মাথাভরা সোনালী চুলে শিরস্ত্ৰাণ, পরণে কঁচুলি ও অন্তর্বাস আর শরীরের উপরাং উত্তরীয় দিয়ে ঘেরা– সাধারণ হলেও শালীনতা সম্পন্ন বেশভূষার সজ্জিত কুমারীকে পথিক দেখল। রৌদ্রে পথ চলার ফলে তরুণীটির মুখ রক্তিমাও, আর তাঁর কপাল ও ঠোঁটের ওপর দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল। তরুণীটি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অপরিচিত পুরুষটির দিকে তাকিয়ে। দেখল, তারপর মাদ্রদেশের মেয়েদের সহজাত মৃদু হাসিতে মুখখানিকে উদ্ভাসিত করে যুবকের অর্ধেক তৃষ্ণা মিটিয়ে মধুস্বরে প্রশ্ন করল, ‘ভাই আমার মনে হচ্ছে তুমি খুবই তৃষ্ণার্তা।’
পথিক ক্ষীণকণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ আমি খুবই তৃষ্ণাৰ্তা।’
‘বেশ, আমি তোমায় জল এনে দিচ্ছি।’
তরুণীর জলপাত্র ভর্তি হল। ততক্ষণে পথিকও আস্তে আস্তে উঠে তার পাশে এসে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ দেহ ও মোটা হাড়ের চেহারা লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে, তার শরীরে অসাধারণ পৌরুষ বিদ্যমান। মাশকের সঙ্গে চামড়ার গেলাসটি ভরে তরুণী পথিকের হাতে দিল। পথিক এক চুমুক জল কোনো রকমে ঢোকা গিলে খেয়ে মাথা নিচু করে একটু বসে। রইল। তারপর এক নিশ্বাসে গেলাসের সমস্ত জলটাই শেষ করল। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত থেকে গেলাসটা ছিটকে গড়িয়ে পড়ল আর নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করেও পেছনে ঢলে পড়ল। তরুণী কিছুক্ষণের জন্য হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তারপর তরুণের চোখের দিকে চেয়ে বুঝল, সে অজ্ঞান হয়ে গেছে। বুঝতে পেরেই সে চট করে নিজের মাথায় বাঁধা শিরস্ত্রাণের কাপড়টি জলে ভিজিয়ে চক্ষু ও কাঁপাল মুছে দিতে লাগল। এইভাবে কিছুক্ষণ। কাটার পর যুবকটি চোখ খুলল। তরুণীটিকে সেবা করতে দেখে লজ্জা ও কুষ্ঠার সঙ্গে বলল, ‘তোমাকে এইভাবে কষ্ট দেওয়ার জন্যে আমি খুবই দুঃখিত।’ ‘আমার কোনো কষ্ট হয় নি, আমি ভয় পেয়েছিলাম। এই রকম কেন হল ভেবে?’
‘বিশেষ কিছু নয়, পেটটা একেবারে খালি তার ওপর অত্যধিক তৃষ্ণায় বেশি জল খেয়েছিলাম–তাই। কিন্তু এখন আর কোনো কষ্ট নেই।’
‘তোমার পেট একেবারে খালি?’ এই কথাগুলি বলে পথিককে জবাব দেবার কোনো অবসর না দিয়ে তরুণী এক দৌড়ে এক পত্র দই, ছাতু ও মধুনিয়ে উপস্থিত হল। তরুণের চেহারায় সঙ্কোচ ও লজ্জার ভাব দেখে কুমারী বলল, ‘পথিক, কোনো সঙ্কোচ কর না। কয়েক বছর হল, আমার ভাই ঘর ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়েছে, তোমার চেহারার সঙ্গে তার অনেকটা মিল আছে তাই তোমাকে সাহায্য করার সুযোগ পেয়ে আমার সেই হারানো ভাইএর কথাই মনে পড়ছে।’ [* প্ৰায় দেড়শত পুরুষ আগেকার কাহিনী।]
পথিক পত্র নিয়ে নিল। তরুণী বালতি থেকে জল দিল। যুবকটি সেই জলে ছাতুগুলে পান করল। খাওয়া-দাওয়ার পর তার চেহারা থেকে পথশ্রমের চিহ্ন প্রায় অর্ধেকটা মুছে। যেতে তার মুখে ফুটে উঠল একটা কৃতজ্ঞতার ভাব। কিভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায়–সে ভাবছিল।
তরুণী তার মনের ভাব আঁচ করেই বলল, ‘সঙ্কোচ করার কোনো দরকার নেই। বোধহয় তুমি অনেক দূর থেকে আসছি, তাই না?’
