সুদাসের বুক দুরদুর করে উঠল। তার মনের চাঞ্চল্য যাতে মুখে ফুটে না ওঠে তারই চেষ্টা সে প্রাণপণে করতে লাগল, কিন্তু তাতে সফল না হয়ে কথাটা ঘুরিয়ে দেবার জন্যে বলল, ‘আর্যবৃদ্ধ! পঞ্চালরাজ কি তোমার ঘোড়াগুলো কিনল?’
‘হ্যাঁ, কিনল। তো বটেই, ভালো দামও দিল। কত দিয়েছে এখন আর মনে নেই। কিন্তু দেখতে দেখতে আমার জ্বর আসছিল, পঞ্চাল-জনের রাজার সম্মানে নতজানু হয়ে যেভাবে বন্দনা করছিল তা দেখে কার না গা ঘেন্নায় শিউরে ওঠে। যদি মাথাও কেটে নেওয়া হয় তবু। কোনো মাদ্র ওইভাবে মাথা নোয়াতে পারবে না।’
‘তোমাকে তো আর ওই রকম করতে হয়নি, আর্যবৃদ্ধ?’
‘আমাকে বললে ওইখানেই খুনোখুনী হয়ে যেত। পূর্ব-দেশের রাজারা কোনো ওই ধরনের হুকুম করতে সাহস পায় না। তবে ওখানে, ওটা তাদের সনাতন রীতি।’
‘কোন বলুন তো?’
‘কেন, জানতে চাও? সে এক বিরাট কাহিনী। যখন পশ্চিম থেকে এগোতে এগোতে পঞ্চাল-জনের লোকেরা যমুনা, গঙ্গা ও হিমালয়ের মধ্যবতী দেশে বসতি স্থাপন করল তখন তারা মাদ্র-জনের মতো একটি পরিবারের মতো থাকত। তারপর অসুরদের সঙ্গে ওদের মেলামেশা বাড়তে লাগল আর তাদের অনুকরণে পঞ্চাল-জনের লোকেদের মধ্যে অনেক সর্দার, রাজা বা পুরোহিত হবার জন্য লালায়িত হতে লাগল।’
‘কিন্তু লালায়িত হল কেন?’
‘লোভের জন্য, নিজে মেহনত না করে অন্যের পরিশ্রমের ফল ভোগ করার জন্যে। এই রাজা ও পুরোহিতরাই পঞ্চালদের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করেছে–এরাই আর তাদের মানুষ থাকতে দেয়নি’–কথা বলতে বলতে জেতা নিজের কাজে চলে গেল।
২.
মাদ্রপুরে (শিয়ালকোট) জেতার পরিবারের মধ্যে সুদাস চার বছর কাটিয়ে দিল। জেতার স্ত্রী ইতিপূর্বেই মারা গেছে। বিবাহিতা ভগ্নী ও কন্যাদের মধ্যে দু’একজন মাঝেমধ্যে এসে থাকত। কিন্তু গৃহের স্থায়ী বাসিন্দা ছিল জেতা, সুদাস আর অপালা। অপালার বয়স এখন বছর কুড়ি। উভয়ের ব্যবহারে বেশ বোঝা যেত যে, অপালা ও র মধ্যে পারস্পরিক প্রেম বিদ্যমান। মাদ্রপুরের সুন্দরীদের মধ্যে অপালার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল আর সেখানে সুন্দর তরুণের অভাব ছিল না। যারা তার প্রেম প্রার্থনা করত। আবার সুদাসের মতো। সুপুরুষ যুবকের জন্যে সুন্দরী তরুণীরও অভাব ঘটত না। কিন্তু এখানকার লোকেরা সর্বদাই দেখেছে। সুদাসকে অপালার সঙ্গে আর অপােলাকে সুদাসের সঙ্গে নাচতে। জেতাও এ কথা জানত, এর পরিণামের কথা ভেবে সে খুশীও হত যদি সুদাস স্থায়ীভাবে তাদের মধ্যে বসবাস করতে রাজী হয়। কিন্তু সুদাস মাঝে মাঝে তার বাবা মা সম্বন্ধে উৎকণ্ঠিত হয়ে। পড়ে তাতেই জেতার ভাবনা, কারণ সে জানত, সুদাস মা-বাপের একমাত্র সন্তান।
