‘আৰ্য, এ রাজ্য আসলে পঞ্চালদেরই। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা পঞ্চাল-জনের সাধারণ লোক ছিল। তখন পঞ্চলের কোনো রাজা ছিল না। পঞ্চাল-জনের সাধারণ লোকেরাই শাসন চালাত। যেমন আজও মল্ল, মাদ্র অথবা গান্ধার-জনের লোকেরা চালায়। তারপর প্রপিতামহ বধ্যশ্ব; আত্মসুখের লোভ, ভোগের লোভ, অপরের পরিশ্রমের ফল ভোগের লোভে পড়েছিল। একদা সে হয়ত জন-পতি ছিল, পরে হয়ত সেনাপতি হয়েছিল, আর কয়েকটা যুদ্ধে জয়লাভ করে সারা জনের সম্মান লাভ করল। সেই সবের সুযোগ জনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করল। জন-শাসন খতম করে অসুরদের মতো ব্যক্তি-শাসন রাজত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করল। অনসুরদের মতোই পুরোহিতদের সৃষ্টি করল, বশিষ্ঠ বা বিশ্বামিত্রের পূর্ব পুরুষকে পুরোহিত পদ ঘুষ দেওয়া হল, তার পরিবর্তে সেই সব পুরোহিতরা সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে প্রচার শুরু করে দিল—ইন্দ্ৰ অগ্নি, সোম, বরুণ, বিশ্বদেব এবং অন্যান্য দেবতারা রাজাকে পাঠিয়েছে পৃথিবীর প্রজাকে শাসন করার জন্যে। কাজেই জনের সাধারণ মানুষ যেন রাজার হুকুম মেনে চলে আর যথাবিহিত সম্মান করে। এর সবটাই ছিল বেইমানি। ডাকাতির ভাগ বাঁটোয়ারা। পিতা! আমাদের পূর্ব পুরুষ যে রাজত্ব গড়ে গেছে তা বিশ্বাসহন্তার রাজত্ব। তাদের নাম পর্যন্ত আমাদের ভুলে যেতে হবে-তাদের প্রতি আমাদের কোনো রকম কৃতজ্ঞতা বা মোহ থাকা উচিত নয়।’
‘না পুত্র! বিশ্ব (সারা) জনকে আমি আমার রাজকৃত (রাজা করার অধিকারী) বলে স্বীকার করি। অভিষেকের সময় জনের সাধারণ লোকেই রাজচিহ্ন পলাশদণ্ড দেয়।’
‘রাজার অভিষেকের উৎসব একটা তামাশা মাত্র। সত্যি সত্যি কি জনের লোকেরা (প্রজারা) রাজার মালিক? না! আর এ কথা খুবই স্পষ্ট, যখন আমি দেখি, রাজা নিজের জনের সঙ্গে একত্ৰে সকলের সমান হয়ে বসে না, আহার করে না, কাজও করে না। মাদ্র বা গান্ধার জন-পতি কি এ রকম করতে পারত?’
‘আমরা যদি তাদের মতো থাকি তাহলে যে কোনো শত্ৰু, যে-কোনো সময় আমাদের হত্যা করবে বা বিষ দিয়ে মেরে ফেলবে।’
‘চোর বা অপহারকদেরই এ ভয় হতে পারে। জন-পতি চোর নয়, অপহারকও নয়। বস্তৃত তারা জনের শ্রেষ্ঠ সন্তান, তাদের ব্যবহারও সেইরকম–তাই তাদের ভয় নেই। আর রাজাদের কথা আলাদা, তারা জনের অধিকার অপহরণকারী, তাই সব সময়েই জনকে ভয় করে চলতে হয়। রাজাদের রাত্রিবাসের অন্তঃপুরের জন্য, সোনা-দানা রক্ষার জন্য সংগ্ৰহ করতে হয় ক্রীতদাস। রাজাদের রাজভোগ নিজের পরিশ্রমে অর্জিত নয় অপরের পরিশ্রম অপহরণ করে তা ভোগ করে।’
‘পুত্র! তুমি কি এর জন্য আমাকে দোষী সাব্যস্ত করছ?’
