‘লোপা, তুমি আমায় উৎসাহ দিয়েছ আমার শরীরে শক্তি দিয়েছ। পড়া মুখস্থ করতে এবং অন্যকে দিয়ে মুখস্থ করাতে খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত ভুলে যেতাম। তুমি আমাকে পাঠগৃহের সেই অন্ধকার থেকে জোর করে টেনে বার করতে, কখনও বা উদ্যানে কখনও বা গঙ্গার ধারে নিয়ে যেতে। এ-সব আমার খুবই ভালো লাগত। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে আমি চেয়েছিলাম তিনখানি বেদ ও ব্রাহ্মণের সমস্ত বিদ্যা আয়ত্ত করার কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে।’
‘তোমার সে কাজ তো শেষ হয়েছে। বাবা বলেন, প্রবাহণ এখন আমার সমতুল্য।’
‘তা আমিও বুঝতে পারছি। ব্ৰাহ্মণ্য-বিদ্যা আয়ত্ত করতে আর সামান্যই বাকি কিন্তু বিদ্যা শুধু ব্ৰাহ্মণ্যতেই শেষ হয় না।’
‘এই কথা আমিই তোমায় বলতে চাইছিলাম। আচ্ছা, এখনও কি তুমি পলাশ-দণ্ড আর রুক্ষ কেশ নিয়ে চলবে?’
‘কিছু ভাবতে হবে না লোপা! পলাশ-দণ্ড এখন ছাড়লেই হল। আর আমার এই ষোল বছরের রুক্ষ চুলগুলিতে অনায়াসে তুমি সুগন্ধি তেল দিতে পার।’
‘প্রবাহণ, রুক্ষ চুলের ওপর এত বেশি জোর দেওয়া হয় কেন? যদি সংযমের কথা বল–তুমি তো আমার ঠোঁটে চুমু খেতে কখনও ছাড়নি।’
‘তার কারণ ছোটবেলার অভ্যাস।’
‘তাহলে আচার্যকুলের অন্যান্য ছাত্ররা এ ব্ৰত কি কঠোরভাবে পালন করে?’
‘হ্যাঁ লোপা, তা না করে কোনো উপায় নেই বলে করে। এ-সব হল সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য। সাধারণ মানুষ একে ব্ৰাহ্মণ কুমারদের কঠিন তপস্যা বলে মনে করে।’
‘তাই যদি হয় তবে কুরুরাজ আমার বাবাকে জনপদ, হীরে, সোনা, দাস-দাসী, ঘোড়া, রথ উপটৌকন দিয়ে চলেছেন কেন? আমাদের অনেক দাসী আছে, আবার কিছুদিন। আগে কুরুরাজ আরও তিন জন দাসী পাঠিয়েছেন তাদের তো কোনো কাজই নেই।’
‘ওদের বেচে দাও লোপা। ওরা তরুণী। এক-এক জনের জন্য তিরিশ নিষ্ক (স্বর্ণমুদ্রা) পেয়ে যাবে।’
‘আমার আপশোস হয়; আমরা ব্ৰাহ্মণ, শিক্ষিত এবং জ্ঞানী, যেহেতু আমাদের জ্ঞানার্জনের সুযোগ আছে। কিন্তু যখন আমি এ-সব ক্রীতদাসদের দেখি তখন ব্ৰহ্মা, ইন্দ্র বরুণ ও অন্যান্য দেবতাদের ওপর ক্রুদ্ধ হই। আজ দেবকুল, বশিষ্ঠ ভরদ্বাজ, ভুণ্ড, অঙ্গিরা ও ঋষিদের এবং বাবার মতো আজকের সমস্ত শ্রোত্রিয় ব্ৰাহ্মণ মহাশালদের (ধনিক) বিরুদ্ধে আমার ঘৃণা জেগে ওঠে। সর্বত্রই ব্যবসা, দরকষাকষি, লাভ, লোভ। সে দিন কালিদাসীর স্বামীকে বাবা কোশলাদেশীয় এক বণিকের হাতে পঞ্চাশ নিষ্কে বেঁচে দিলেন। কালী আমার কাছে কান্নাকাটি করায় আমি তার হয়ে বাবাকে অনেক বললাম। তিনি বললেন, ‘সমস্ত দাসদের ঘরে রেখে দিলে স্থান সন্ধুলান হবে না। আর যদি বিনা কাজে রাখা হয় তাহলে ঐ টাকাগুলোও লোকসান।’ বিদায়ের পূর্ব রাত্রে তারা স্বামী-স্ত্রী কি কান্নাটাই না কাঁদল। তাঁদের দু’বছরের সেই মেয়েটি-সকলে যাকে দেখলে বলে বাবার চেহারার সঙ্গে মিল আছে সেই বাচ্চাটাও কি কান্নাটা কাঁদল! কিন্তু কালীর স্বামীকে বেচে দেওয়া হল। যেন সে মানুষ নয়, পশু। ব্ৰহ্মা যেন তাকে আর তার শত শত প্রজাকে এই জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এ আমি মানতে রাজী নই প্রবাহণ! আমি তোমার মতো বেদ মুখস্থ করিনি। কিন্তু তা শুনে এই বুঝেছি। যে, চোখে দেখতে পাওয়া যায় না, এই রকম বস্তু বা শক্তির প্রলোভন বা ভয় দেখানো। হয়েছে।’
‘প্রবাহণ লোপার আরক্ত গালটি নিজের চোখের সঙ্গে চেপে বলল, ‘আমাদের প্ৰেম, মতভেদ রাখার জন্যই হয়েছে।’
‘মতভেদ আমাদের প্রেমকে আরও গাঢ় করেছে।’
‘ঠিক বলেছ লোপা! অন্যে যদি এ কথাই বলত তাহলে আমি রাগ করতাম, কিন্তু সেই কথাগুলিই যখন দেখি যে তোমার মুখ দিয়ে আমার সমস্ত দেবতা, ঋষি এবং আচার্যদের ওপর তীক্ষ্ণ বাণের মতো নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, তখন তোমার ও অধরে চুম্বন করতে বার বার ইচ্ছা হয় কেন?’
