‘লোপা, তুমি যে চোখ দিয়ে এই দৃশ্য দেখ– আমি তোমার সেই চোখের দিকে তাকিয়েই তৃপ্তি পাই।’
‘হুঁ! কথায় তোমার সঙ্গে পারা মুকিল—খুব কথা বানাতে পারো। যখন তোমার সহপাঠীদের সঙ্গে মারালের মতো সুর করে পুরনো শ্লোক ও মন্ত্রের পাঠ পড়তে দেখি তখন মনে হয় আমাদের প্রবাহণ স্তন্যপায়ী শিশুই থেকে যাবে।’
‘তাই না-কি! প্রবাহণ সম্পর্কে তোমার সত্যিই এই ধারণা?’
‘ধারণা যাই হোক, তবে আমার এ ধারণাও আছে যে, প্রবাহণ আমার আর সব সময়ের জন্যে প্রবাহণ আমারই থাকবে।’
‘এই আশা ও বিশ্বাসেই, লোপা, প্রভূত শ্রম ও বিদ্যার্জনের শক্তি পাই। আমি নিজের মনকে জোর করে সংযত করতে অভ্যস্ত। তা না হলে কতবার আমার মন পুরনো গাথা, মন্ত্র, উদ্গীথগুলি বার বার মুখস্থ করার হাত থেকে রেহাই পেতে চেয়েছে। মন যখন পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, শরীর যখন অবসন্ন, তখন মনে হয় সব কিছু ছেড়ে দিয়ে বসে। থাকি, সেই সঙ্কট মুহূর্তে লোপার সঙ্গে কয়েক মুহূর্ত মিলনের আশাই আমার প্রেরণা জোগায়।’
‘আর এই সময়টার জন্য আমিও সর্বদাই অপেক্ষা করে থাকি।’
লোপার পিঙ্গল চোখ দুটির দৃষ্টি নিবন্ধ ছিল দূর লক্ষ্যে হাওয়ায় তার দীর্ঘ স্বর্ণাভ কেশরাশি উড়ছিল। মনে হচ্ছিল লোপা যেন কোনো সুদূরে হারিয়ে গেছে। প্রবাহণ। তার চুলগুলির ওপর আঙ্গুল বুলাতে বুলাতে বলল, ‘তোমার তুলনায় নিজেকে আমার বামন মনে হয়?’
‘বামন! না গো না, প্রবাহণ।’ —বলতে বলতে লোপা তার সুডৌল গাল প্রবাহণের গায়ের ওপর রেখে বলতে লাগল, ‘একদিন আমি তোমার ওপর অভিমান করতাম–মনে পড়ে? যেদিন তুমি পিসীমার সঙ্গে এলে আমাদের বাড়ি, আমি আমার শিশু চোখ দিয়ে আর এক আট বছরের বালককে দেখেছিলাম। তখন আমার বয়স তিন কি চার। কিন্তু সেই স্মৃতি সেদিনের শিশু-চিত্তকে রঞ্জিত করতে এতটুকু ভুল করে না। আজও মনে পড়ছে–এখনো চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, তোমার সেই স্বর্ণােভ কুঞ্চিত কেশ, টিকোলো নাক, পাতলা রাঙা ঠোঁট, বড় বড় উজ্জ্বল নীল চোখ, আর তপ্ত গৌরবরন দেহ। আমার কেমন লজ্জা হল। মা তোমাকে আদর করে চুমু খেয়ে বললেন, পুত্র প্রবাহণ, এ তোমার মামাত বোন। ওর লজ্জা হয়েছে, ওর লজ্জা দূর কর।’
‘আর আমি তোমার কাছে এগিয়ে গেলাম। তুমি মামীমার সুগন্ধিত কেশরাশির আড়ালে মুখ লুকিয়ে ফেললে।’
‘আমি মুখ লুকালেও মা-র চুলের ফাঁক দিয়ে দেখছিলাম তুমি কি করা। বাড়িতে মা, ও দাসদাসীদের সন্তানেরা ছাড়া আর কেউ ছিল না। বাবার বিদ্যাপীঠ তখনও গড়ে ওঠেনি। আমার একলা মনে হত, তাই তোমাকে দেখে কী খুশীই না হয়েছিলাম!’
