জেতার ক্ষেত যে খুবই বড় ছিল তা মাড়াই করার জন্য উপস্থিত দুই শতের বেশি। লোক দেখে বোঝা যায়। ক্ষেতের এক প্রান্তে রন্ধন কাজে ব্যাপৃত লোকেরা ব্যস্ত। একটা পুষ্ট ষাঁড় আজ কাটা হয়েছে তার কিছু হাড়, নাড়িতুড়ি আর কিছুটা মাংস টুকরো করে বড় ডেকচিতে সন্ধ্যা হবার ঘণ্টা দিনেক আগেই চাপানো হয়েছিল। বাকিটা নুনের সঙ্গে জলে ফুটিয়ে রাখা হচ্ছে। ঘরগুলোর পাশেই বড় সমতলভূমি–মাড়াই এর কাজ হয়। জলের জন্য কাঁচা পাতকুয়া আর জলভর্তি কুণ্ড ছিল। স্ত্রী-পুরুষেরা এখানে হাত মুখ ধুচ্ছিল–কেউ কেউ অবগাহন করে নিল। রাত্রের অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জলের ধারে সারি দিয়ে বসা স্ত্রী পুরুষের সামনে রুটি, মাংসখণ্ড ও পাত্রভর্তি মদ দেওয়া হল। সুদাসের লাজুকতার কথা মনে রেখে অপালা তাকে তার পাশেই বসিয়েছিল, সুদাসকে দেখে তার নিরুদ্দিষ্ট ভাই-এর কথাই মনে পড়ছিল। খাওয়ার পর নাচ-গান শুরু হল। আজকের রাতের নৃত্য আসরে সুদাস যোগ দেয়নি বটে, কিন্তু পরবর্তীকালে এই নৃত্যসভায় সে সর্বপ্রয় গায়ক ও নর্তক হয়েছিল।
মাস দেড়েক ফসল কাটা, মাড়াই ও বাঁধার কাজ চলতে লাগল। সপ্তাহ দুই যেতে না যেতে সুদাসকে যেন আর চেনাই যায় না–একেবারে নতুন মানুষ। তার গালে স্বাভাবিক রক্তাভা দেখা দিল। হাড় আর শিরাগুলো মাংস ও চামড়ার মধ্যে ঢাকা, পড়ে গেছে। প্রথম সপ্তাহের শেষে জেতা তাকে এক প্রস্থ কাপড় উপহার দিয়েছে।
ফসল মাড়াই-এর কাজ প্রায় শেষ হয়ে এল। পিতা-পুত্রী ও সুদাস সমেত মোট জনা ছয়েক তখনও কাজ করছিল–বাকি সকলে ফসলের ভাগ নিয়ে চলে গেছে। এইসব লোকদের জমির পরিমাণ খুবই কম, তাই তারা নিজেদের ফসল কাটার পর জেতার জমিতে এসে কাজ করত।
একদিন সন্ধ্যার পর জেতা সুদাসের সামনে পূর্ব-দেশ সম্বন্ধে আলোচনা শুরু করল। অপালা পাশে বসে শুনতে লাগল। জেতা বলল, ‘সুন্দা’ পূর্ব-দেশে আমি খুব বেশীদূর পর্যন্ত যাইনি বটে, কিন্তু পঞ্চালপুরে (অহিচ্ছত্ৰে) আমি গেছি। সেখানে শীতকালে আমি ঘোড়া বিক্রী করতে যেতাম।
‘পঞ্চাল (রোহিলখণ্ড) তোমার কেমন লাগল, হে আর্যবৃদ্ধ!’
’জনপদ হিসাবে মন্দ নয়, আমাদের এই মাদ্র দেশের মতোই সুরক্ষিত ও সম্পন্ন বরং ক্ষেতের উর্বরতার দিক থেকে এখানকার চেয়ে বেশি সুফলা, কিন্তু…’
‘কিন্তু কি?’
‘ক্ষমা কর সুন্দা–ওখানে মানুষ থাকে না।’
‘মানুষ থাকে না! তাহলে থাকে কারা–দেবতা না দানব?’
‘আমি এইটুকুই শুধু বলব যে, ওখানে মানুষ থাকে না।’
‘আর্যবৃদ্ধ! আমি রাগ করব না, আমায় বল, কেন তোমার এই ধারণা?’
‘তুমি এখানে দু’শো নর-নারীকে আমার ক্ষেতে কাজ করতে দেখেছ?’
‘হ্যাঁ, সে তো দেখতেই পাচ্ছি।’
‘তারা আমার জমিতে কাজ করে। জমিতে কাজ করে বেতন পায় কিন্তু কখনও কি দেখেছি মাথা নিচু করে তাদের হীনতা প্ৰকাশ করতে?’