‘আৰ্য, তা মোটেই নয়! তোমার এ আসনে বসলে ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক আমাকেও তোমার মতো হতে হবে। তাই আমার পিতা দিবোদাসকে আমি দোষী সাব্যস্ত করছি না।’
‘তুমি যে পঞ্চাল-জনের হাতে রাজ্য ফিরিয়ে দিতে বলছ, তা কি সম্ভব? তোমাকে বুঝতে হবে, জনের অধিকার অপহারকা কেবলমাত্র পঞ্চালরাজ দিবোদাসই নয়; অপহারকদের মধ্যে আছে সামন্তরা। রাজা বড় হতে পারে। কিন্তু জনের সম্মিলিত শক্তির সামনে পঙ্গু। এদিকে আছে সামন্ত ও উগ্র রাজপুত্র (রাজবংশ-জাত সন্তানরা) এবং সেনাপতি ছাড়াও প্রধান সামন্ত হচ্ছে পুরোহিত।’
‘হ্যাঁ, পুরোহিতদের ক্ষমতার কথা জানি। জ্যেষ্ঠ পুত্র ছাড়া অন্যান্য পুত্ররা তো রাজপদ পায় না। তাই তারা পুরোহিত (ব্রাহ্মণ) হয়। আমার ছোট ভাই প্রতর্দনও হয়ত তাই হবে। রাজা ও পুরোহিতদের মধ্যে এখন রাজবেদী (সিংহাসন) ও যজ্ঞবেদী নিয়ে বাঁটোয়ারা হচ্ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি, ভবিষ্যতে ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণ দুটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী গড়ে উঠবে। মাদ্র ও গান্ধার দেশে যুদ্ধ ও যজ্ঞ উভয় কাজ একই লোক করতে পারে, কিন্তু পঞ্চালপুরের যুদ্ধবৃত্তি বাধ্যশ্ব পৌত্র দিবোদাসের হাতে, আর যজ্ঞ বিশ্বামিত্রের করায়ত্ত। ইতিমধ্যেই জনের অধিকার তিন ভাগে বঁটায়ারা হয়েছে। জনের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে রাজা ও পুরোহিতরা ক্ষমতার অধিকারী হিসাবে, জনের অধিকার হরণের অংশীদার হিসাবে, বৈবাহিক বন্ধনের দ্বারা এক হতে পারে; কিন্তু এখন এরা আলাদা আলাদা শক্তি হিসাবে গণ্য তাই স্বার্থের সংঘাত শুরু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে পৃথক গোষ্ঠীতে পরিগণিত হতে চলেছে। এই কারণেই ব্ৰাহ্মণ ক্ষত্রিয়ের সখ্য পুনঃস্থাপনের প্রয়াস দেখা দিয়েছে। জনের সাধারণ মানুষ এই দুই শ্রেণীর বাইরে। আজ এই বিশাল জনের নাম বদলে বিশ্ব (বিট) বা প্রজা বলা হচ্ছে। কি বিড়ম্বনা দেখ, একদিন যে জন (পিতা) ছিল, তাকে প্রজা (পুত্র) আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আর্য! একে কি তুমি প্রবঞ্চনা বলবে না?’
‘পুত্র! এ ছাড়াও আরো অনেকে আছে যাদের তুমি গণনার মধ্যে ধরনি।’
‘হ্যাঁ, আর্য জনের বাইরের প্রজাবৃন্দ, যেমন শিল্পী, ব্যবসায়ী, দাসদাসী। হয়ত এই কারণেই জনকে ক্ষমতাচ্যুত করায় সামন্তরা সফল হয়েছে। অনার্য প্রজারা যখন দেখে যে তাদের শাসক-জনের লোকেরা অন্যের দ্বারা নিগৃহীত হচ্ছে তখন তারা খুশীই হয়। আরএই ব্যাপারটাকেই রাজারা ন্যায়বিচার বলে জাহির করে।’
‘পুত্র! তুমি হয়ত ভুল বলছ না; কিন্তু আমায় বল তো, রাজ্য কার হাতে ছেড়ে দেব? চোর-অপহারক-সামন্ত ব্যবসায়ী এদের সকলকেই কি দেওয়া হবে? কেননা আৰ্য-জন ও অনাৰ্য প্ৰজা যারা সংখ্যায় যথেষ্ট তারা কি রাজ্যশাসন করতে পারবে? আর এদিকে ধর্মসামন্ত ও রাজা-সামন্তরা শুকনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে প্রজাদের ওপর—তাদের গ্রাস করার জন্যে তারা প্রস্তুত হয়েই আছে। মাত্র ছ-সাত পুরুষ আগেই কুর পঞ্চাল জনের হাত থেকে ক্ষমতা অপহৃত হয়েছে, জনের শাসনের কথা লোকে এখনও ভুলে যায় নি। সে সময় কোনো দিবোদাসের রাজত্ব ছিল না, তখন এই দেশকে পঞ্চালাঃ অর্থাৎ সারা পঞ্চালবাসীর দেশ বলা হত, দেশটা ছিল তাদেরই। কিন্তু আজ আর সেই অবস্থায় ফিরে যাবার পথ। নেই।’