‘তবু তুমি মুখ লুকিয়েছিলে। আমি তোমায় দু’চোখ ভরে দেখছিলাম। তোমার শিশুনেত্ৰে ভালোই দেখাচ্ছিল। কাছে গিয়ে তোমার কাঁধে হাত রাখলাম। আমার মনে পড়ে। কি, মা ও মামীম কি বলেছিল? দু’জনেই মুচকি হেসে বলে উঠল, ‘হে ব্ৰহ্মা আমাদের সাধ পূর্ণ কর।’ তখন সাধ পূর্ণ কর প্রার্থনার মানে বুঝিনি।’
‘না প্রবাহণ, আমার মনে পড়ছে না। আমার পক্ষে এইটাই যথেষ্ট যে, আমার কাঁধের ওপর তোমার নরম হাতের স্পর্শ এখনও মনে আছে।’
‘আর তুমি সঙ্কোচে একেবারে জড়সড়ো হয়ে গেলে।’
‘তুমি আমার হাতটা তোমার হাতের মধ্যে নিয়েছিলে, কিন্তু মুখে শব্দ ছিল না, যেন ঠোঁট দুটো সেলাই করা। তখন মা কি বলেছিল মনে আছে?’
‘মামীমার প্রতিটি কথাই মনে আছে, তাঁকে কি আমি কখনও ভুলতে পারি! মা আমাকে গাৰ্গ মুমার কাছে রেখে ফিরে গেল, কিন্তু মামীমার অপার স্নেহ আমার মায়ের স্থান দখল করেছিল। মামীমাকে আমি কেমন করে ভুলব?’ প্রবাহণের চোখে জল ভরে এল, সে লোপার ঠোঁটে চুমু দিয়ে বলল, ‘লোপা তোমার মতোই মামীমার মুখ ছিল; আমরা দু’জনে এক বিছানায় শুতাম। রাত্রে কতবারই না। আমার চোখের পাতা খুলে যেত, কিন্তু মামীমাকে আসতে দেখলেই আবার চোখ বুজতাম। যখন মামীমার মৃদু নিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর ঠোঁটের স্পর্শ গালে পেতাম তখন চোখ মেলতাম। মামীমা বলত, ‘বৎস জেগে আছে!’। তারপর তোমার গালে চুমু খেত, কিন্তু তুমি বেঁহুস হয়ে ঘুমোতে।’
লোপার চোখও অশ্রুপূর্ণ হয়ে এলো, সে উদাস স্বরে বলল, ‘মাকে আমি এত, কম দেখেছি যে মনেই পড়ে না।’
‘ হ্যাঁ, তুমি যে কথা বলছিলো। যেদিন প্রথম এই বাড়িতে এলাম সেদিনের কথা। আমাকে তোমার সামনা-সামনি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তোমার মা বলল, বৎস! এই তোমার বোন–তুমি ওর সঙ্গে ঘোড়া-ঘোড়া খেল।’
‘ হ্যাঁ, তুমি আমাকে ঘোড়া-ঘোড়া খেলতে ডাকলে। আমি মা-র চুলের ভেতর থেকে আমার মুখ বের করলাম। তুমি তারপর ঘোড়া হলে, আমি তোমার পিঠে চেপেছিলাম।’
‘আর আমি তখনই তোমাকে পিঠে চাপিয়ে বাইরে নিয়ে গেলাম।’
‘আমি খুব দুষ্ট ছিলাম, না?’
‘তুমি সব সময়ই ভয়হীন ছিলে, লোপা! মামার ভয়ে আমি নিজের পড়াশুনায় লেগে থাকতাম আর যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখন তোমার কাছে চলে আসতাম।’
‘তোমাকে দেখার জন্যে আমিও তোমার কাছে এসে বসতে লাগলাম।’
‘আমার মনে হচ্ছে লোপা, তুমি যদি আমার অর্ধেক পরিশ্রম করতে, তাহলে মামার শিষ্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হতে পারতে।’
‘কিন্তু তোমার থেকে শ্ৰেষ্ঠ নয়!’ লোপা প্রবাহণের চোখ দুটির দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বলল, ‘আমি তোমার চেয়ে এগিয়ে যেতে চাই না।’
‘কিন্তু তাতে আমি বেশি খুশী হতাম।’
‘না, আমাদের দু’জনার আপনি আপন পৃথক সত্তা কিছু নেই।’