‘ হ্যাঁ, অনেক দূর, পূর্বদিক–পঞ্চাল থেকে।’
‘কোথায় যাবে?’
‘এখানে ওখানে–যেখানে হোক।’
‘তবু?’
‘এখন তো আমি কাজ খুঁজছি, যাতে খাওয়া-পরার ব্যবস্থাটা হতে পারে।’
‘কোন করব না? চাষের সব কাজই পারি। মাড়াই করতেও জানি। গরু, ঘোড়ার রাখালিতাও পারি। আমার শরীরে শক্তিও যথেষ্ট, এখন একটু কাহিল হয়ে পড়েছি বটে কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে আবার কঠিন পরিশ্রমের উপর্যুক্ত স্বাস্থ্য আমি ফিরে পাব। এটা বলতে পারি যে, আমার কাজে কোনোদিনই কোনো মালিক অখুশী হয়নি।’
‘তা’হলে আমার মনে হচ্ছে আমার বাবা তোমাকে কাজ দেবে। জলের পাত্র ভরে নিই, তুমি আমার সঙ্গে চল।’
তরুণটি মশক বয়ে নিয়ে যাবার জন্যে চেষ্টা করল, কিন্তু তরুণী কিছুতেই রাজী হল না। ক্ষেতের ওপর একটি লাল তাঁবু আর বাইরে বসেছিল প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ জন স্ত্রী-পুরুষ। এদের মধ্যে তরুণীর পিতা কে, পথিক সেটা আন্দাজ করতে পারল না। সকলেরই সাদা কাপড়, হরিতাভ কেশ, গৌরবর্ণ গায়ের রঙ ও প্রাণবস্তু মুখ। তরুণী জল-ভরা মশক ও বালতিটি রাখল, তারপর ষাট বছরের বৃদ্ধ কিন্তু বলিষ্ঠ দেহ পুরুষের কাছে গিয়ে বলল, ‘পিতা, এই পরদেশী তরুণ কাজ চাইছে।’
‘হে কন্যা! ক্ষেতের কাজ করতে চায় কি?’
‘ হ্যাঁ, যেখানে হোক।’
‘তাহলে এখানেই কাজ করুক। অন্যরা যা মজুরী পায় সেও তাই পাবে।’
তরুণ কথাবার্তা সবই শুনছিল। বৃদ্ধ তাকে ডেকে নিয়ে কথাগুলি আবার বলল, সে রাজী হল। বৃদ্ধ পুনরায় তাকে বলল, ‘এস আগন্তুক, আমরা এখন মধ্যাহ্ন ভোজন করছি—তুমিও যোগ দাও।’
‘হে আৰ্য! আমি এখনি খেয়েছি, তোমার মেয়ে আমাকে দিয়েছে।’
‘আৰ্য-টার্জ নই, আমার নাম জেতা, ঋজু-পুত্র মাদ্র। এস তুমি যা পার খাও ও পান। কর। অপালা, মেরীয় (ঘোটকীর দুধে তৈয়ারী কাঁচা মদ) দাও তো। রৌদ্র-তাপে দগ্ধ হলে শরীরে বল এনে দেবে। হে তরুণ! এখন আর কোনো কথা নয়। সন্ধ্যায় আমরা আলাপআলোচনা করব। তোমার নামটা বলা।’
‘সুদাস পঞ্চাল।’
‘সুদাস নয়, সুন্দা–সুন্দর দান দেয় যে! তোমরা পূর্ব-দেশের লোকেরা ঠিকমতো শব্দের উচ্চারণ করতে পার না। তোমার দেশ পঞ্চাল জনপদে? ভালো কথা। অপালা, এই পূর্ব-দেশের লোকেরা একটু বেশি লাজুক হয়। একে ভালো করে খাওয়াও, যাতে সন্ধ্যার মধ্যে কিছু কাজ করার উপর্যুক্ত হয়ে উঠতে পারে।’
অপালার উপরোধ সুদাস দু’তিন পাত্র মেরায় আর রুটি গলাধঃকরণ করল। গত দুদিন তার পেটে কিছু পড়েনি। তাই ক্ষুধাবোধও কমে গেছে। সূর্যের তেজ যতই কমতে লাগল সুদাসের শরীরেও তত বল ফিরে আসতে লাগল আর সন্ধ্যার কাজ শেষ হবার আগে দেখা গেল, ক্ষেতে গম কাটার ব্যাপারে সে কারুর পেছনে পড়ে রইল না।
