‘তাই তো কঠোর বাক্য-বাণ সহ্য করতে পারছি।’
‘না, মানুষের এ রকম হওয়া উচিত নয়।’
‘আমি শুধু মানুষ হতে চাইনি, চেয়েছিলাম যোগ্য মানুষ হতে! যদিও যোগ্যতা অর্জনের সময় এ কথা এক মুহূর্তের জন্যেও মনে হয় নি যে, আমাকে একদিন এই রাজভবনে আসতে হবে।’
‘তোমার অনুশোচনা হচ্ছে না, আমার সঙ্গে প্রেম করার জন্যে?’
‘শিশু জন্মমাত্র বিনা আয়াসে মাতৃস্তন পায়–আমিও বিনা প্রয়াসে তোমার প্রেম লাভ করেছি। তোমার ভালোবাসা আমার প্রতিদিনের অভ্যন্ত জীবন, শরীরের অঙ্গ।‘
‘আমি সংসারী পুরুষ, তবু আমি তোমার প্রেমের কদর বুঝি। মনের গতি সব সময় এক রকম থাকে না। যখন কোনো অবসাদ আসে, জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে দাঁড়ায় তখন তোমার প্রেম ও সুবিচার আমাকে মস্ত সম্বল যোগায়।’
‘কিন্তু আমি তোমার যতটা অবলম্বন হতে চাই–তা যে হতে পারছি না। আর এর জন্যে আমি বেদনা বোধ করি, প্রবাহণ।’
‘তার কারণ, রাজ্যশাসন করার জন্যেই আমার জন্ম হয়েছিল।’
‘কিন্তু একদিন তো তুমি মহাব্ৰাহ্মণ হতে চেয়েছিলে!’
‘তখন আমার জানা ছিল না যে, পঞ্চালপুর রাজভবনের উত্তরাধিকারী আমি।’
‘কিন্তু রাজকার্যের বাইরেও যে তুমি হাত দিচ্ছ, এতে তোমার দরকার কি?’
‘অর্থাৎ ব্ৰহ্মা থেকে ব্ৰহ্মের কল্পনা! লোপী, এটা কিন্তু রাজকার্যের বাইরে নয়। রাজ্যকে অবলম্বন দেওয়ার জন্যেই আমাদের পূর্বপুরুষরা বশিষ্ঠ ও বিশ্বামিত্রকে এতটা সম্মানের পদে অধিষ্ঠিত করেছিল। এই সমস্ত ঋষিরা-ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ প্রভৃতি দেবতাদের নামে জনগণকে রাজজ্ঞা পালন করতে শেখাত। তখনকার দিনে রাজারা সাধারণের বিশ্বাসভাজন হওয়ার জন্যে বড় বড় ব্যয়সাধ্য যজ্ঞ করত। আজকাল আমরাও করে থাকি এবং ব্ৰাহ্মণকে দক্ষিণা দিই। এই যজ্ঞ ও পুরোহিতদের মূল্যবান জিনিস দক্ষিণা দেওয়ার মধ্য দিয়ে জনগণের মনে দেবতাদের অলৌকিত শক্তির ওপর বিশ্বাস সৃষ্টি করাতে চায়, মানুষের মনে এই ধারণা জন্মাতে চায় যে, সুগন্ধিত তণ্ডুল, গোবৎসের নরম মাংসের সুপ, সূক্ষ্ম বস্ত্ৰ, মুক্তার ভুষণ যা কিছু আমরা ব্যবহার করি এ সমস্তই ঈশ্বরের অনুগ্রহ।’
‘পুরনো দেবতারাই তো যথেষ্ট, তবে এই নতুন ব্ৰহ্মের আমদানির প্রয়োজন কি?’
‘পুরুষানুক্রমে বহু যুগ ধরে কেউ ইন্দ্র, ব্ৰহ্মাকে প্রত্যক্ষ দেখেনি। তাই এখন অনেক লোকের মনেই সন্দেহ হতে আরম্ভ করেছে।‘
‘তা’হলে ব্ৰহ্ম সম্পর্কে সন্দেহ হবে না কেন?’
‘সেই জন্যেই ব্ৰহ্মের রূপ বর্ণনা আমি এমনভাবে করেছি যে, তাকে প্রত্যক্ষ দেখার কথাই উঠবে না। দেবতারা ছিল সাকার-আমার কল্পিত ব্ৰহ্ম নিরাকার। নিরাকার তাই যত্রতন্ত্র সর্বত্রই বিরাজমান–তাই তা দেখবার প্রশ্ন ওঠে কি? প্রশ্ন ওঠে শুধু সাকার দেবতাদের সম্পর্কে।’
‘তুমি যে নিরাকার ব্রহ্মের কথা বলছ তাতে উদ্দালক আরুণির মতো ব্ৰাহ্মণদেরও মতিভ্রম ঘটায়। তোমার মতলবটা কি, তুমি কি প্রজাদের ভ্রমাচ্ছন্ন রাখতে চাও?’
