে আসা—পুনর্জন্ম!’
‘এ তো সবচেয়ে বড় জালিয়াতি!’
‘কিন্তু খুব কার্যকরী পন্থা। একদিকে সামন্ত, ব্রাহ্মণ এবং ব্যবসায়ীদের হাতে অপার ভোগরাশি সঞ্চিত হবে, অন্যদিকে সাধারণ প্রজা নিঃশেষ হয়ে যাবে। আবার এ সব নির্ধনদের, যেমন শিল্পী, কৃষক এবং দাসদাসীদের বিক্ষুব্ধ করার জন্যে কিছু লোক প্রচার শুরু করেছে, ‘তুমি তোমার শ্রমশক্তি অন্যকে দিয়ে কষ্ট করছ। ওরা তোমাকে বিশ্বাস করাতে চায় যে, তুমি কষ্ট ও ত্যাগ করলে মরে স্বর্গে যাবে। কিন্তু কেউ স্বর্গে মৃত জীবকে সুখভোগ করতে দেখেনি।’ এরই জবাব হল, এ সংসারে উঁচু-নিচু ভাব, ছোট-বড় জাতি, ধনী নির্ধনের যে প্রভেদ, তা হল পূৰ্বজন্মকৃত ফল। আমি এভাবে পূর্বেকীর সুকর্ম-দুষ্কর্মের ফল প্রত্যক্ষভাবে দেখিয়ে দিয়েছি।’
‘এভাবে চোরও তার চুরি করা জিনিসকে পূর্বজন্মের রোজগার বলতে পারে।’
‘কিন্তু তার জন্য আমরা প্রথম থেকেই দেবতা, ঋষি এবং জনসাধারণের বিশ্বাসের সহায়তা গ্রহণে কৃতকার্য হয়েছি। সে জন্যেই অপহৃত জিনিসকে পূর্বজন্মের রোজগার বলে স্বীকার করা হবে না। বিনা পরিশ্রমলব্ধ ধনকে আমরা প্রথমে দেবতার কৃপায় পাওয়া বস্তু বলে চালতাম। কিন্তু যখন দেখলাম, দেব-কৃপার ওপর সন্দেহ শুরু হয়েছে, তখন আমাদের একটা নতুন ব্যাখ্যা উপস্থিত করা প্রয়োজন হল। ব্ৰাহ্মণদের চিন্তাশক্তিও লোপ পেয়েছে। প্রাচীন ঋষিদের মন্ত্র মুখস্থ করতেই চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর কাটিয়ে দেয়, ফলে অন্য কোনো গভীর বিষয় কখন আর চিন্তা করবে!’
‘প্রবাহণ! তুমিও কি মুখস্থ করতে দীর্ঘ সময় এভাবে কাটিয়ে দাওনি?’
‘মাত্র ষোল বছর। চব্বিশ বছর বয়সে আমি ব্রাহ্মণদের বিদ্যা শেষ করে বইয়ের সংসারে প্রবেশ করেছিলাম। এখানে আমি পড়াশুনার প্রচুর সুযোগ পেয়েছি। রাজ্য শাসনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি জানার পর আমি দেখলাম, ব্ৰাহ্মণদের নির্মিত পুরনো নৌকা বর্তমানের জন্য অদৃঢ়।’
‘তাই তুমি দৃঢ় নৌকা নির্মাণ করেছ?’
