‘মাকে যে কথা দিয়েছ তার খেলাপ করাতে আমি চাই না, সুদাস! তোমার প্রতি আমার যে প্রেম তা চিরকালই থাকবে; এমন কি তুমি যদি আমায় ফেলে চলে যাও,.. তা’হলেও আমি অপেক্ষা করব তোমার জন্য–জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করব।–কিন্তু আমাদের নিজেদের কাছে করা প্রতিজ্ঞা আমরা দু’জনেই ভাঙতে পারি না।’
‘তোমার মনের কথা বল, অপালে!’
‘মানবভূমি ছেড়ে অ-মানবভূমিতে কখনো যাব না।’
‘অ-মানবভূমি, পঞ্চাল জনপদ?’
‘হ্যাঁ, যে দেশে নারীর স্বাধীনতা নেই–সে দেশে মনুষ্যত্বের মূল্য নেই।’
‘তোমার সঙ্গে আমি একমত।’
‘আর এই জন্যেই তোমাকে এই চুম্বন দিচ্ছি।’ এই বলে অপালা তা অশ্রুসিক্ত গালটি। সুদাসের ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল। সুদাসের চুম্বন শেষ হলে অপালা তার ঠোঁট দিয়ে সুদাসের ঠোঁটে দীর্ঘ চুমু খেল। তারপর বলল, ‘তুমি যাও, একবার মায়ের সঙ্গে দেখা করে এস; তোমার জন্যে আমি এই মাদ্রপুরে অপেক্ষায় থাকব।’
অপালার এই অকৃত্রিম কথাগুলি শুনে সুদাসের নিজের ওপর অসীম ঘৃণা জন্মল, যা কোনোদিনই সে মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মা বোপকে দেখতে যাওয়ার অনুমতি চাইল, পিতা-পুত্রী উভয়েই সম্মতি দিল।
প্রস্থানের আগের দিনটা অপালা বেশি বেশি করে সুদাসের আশেপাশে অনুক্ষণ ঘুরতে। থাকল। তাদের দু’জনেরই পদ্ম পাপড়ির মতো নীল চোখ দুটো জলে ভেসে যাচ্ছিল, আর ওরা তা গোপন করছিল না। ঘন্টার পর ঘণ্টা তারা চুম্বনে, নিভৃতে নীরব হয়ে চোখে চোখ রেখে বসে রইল, আবার কখনও দৃঢ় আলিঙ্গনে পরস্পরকে আবদ্ধ করল।
যাবার মুহূর্তে অপালা শেষবারের মতো তার কণ্ঠালগ্ন হয়ে বলল, ‘আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করে থাকব, সুদাস!’
৩.
সুদাস তার মাকে ভালোবাসত গভীরভাবে। পিতা দিবোদাস ছিলেন একজন প্রভাবশালী রাজা—যাঁর গুণগানে বিশ্বমিত্র ও ভরদ্বাজ শ্লোক লিখেছেন। এই শ্লোকগুলি লিপিবদ্ধ আছে ঋগ্বেদে, (ঋগ্বেদ, ৬/২৬/২, ২৫) এগুলো সংগৃহীত হওয়াও ঋগ্বেদে স্থান পাওয়ায় নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, ঋষিদের চাটুকারের অভাব ছিল না।
সুদাসের ভালোবাসা ছিল তার মায়ের জন্য। সে ভালোভাবেই জানত, তার মায়ের মতো দিবোদাসের আরো স্ত্রী আছে, আছে অসংখ্য দাসী। পঞ্চলের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী-রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্রের মা-হিসাবে বিশেষ সম্মান পেলেও বৃদ্ধ দন্তহীনার জন্যে। রাজার অন্তরে কোনো প্রেম ছিল না; দিবোদাসের অন্তঃপুরে রাত্রিবাসের জন্য নিত্য নব তরুণীর আনাগোনা ছিল। সুদাস মায়ের একমাত্র পুত্র হলেও তাঁর পিতার একমাত্র পুত্র ছিল। না। তার অনুপস্থিতিতে বৈমাত্ৰেয় ছোট ভাই প্ৰতর্দন দিবোদাসের উত্তরাধিকারী হত।
বছরের পর বছর কেটে যাবার পর সুদাসকে না দেখে মা তাকে দেখবার আশা ছেড়েই দিয়েছিল। আর অনবরত চোখের জল ফেলতে ফেলতে চোখের দৃষ্টি হয়েছিল ক্ষীণ সুদাস একদিন কাউকে খবর না দিয়ে, বাবার সঙ্গে দেখা না করে মায়ের সামনে এসে হাজির হল। মাকে নিষ্প্রভ চোখ দুটো মেলে সুদাসের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে সুদাস বলল, ‘মা! আমি তোমার সুদাস।’
শুনে মায়ের চোখ দুটো দীপ্ত হয়ে উঠল। কিন্তু নিজের জায়গা থেকে একটুও না নড়ে বলল, ‘তুই সত্যিই যদি আমার সুদাস, তবে আমার দৃষ্টির বাইরে দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোর দু’হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরছিস্ না কেন? তোর দু’হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরছিস্ না কেন? আমার কোলে মাথা রাখছিস না কেন?’