‘লোপা! তুমি তো আমায় জান, তোমার কাছে কি-ই বা লুকোতে পারি? এই যে রাজশক্তি একে হাতের মুঠোর মধ্যে রাখার জন্য এর প্রয়োজন আছে। যারা সন্দেহ করবে তাদের বিদ্যাবুদ্ধিকেই এ দিয়ে খাটো করা যাবে–তাদের নিজেদের জ্ঞান সম্পর্কে নিজেদেরই সন্দেহ জাগবে। কারণ, যারা দেবতার যজ্ঞ বা পূজার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করে তারা আমাদের ঘোরতর শত্রু।’
‘কিন্তু তুমিও তো বলছি, ব্ৰহ্ম সত্তাহীন নয়–ব্রহ্মের সত্তা ও দর্শনের কথাও বলছ।’
‘সত্তা আছে, কাজেই অনুভব-গ্ৰাহ্য হওয়া চাই। কিন্তু তা ইন্দ্রিয় দ্বারা নয়, কারণ তাহলেই সন্দেহবাদীরা ইন্বিয় দ্বারা (চক্ষুষ) দেখতে চাইবে। তাই আমি বলেছি, ব্রহ্মের দর্শন পেতে হলে সূক্ষ্ম ইন্দ্ৰিয় দ্বারাই সেটা সম্ভব, আর সূক্ষ্ম ইন্দ্ৰিয় লাভ করতে হলে চাই। সাধনা। আর সাধনার যে ফিরিস্তি দেওয়া হয়েছে তাতে মানুষ ছাপান্না পুরুষ ধরেও বিশ্বাস। অটুট রাখতে পারবে–ভ্ৰমাচ্ছন্ন থাকবে। আমি পুরোহিতদের স্থূল হাতিয়ারকে নিষ্ফলা ভেবেই এ হাতিয়ার আবিষ্কার করেছি। লোপা, তুমি কি কখনও শবরদের পাথর ও তামার হাতিয়ার দেখেছ?’
‘হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের জঙ্গলে গিয়ে দেখেছি।’
‘যমুনার ওপরে আমরা গিয়েছিলাম বটে। আচ্ছা শবরদের পাথর ও তামার হাতিয়ার আমার কালো লোহার সামনে টিকতে পারে?’
‘না, পারে না।’
‘পারে না তো! তাই বলছিলাম, বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্রের পুরনো দেবতারা বা ব্ৰাহ্মণদের যাগ-যজ্ঞ আগেকার বুদ্ধিমানদের যাও বা সন্তুষ্ট করতে পারত এখন তা সন্দেহবাদী তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান জ্ঞানী লোকদের কাছে ব্যৰ্থ।’
‘তাদের কাছে তোমার সৃষ্ট এই ব্ৰহ্ম-তাও কিছু না। তুমি ব্ৰাহ্মণ জ্ঞানীদের ধরে ধরে শিষ্য বানোচ্ছ, তাদের ব্ৰহ্মজ্ঞান শেখাচ্ছ, অথচ তোমারই ঘরে বসে তোমার কথাকে সরাসরি মিথ্যা বলে মনে করি।’
‘কারণ, তুমি আসল ব্যাপারটা আমার আসল রহস্য (উপনিষদ) জান।’
‘ব্রাহ্মণ যদি জ্ঞানীই হবে, তবে কেন তোমার রহস্য তারা জানবে না?’
’সেটা তো তুমিও দেখতে পাচ্ছ। কোনো ব্ৰাহ্মণ হয়ত উপনিষদ পরীক্ষা করে দেখতে পারে, কিন্তু তারাও আমার উপনিষদকে আত্মস্বার্থে উপর্যুক্ত হাতিয়ার বলে মনে করবে। ওদের পৌরোহিত্য ও গুরুগিরির ওপর মানুষের অবিশ্বাস এসে গেছে যার পরিণাম সব রকম দক্ষিণা হতে বঞ্চিত হওয়া। ফলে চড়ার জন্য অশ্বরথ, খাবার জন্য উত্তম খাদ্য, থাকার জন্য প্রাসাদ এবং ভোগের জন্য সুন্দরী দাসী থেকে বঞ্চিত হওয়া।’