‘না, বরং মনে হয় সকলেই যেন তোমার পরিবারের মানুষ।’
‘হ্যাঁ, একেই মানুষ বলে। তারা আমার পরিবারেরই লোক। সকলেই মান্দ্রের নরনারী। পূর্ব-দেশেও এই রকম দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে দাস ও স্বামী সম্পর্ক, মানুষ নেই, বন্ধু পাওয়া যায় না।’
‘আর্যবৃদ্ধ! তুমি সত্য বলেছ। মানবতার মূল্য শতদ্রু পেরিয়ে এই মাদ্রভূমিতে এসে দেখছি। মানুষের মধ্যে বাস করতে পাওয়াটা আনন্দ ও সৌভাগ্যের কথা।’
‘পুত্ৰ, তোমার কথায় আমি খুশি হয়েছি। তুমি আমার কথায় রাগ করনি। আপন আপন জন্মভূমিকে সকলেই ভালোবাসে, তা হল দেশপ্ৰেম।’
‘কিন্তু প্রেম মানে দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে চোখ বুঁজে থাকা নয়!’
‘আমি কুরু-পঞ্চাল দেশে যাবার সময় বহুবার এ কথা ভেবেছি, এ দেশের পণ্ডিতদের সঙ্গে আলোচনাও করেছি। এইসব দোষ কি করে এল। তার কারণ, বুঝতে পেরেছি, কিন্তু। প্ৰতিকার কি করে হবে জানি না।’
‘কারণগুলো কি আর্যবৃদ্ধ?’
‘যদিও পঞ্চালদের বাসস্থানকে পঞ্চাল জনপদ বলা উচিত, কিন্তু পঞ্চলের অর্ধেক অধিবাসীও পঞ্চাল-জনের নয়।’
‘ হ্যাঁ, বাইরে থেকে আসা আগন্তুকও অনেক আছে।’
‘আগন্তুক নয় পুত্র! আদি-নিবাসী অনেক আছে। ওখানকার শিল্পী, কারিগর, ব্যবসায়ী,ওখানকার দাস, সকলেই পঞ্চাল-জনের লোকেরা ওখানে পৌঁছবার অনেক আগে থেকেই বাস করত। তাদের গায়ের রঙ দেখেছ?’
‘হ্যাঁ, পঞ্চাল-জন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কালো অথবা তাম্রবর্ণ।’
অপালা প্রশ্ন করল, ‘পঞ্চাল-জনের গায়ের রঙ কি মাদ্রদের মতোই গৌরবর্ণ।’
সুদাস উত্তর দিল, ‘কম বেশি হবে।’
জেতা বলল, ‘হ্যাঁ কম বা বেশি। কেননা অন্যের সঙ্গে রক্ত সংমিশ্রণের ফলে এই পরিবর্তন ঘটেছে। আমার ধারণা, যদি মাদ্রদের মতোই ওখানে শুধু পিঙ্গল কেশ আর্যরা বাস. করত তাহলে হয়ত শুধু মানুষ দেখা যেত। আর্য ও আর্য-ভিন্ন দুই উঁচু-নীচু ধারণা থেকেই ভিন্ন বর্ণের সৃষ্টি হতে পারে।’
‘তুমি ঠিকই বলেছ। তুমি বোধহয় জান, এই আর্য-ভিন্নদের অর্থাৎ যাদের আগে অসুর বলা হত তাদের মধ্যে উঁচু-নীচু ও প্রভুর সম্বন্ধ বিদ্যমান ছিল।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু পঞ্চালেরা সকলেই তো আর্য-জনের এক রক্ত এক শরীর থেকে জন্মলাভ করেছে। কি করে তাদের মধ্যে উঁচু-নীচু ভেদাভেদ এসে অনুপ্রবেশ করল! পঞ্চলের রাজা দিবোদাস একবার আমার কাছ থেকে ঘোড়া কিনেছিল, আমাকে তার সামনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সুগঠিত দেহ গৌরবর্ণের যুবক, কিন্তু মাথায় এক ভারী মুকুট, তাতে লাল হলদে। রঙ। কানে বড় বড় কুণ্ডল। তার আঙ্গুলো ও গলায় নানা অলঙ্কার। তাকে দেখে আমার মন, করুণায় ভরে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল পূৰ্ণচন্দ্রকে যেন রাহু গ্ৰাস করেছে। তার সঙ্গে তার স্ত্রীও ছিল, তাকে যে-কোনো মাদ্র সুন্দরীর মতোই দেখাচ্ছিল। কিন্তু লাল-হলদে অলঙ্কারে বেচারী নুয়ে পড়েছিল।’