‘সত্যি কি মিথ্যা সেটা আমার প্রশ্ন নয়; আমার প্রশ্ন হল, কার্যোপযোগিতা নিয়ে। সংসারে ফিরে আসা পুনর্জন্মের কথা আজ নতুন মনে হচ্ছে ঠিকই, আর তুমি এর অন্তৰ্গঢ় স্বাৰ্থও জান। কিন্তু, আমার ব্রাহ্মণ চেলারা তো এই নিয়ে এখন থেকেই মাতামাতি শুরু করেছে। পিতরদের এবং দেবতাদের (পিতৃ-যান, দেব-যান) পথ বুঝবার জন্য এখনি মানুষ বার বছর পর্যন্ত গরু চরাতে প্ৰস্তুত। তুমি আমি থাকব না, কিন্তু এমন সময় আসবে যখন সমস্ত দরিদ্র প্রজা এই পুর্নজন্মের আশীয় সারা জীবনের তিক্ততা, কষ্ট এবং অন্যায়কে হাসিমুখে মেনে নেবে। স্বৰ্গ ও নরক বুঝবার এ কেমন সোজা উপায় আবিষ্কার করেছে, বল তো লোপা?’।
‘কিন্তু, নিজের স্বার্থের জন্য মানুষকে চির-সর্বনাশের পথে ঠেলে দিচ্ছ।’
‘বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্ৰও পেটের দায়ে বেদ রচনা করেছিল, উত্তর পঞ্চালের রাজা দিবোদাসের শবর-দুর্গ অধিকারের পর কবিতা রচিত হয়েছিল। পেটের সংস্থান করা অন্যায় নয়। আমরা যখন হাজার হাজার বছরের জন্য আপন পুত্রপৌত্ৰাদি, ভাই-বন্ধুদের পেটের সংস্থান করি তখন শাশ্বত যশের ভাগী হই।(১) প্রবাহণ এমন কাজই করছে, যা পূর্বগামী ঋষিগণও করতে পারেননি–ধর্মের অন্ন ভক্ষণকারী ব্রাহ্মণরাও পারেনি।’
‘তুমি অতি নিষ্ঠুর প্রবাহণ।’
‘কিন্তু আমি আমার কাজ যোগ্যতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছি।’
—————–
(১) ত্বং তদুক্থমিন্দ্ৰ বর্হণাক : প্রয়চ্ছতা সহাসা শূর-দৰ্ষি।
অবগিরেৰ্দাসং শংবরং হন্ প্ৰাবী দিবোদাসং চিত্রভিরূতী।। (ঋগ্বেদ ৬। ২৫। ২৫)।
২.
প্রবাহণের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তার ব্ৰহ্মবাদ ও পুর্নজন্ম অথবা পিতৃযানবাদ বিজয়দুন্দুতি বাজিয়ে সিন্ধু থেকে আরম্ভ করে সদানীরা (গণ্ডক) পর্যন্ত জয়ধ্বনি তুলেছিল। যজ্ঞের প্রভাব তখনও কমেনি, কারণ ব্ৰহ্মজ্ঞানীরা তখনও পর্যন্ত এগুলো করতে বিশেষ উৎসাহ পেত। ক্ষত্রিয় প্রবাহণের আবিষ্কৃত ব্ৰহ্মবাদে ব্রাহ্মণরা পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিল এবং এই বিদ্যায় কুরু কুলের যজ্ঞবল্ক্যের খ্যাতি যথেষ্ট ছড়িয়ে পড়েছিল।
এক সময়ে মন্ত্রের কর্তা এবং যজ্ঞের প্রতিষ্ঠাতা বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র এবং ভরদ্ধাজের জন্ম যে দেশ দিয়েছিল–সেই কুরু পঞ্চালেই যাজ্ঞবল্ক্য এবং তার সঙ্গী ব্ৰহ্মবাদী-ব্ৰহ্মবাদিনীদের জয়-জয়কার হল। ব্ৰহ্মবাদীদের পরিষদ ক্রমে যজ্ঞের চেয়ে বেশি খ্যাতিসম্পন্ন হয়েছিল। রাজারা রাজসূয় ইত্যাদি যজ্ঞের সঙ্গে একটি করে ব্ৰহ্মবাদীদের পরিষদ রচনা করত, কখনো বা পরিষদ আলাদা করেও ডাকা হত। তাতে হাজার হাজার গরু ঘোড়া এবং দাসদাসী (বিশেষ করে দাসী, কেননা রাজাদের অন্তঃপুরে প্রতিপালিতাদাসীদের ব্ৰহ্মবাদীরা বেশি পছন্দ করত) পরিষদের এক এক যুদ্ধ বিজেতাদের পুরষ্কার দেওয়া হত।
