‘হ্যাঁ, পথে বলিষ্ঠ ও বিশ্বামিত্রের মতো অনেক কুমীর লুকিয়ে আছে।’
‘এতে প্রমাণ হয় যে, আমি পরবশ হয়েছি, কালের গতি বদলাতে পারিনি, কাল কি ঘটবে তাও জানি না। কিন্তু আমি এতেই খুশী যে সুদাসের মতো পুত্র আমারই সন্তান। এক। সময় আমিও তরুণ ছিলাম। তখন পর্যন্ত বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রের শ্লোক মানুষের জীবনের ওপর এত মায়াজাল ছড়াতে পারেনি। আমি ভাবতাম, রাজা যে দসু্যুবৃত্তি করে সেটা কমাতে হবে; কিন্তু নিজের দুর্বলতার জন্যে তা পারিনি। সে সময় তোমার মা-ই ছিল যথাসর্বস্ব। তারপর আমি যখন ভগ্নীমনোরথ ও নিরাশ হয়ে পড়লাম তখন এই পুরোহিতরা শুধু নিজেদের কবিতা ও স্ততিগাথাই নয় নিজেদের কন্যাদের পাঠিয়ে আমাকে জড়িয়ে দিল। আমার অন্তঃপুর শত, শত দাসীকন্যায় ভরে গেল–এর তুলনা কেবল ইন্দ্রের সঙ্গেই চলতে পারে। দিবোদাসের এই অধঃপতন থেকে তুমি শিক্ষা নাও, সতর্ক হও এবং যত্নের সঙ্গে চেষ্টা কর। হয়ত তোমার সামনে পথের সন্ধান মিলবে; দুসুবৃত্তির অবসান সম্ভব হবে, কিন্তু সুদাসের মতো সহৃদয় শাসককে সরিয়ে হৃদয়হীন প্রবঞ্চক, প্ৰতর্দন-এর মতো শঠের হাতে রাজ্য দিলে পঞ্চলের ভালো হবে না। আমি পিতৃলোকে গিয়েও তোমার সযত্ন চেষ্টা লক্ষ করে সুখী হব।’
৪.
দিবোদাস দেবলোক প্ৰয়াণ। সুদাস এখন পঞ্চলের রাজা। ঋষিমণ্ডলী তার চারদিকে ঘুরতে শুরু করল। সুদাস বুঝল, ইন্দ্র বরুণ অগ্নি সোম প্রভৃতি দেবতার নাম নিয়ে এই শ্বেতশ্মশ্রু বৃদ্ধর লোকদের কিভাবে অন্ধবানিয়ে রাখে। তাদের শক্ত খপ্পরের আওতার পরিধি তার জানা ছিল। যাদের উপকার করবে বলে সে ঠিক করেছিল—সেই প্রজারাই তাকে ভুল বুঝল। অতীতের কথা মাঝে মাঝে তার মনে হত-ছিন্নবস্ত্ৰে, নগ্নপদে বিদেশে ঘুরে বেড়াবার সেই দিনগুলোর কথা। সেদিন তার মনে শান্তি ছিল অনেক বেশি। মুক্ত স্বাধীন সুদাসের হৃদয়ের ব্যথা বোঝবার মতো, তার প্রতি সহানুভূতি অনুভব করার মতো কোনো দরদী তার পাশে ছিল না। পুরোহিত ও ঋষিরা তাদের পৌত্রীদের, আর প্রদেশ সামন্তরী কুমারী মেয়েদের তার অন্তঃপুরে নিয়মিত পাঠাত। কিন্তু সুদাস নিজেকে আগুন লাগা ঘরে বসে থাকার মতো মনে করত। চন্দ্ৰভাগা নদীর তীরে অপেক্ষমানা সেই নীলনয়নী অপালার কথা সে ভুলতে পারত না।
সুদাস তার সমস্ত প্রজাদেরই-আর্য অনার্য নির্বিশেষে সকলেরই কল্যাণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ছিল। কিন্তু তার আগে তার দরকার হল–ঈশ্বরের কৃপার দিকে চেয়ে আছে যে প্রজা-সাধারণ, তাদের কাছে প্রমাণ করা যে, সুদাস ভগবানের করুণা লাভ করতে সমর্থ। আর এই অনুগ্রহ লাভের একমাত্র উপায় পুরোহিতদের প্রশংসাভাজন হওয়া। শেষ পর্যন্ত পুরোহিতদের কাছ থেকে এই প্রশংসা-বাণী আদায় করার জন্য তাকে হিরণ্য-সুবর্ণ, পশু-ধান্য, দাস-দাসী দান করা ছাড়া উপায় ছিল না। এইসবের পরেও চর্বিযুক্ত মাংস এবং সুস্বাদু মদ খাওয়ার পর পুরোহিতরা সিদ্ধান্ত করল, সত্যিই সুদাসের নামের যা অর্থসুদাতা তা সার্থক। এই সমস্ত চাটুকরেরা সুদাসের