‘তার কারণ হল, আমাদের নিজেদের মধ্যেই দুটো মতের দ্বন্দ্ব চলছে। আমরা এ দ্বন্দের প্রতি সহিষ্ণু, কেননা আমরা একে অপরকে আমাদের অভিন্ন সত্তা বলে মনে করি।’
‘তুমি তো কখনও শিবির দোশালা, কাশীর চন্দন, সামুদ্রিক মুক্ত দিয়ে নিজেকে বিভূষিতা করনি। এ-সবে তোমার এত উদাসীনতা কেন প্রিয়ে?’
‘ওগুলোতে কি আমায় সুন্দর দেখাবে…?’
‘আমার কাছে তুমি সর্বদাই সুন্দর।’
‘তাহলে এই বোঝা চাপিয়ে শরীরকে কষ্ট দিয়ে লাভ কি? সত্যি বলছি, তুমি যখন একটা ভারী বোঝাকে মুকুট বলে মাথায় পর তখন আমার খুবই খারাপ লাগে।’
‘অথচ অন্য মেয়েরা কাপড় গয়নার জন্যে কতই না ঝগড়া করে।’
‘আমি সে রকম মেয়ে নাই।’
‘তুমি হচ্ছে সেই রকম মেয়ে যে পঞ্চাল রাজার হৃদিরাজ্য শাসন করে!’
‘আমি প্রবাহণের স্ত্রী, পঞ্চালদের রাণী নই।’
‘বেশ তাই প্রিয়তমা! কিন্তু এমন দিনের কথা আমরা কল্পনাও করিনি। আমি যে পঞ্চাল রাজপুত্র–এ কথা মামা গোপন রেখেছিলেন।’
‘বেশ তাই প্রিয়তমে! কিন্তু এমন দিনের কথা আমরা কল্পনাও করিনি। আমি যে পঞ্চাল রাজপুত্র–এ কথা মামা গোপন রেখেছিলেন।’
‘সে সময় বাবা আর কি করতে পারতেন? পঞ্চাল রাজার শতেক রাণীর মধ্যে পিসীমা অন্যতমা। আর তোমার চেয়ে বয়সে বড় ছিল পঞ্চাল রাজের দশটি ছেলে। তাই কে ভেবেছিল তুমি একদিন পঞ্চাল রাজ-সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবে।’
‘আচ্ছা লোপা, এই রাজভবন তোমার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না কেন?’
’যেহেতু, গার্গ্য ব্ৰাহ্মণের প্রাসাদে–যেখানে পড়ানো হত বেদ আর ব্ৰাহ্মণ্য–আমার ক্লান্তি ও বিরক্তি এসেছিল সেখানেই। আমাদের জন্যে ঐ প্রাসাদ ছিল বটে, কিন্তু ক্রীতদাসদাসীদের জন্যে? আর আমাদের সেই বিদ্যাপীঠের প্রাসাদের তুলনায় এই রাজপ্রাসাদ হাজার গুণের বড়। এই প্রাসাদের একমাত্ৰ তুমি আর আমি ছাড়া বাকি সবাই দাসদাসী। দু’জন অদাসের জন্যে দাসদাসীতে ভরা এই ভবন অ-দাস ভবন হয়ে যায় না। কিন্তু প্রবাহণ আমার খুব আশ্চর্য লাগে তোমার কঠোর হৃদয় দেখে।’