সুদাস মায়ের কোলে মাথা রাখল। মা হাত বুলিয়ে দেখল। নিজের চোখের জলে সুদাসের গাল, কপাল, চুল ভিজিয়ে দিয়ে বার বার চুমু খেতে লাগল। মায়ের চোখের জল বন্ধ করতে না পেরে সুদাস বলল, ‘মা! আমি তো এখন তোমার কাছে এসে গেছি, তবু কাঁদছ কেন তুমি?’
‘আজকের দিনটা, শুধু আজকের দিনটা আমায় কাঁদতে দাও। আজ আমি একটু কেঁদে নি। এই আমার শেষ কান্না সুদাস, আমার চোখের মণি!’
খবর গিয়ে পৌঁছাল অন্তঃপুর থেকে রাজার কানে। রাজা, এল দৌড়ে, সুদাসকে আলিঙ্গন করল, আনন্দীশ্রী বইতে লাগল তারও চোখে।
দিন কাটতে লাগল, দিন থেকে মাস গেল। বছর গেল–দুটো বছর শেষ হল। মাবাপের সামনে সুদাস মুখের প্রসন্নতা বজায় রাখার চেষ্টা করত, কিন্তু নির্জনে তার কানে সেই বজ্রচ্ছেদিকা ধ্বনি বেজে উঠত : ‘আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করে থাকব।’ আর–তার চোখের সামনে ভেসে উঠত সেই কম্প্রমান রক্তাভ ওষ্ঠদ্বয়–চোখের দৃষ্টি যতক্ষণ না ঝাপসা হয়ে উঠত, সে যেন অপালাকে দেখতে পেত! মনের দোটানায় ছিঁড়ে পড়ত। একদিকে অপালার অকৃত্রিম প্রেম অপরদিকে বৃদ্ধ মায়ের বাৎসল্য-ভরা হৃদয়। মায়ের হৃদয় বিদীর্ণ করে চলে যাওয়া নিজের কাছে আত্মসর্বস্ব নিচ কাজ বলে মনে হত। তাই সে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করল, মা বেঁচে থাকা পর্যন্ত পঞ্চাল ছেড়ে যাবে না। কিন্তু রাজ-পুত্রের মতো বিলাসিতার জীবন সে মেনে নিতে পারছিল না। সে বুঝেছিল এটা তার সামর্থ্যের বাইরে। অইতার প্রতি তার সশ্রদ্ধ ব্যবহার বজায় রেখে তার আদেশ পালনের চেষ্টা করত।
একদিন বৃদ্ধ রাজা পুত্রকে ডেকে বললেন, ‘বৎস সুদাস! আমার দিন শেষ হয়ে এসেছে। আর আমার পক্ষে পঞ্চলের শাসনভার বহন করা সম্ভব নয়।’
‘তাহলে আর্য এই ভার পঞ্চালদের ওপর দিচ্ছ না কেন?’
‘পঞ্চালদের? তোমার অভিপ্ৰায় আমি বুঝতে পারলাম না।’