বদান্যতা সম্পর্কে অসংখ্য শ্লোক লিখেছিল–আজও সেগুলো ঋগ্বেদে পাওয়া যায়। কিন্তু কে বলতে পারে, এই সমস্ত স্তুতিবাদের রচয়িতাদের সুদাস কি গভীর ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখত! সুদাসের যশোগান অনতিবিলম্বে শুধু উত্তর পঞ্চালে, অর্থাৎ বর্তমান রুহেলাখণ্ডে সীমাবদ্ধ রইল না–আরও দূরে ছড়িয়ে পড়ল। নিজের ভোগ শূন্য জীবন দিয়ে সে যথাসাধ্য সমস্ত প্রজার কল্যাণার্থের কাজ করে চলেছিল। ।
পিতার মৃত্যুর কয়েক বছর পর তার মাতারও মৃত্যু হল। অভ্যস্ত হয়ে উঠবার আগে যে বেদনা অহোরাত্র তার হৃদয়ে বহ্নিমান ছিল তা আজ যেন বিপজ্জনক দুষ্ট ক্ষতের মতো তাকে পেয়ে বসল। প্রতি মুহূর্তে সে যেন দেখতে পেত, অপালা জলভরা চোখ আর কম্প্রমাণ ঠোঁট দুটি নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘আমি অপেক্ষা করে থাকব তোমা্র জন্যে–এই মাদ্রপুরে।’ সুদাসের চোখের সমস্ত জলও তার এই জ্বলন্ত চিন্তাকে নেভাতে। পারত না। একদিন মৃগয়ার ছলে সে পঞ্চালপুর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল।
যে পুরাতন গৃহে সে অপালার প্রেমলাভ করেছিল সেটি সেদিনও দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু জেতা বা তার প্রিয় কন্যার দেখা সে পেল না। দু’জনেই তখন গতায়ু হয়েছে। অপােলা মাত্র এক বছর আগে মারা গেছে। অপালার যে ভাই নিরুদ্দিষ্ট হয়েছিল, সে পরে ফিরে এসে সপরিবারে বাস করতে শুরু করছে; কিন্তু এই পরিবারের সঙ্গে নতুন করে সম্বন্ধ স্থাপন করার তার কোনো ইচ্ছা ছিল না। অপালার এক বান্ধবীর সঙ্গে সুদাসের দেখা হল। সে। কাঁদতে কাঁদতে সুদাসকে মৃত্যুর কতকগুলো রঙ্গীন পোষাক–ঘাঘরা, শাল, কাঁচুলি এবং ওড়না দেখিয়ে বলল, ‘আমার বান্ধবী তার শেষ দিনে সুদাসের নিকট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সে তার জন্যে এখানে অপেক্ষা করে থাকবে।’
সুদাস পোষাকগুলো নিয়ে তার বুকে চেপে ধরল। অপালার দেহের ঘ্রাণ তখনও সেই পোষাকের ভাঁজে ভাঁজে।’ *
———–
* ১৪৪ পুরুষ আগেকার কাহিনী। এই সময় আদি ঋষিরা-বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র ও ভরদ্বাজ ঋগ্বেদের শ্লোকসমূহ রচনা করেছিলেন। আর পঞ্চালভূমির রাজন্যবর্গ এইসব আর্যপুরোহিতদের সাহায্যে পুরাকালের গণতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থার মূলে চূড়ান্তভাবে আঘাত হানতে পেরেছিল।
০৮. প্রবাহণ (স্থান: পঞ্চাল (উত্তরপ্রদেশ)।। কাল: ৭০০ খৃষ্টপূর্ব)
‘একদিকে ঘন নিবিড় সবুজ বন, মহুয়ার মাদক গন্ধ, পাখীর কুজন, অন্যদিকে প্রবাহিণী গঙ্গার স্বচ্ছ ধারা, তীরে আমাদের হাজার হাজার কপিলা-শ্যামা গাভীগুলি চারে বেড়াচ্ছে, আর হুংকার দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিশাল বলিষ্ঠ বৃষভ। প্রবাহণ! এই মনোরম দৃশ্য? দেখে নয়ন তৃপ্ত করা উচিত। তুমি দেখছি দিনরাতই সাম গান (উদ্গীথ) গাইছ, অথবা বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র মন্ত্র আবৃত্তি করছ।’