চন্দ্ৰভাগা নদীর অপর নাম ছিল প্রেমিক-প্রেমিকদের নদী। একদিন অপালা ও সুদাস সেখানে স্নান করতে গেছে। এর আগেও অনেকবারই স্নানের সময়ে সুদাস অপালার নগ্ন। শারীরিক সৌন্দর্য দেখেছে, কিন্তু প্রায় পঞ্চাশটি নিরাভরণ দেহের সুন্দরীর নগ্ন সৌন্দর্যের। পাশে অপলার সৌন্দর্য দেখে মনে হল যে, আজই যেন প্রথম সে তার সঙ্গিনীর অপরূপ : লাবণ্যময়ী রূপ-মাধুরীর পূর্ণ পরিচয় পেল। ফিরবার পথে সুদাসকে মৌন দেখে অপালা প্রশ্ন করল, ‘সুদাস! আজ যে তুমি কথা বলছি না, খুব পরিশ্রান্ত না-কি? চন্দ্রভাগার খরস্রোতে দু’বার সাঁতরে পাড়ি দিলে পরিশ্রম তো হবেই।’
‘পরিশ্রম তো তোমারও হয়েছে অপােলা! তুমিও একবার পাড়ি দিয়েছ, আর আমি মাত্র দু’বার; সময় পেলে দশবার এপার-ওপার করতে পারতাম।’
‘জল থেকে উঠবার সময় আমি দেখছিলাম তোমার বুকের ছাতিটা চওড়া হয়েছে; তোমার হাত পায়ের পেশীগুলিও যেন দ্বিগুণ স্ফীত।’
‘সীতার কাটা খুবই ভালো এতে শরীর বলিষ্ঠ ও সুন্দর হয়। কিন্তু অপালা তোমার, সৌন্দর্যের সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। তুমি ত্ৰিভুবনের মধ্যে অনুপম সুন্দরী।’
‘নিজের চোখ দিয়েই দেখে বলছি তো সুদাস?’
‘হ্যাঁ! মোহের বশবতীর্ণ হয়ে বলছি না। অপালা!’
‘বেশ! কিন্তু তুমি কোনোদিন আমার চুম্বন প্রার্থনা করনি, অথচ তুমি জান, মাদ্র তরুণীরা এ জিনিস খুবই উদারভাবে বিতরণ করে থাকে।’
‘সে তো তোমাকে দেখে আমি আমার ভাই শ্বেতপ্রবাহকেই দেখতে পাই।’
‘তাহলে এখন আর চুমু দেবে না?’
‘চাইলে কেন দেব না?’
‘আর চাইলে তুমি আমার হবে?’
‘ও কথা বলো না। সুদাস! অস্বীকার করলে আমিই দুঃখ পাব।’
‘কিন্তু এ দুঃখ আসতে না দেওয়া তোমারই হাতে।’
‘আমার নয়, তোমারই হাতো।’
‘কি ভাবে?’
‘তুমি কি সারা জীবনের জন্যে আমার পিতার এই ঘরে থাকতে প্রস্তুত?’
সুদাস বহুদিন থেকেই এই মুহূর্তটির আশঙ্কা করছিল, যখন মধুভরা ওই মুখ থেকে এই কঠিন প্রশ্নটি শুনতে হবে। বিদ্যুতের মতো কথাটা মৰ্মস্থলে আঘাত করল এক মুহূর্তের জন্য মুখটা স্নান হয়ে উঠেছিল। দ্বিধা ও সঙ্কোচে। কিন্তু তার মনোভাব অপালাকে বুঝাতে না দিয়ে সে শান্তভাবে বলল, ‘আপালে, তোমায় আমি ভালোবাসি।’
‘তা আমি জানি, আর তুমিও আমার মনের কথা জােন। আমি চিরকালের জন্যই তোমার হয়ে থাকতে চাই, তাতে আমার বাবাও খুশী হবে। কিন্তু তার জন্যে তোমায় পঞ্চাল থেকে চিরবিদায় নিতে হবে!’পঞ্চাল চিরকালের জন্যে ছেড়ে দেওয়া আমার পক্ষে কঠিন নয়; কিন্তু সেখানে রয়েছে আমার বৃদ্ধ মাতা-পিতা। আমি ছাড়া মায়ের আর কোনো সন্তান নেই। মাকে আমি কথা দিয়েছিলাম, মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে দেখা আমি করবই।’
