আবার পীর ও দরবেশ সুফীরা অনেক সময় হিন্দুরাজ্য জয় করিবার জন্য যুদ্ধও করিতেন। মুসলমানদের মধ্যে প্রবাদ আছে যে শাহ জালাল নামে এক সুফী দরবেশ তাঁহার পীর অর্থাৎ গুরুর আদেশে এবং উক্ত গুরুর ৭০০ শিষ্যসহ বহু যুদ্ধ করিয়া অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিন্দুরাজ্য জয় করেন এবং সেখানে ইসলাম ধর্ম্মের প্রতিষ্ঠা করেন। পরিশেষে শ্রীহট্টের রাজাকে পরাজিত ও ঐ দেশ অধিকার করিয়া অনুচরগণসহ সেখানে বসবাস করেন। সম্ভবতঃ বাংলার সুলতানের সৈন্যদের সহায়তাই তিনি এই যুদ্ধে জয়লাভ করিয়াছিলেন। কোন কোন পীর সুলতান কর্ত্তৃক শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত হইয়াছিলেন এবং মুসলমান সেনাপতি হিন্দু রাজ্য জয় করিয়া পীর উপাধি এবং পীরের খ্যাতি ও সম্মান লাভ করিয়াছেন এরূপ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তও আছে। সুতরাং পীরেরা শস্ত্র ও শাস্ত্র দুইটিতেই সমান দক্ষ ছিলেন। ধর্মপ্রচার ও শস্ত্রচালনা এই দুই উপায়েই বাংলায় মুসলমান রাজ্য ও ইসলাম ধর্ম্মের বিস্তারে তাঁহারা সহায়তা করিতেন।
যে সকল নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিল তাহারা আরবী জানিত না এবং যদিও কেহ কেহ সামান্য ফার্সি জানিত, তথাপি মুসলমান ধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধে তাহাদের বিশেষ কোন জ্ঞানও ছিল না। ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত যে এই অবস্থা ছিল দুইজন মুসলমান লেখকের রচনা হইতে তাহা জানা যায়। একজন লিখিয়াছেন যে বাঙালী মুসলমানেরা না বোঝে আরবি, না বোঝে নিজের ধর্ম–গল্প কাহিনী প্রভৃতি লইয়াই তাহারা মত্ত থাকে। আর একজন মহাভারতের বাংলা অনুবাদ-সম্বন্ধে লিখিয়াছেন :
হিন্দু মোছলমান তাহা ঘরে ঘরে পড়ে।
খোদা রসুলের কথা কেহ না সোঙরে ॥ [স্মরণ করে]
তবে ইসলাম ধর্ম্মের যে পাঁচটি মূল তথ্য বা তত্ত্ব, তাঁহার মধ্যে প্রথম চারিটি–ইমান (ঈশ্বরে ও পয়গম্বরে বিশ্বাস), নমাজ, রোজা ও হজ (মক্কা প্রভৃতি তীর্থ দর্শন) বাঙালী মুসলমানেরাও যথারীতি পালন করত। পঞ্চম-জকাৎ অর্থাৎ নিজের আয়ের এক নির্দিষ্ট অংশ গরীব দুঃখীকে নিয়মিত দান–কতদূর প্রতিপালিত হইত তাহা বলা যায় না।
খাঁটি ইসলামের অতিরিক্ত এবং অননুমোদিত কতকগুলি সংস্কার ও প্রথা বাংলায় মুসলমান সমাজে প্রচলিত ছিল। কারণ নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা বহু সংখ্যায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিলেও তাহাদের কোন কোন বিশ্বাস ও সংস্কার ছাড়িতে পারে নাই। সুতরাং তাহা ধীরে ধীরে মুসলমান সমাজে প্রবেশ করিয়াছে। ইহার কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিতেছি।
হিন্দুদের গুরুবাদ অর্থাৎ গুরুর প্রতি অবিচলিত শ্রদ্ধা ও ভক্তি মুসলমান পীরের প্রতি ভক্তিতে রূপান্তরিত হইয়াছিল ইহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। কিন্তু ক্রমশঃ ইহা পঞ্চপীর-সত্যপীর, মাণিকপীর, ঘোড়াপীর, কুম্ভীরপীর, মদারী (মৎস্য ও কচ্ছপ) পীর–প্রভৃতির পূজায় পর্যবসিত হইল। বন্ধ্যার পুত্র লাভের জন্য নানা অনুষ্ঠান, কুম্ভীরের কৃপায় সন্তান লাভ হইলে প্রথম সন্তানটি কুম্ভীরকে দান, মদারীকে ভোজ্য দান, বৃক্ষে সূত্র বন্ধন ইত্যাদি নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের কুসংস্কার তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান সমাজেও প্রবেশ করিল।
মোল্লা নামে আর একটি নূতন যাজকশ্রেণীর আবির্ভাবও উল্লেখযোগ্য। ইহারা হিন্দুদের পুরোহিতের মতন গ্রামবাসীর নিত্যনৈমিত্তিক ধর্ম্মানুষ্ঠান এবং বিবাহাদি ক্রিয়া অনুষ্ঠিত করিত। লোকের গলায় পুঁতি ঝুলাইয়া তাহাকে ভূতের উপদ্রব হইতে রক্ষা করিত এবং সঙ্গে সঙ্গে কসাইয়ের ব্যবসা অর্থাৎ মুরগী, বকরী ইত্যাদি জবাই করিত। এই সমুদয় হইতে যে অর্থলাভ হইত তাহাই ছিল তাহাদের উপজীব্য।
ষোড়শ শতাব্দীতে লিখিত কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে মোল্লার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আছে :
মোল্লা পড়ায়্যা নিকা দান পায় সিকা সিকা
দোয়া করে কলমা পড়িয়া।
করে ধরি খর ছুরি কুকুরা জবাই করি
দশ গণ্ডা দান পায় কড়ি ॥
পীরের ন্যায় মোল্লাও ইসলামের অননুমোদিত ধর্মযাজক এবং হিন্দু সমাজের গুরু পুরোহিতের অনুকরণ।
প্রাচীন মুসলমান সাধুসন্তদের ও পীরদের সমাধির প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁহাদের কৃপায় ব্যারাম-পীড়া হইতে আরোগ্যলাভ হইতে পারে এইরূপ বিশ্বাসও প্রচলিত ছিল। এরূপ বিশ্বাস ইসলাম ধর্ম্মের অননুমোদিত। অতএব ইহা সম্ভবতঃ হিন্দু সমাজের প্রভাব সূচিত করে। এইরূপ আরও অনেক কুসংস্কার মুসলমান সমাজে প্রচলিত ছিল।
হিন্দু সমাজে জাতিভেদের কিছু প্রভাবও মুসলমান সমাজে দেখা যায়। কারণ বাংলার মুসলমান সমাজে কয়েকটি বিশিষ্ট শ্রেণীর উদ্ভব হইয়াছিল। ইহাদের মধ্যে সৈয়দ (অর্থাৎ যাঁহারা হজরৎ মুহম্মদের বংশধর বলিয়া দাবি করেন), আলিম (পণ্ডিত ও শিক্ষাব্রতী), শেখ (পীর) ছিলেন উচ্চশ্রেণীভুক্ত এবং বিশেষ শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র। কাজীও উচ্চপদস্থ কর্মচারী এবং মোল্লারাও জনসাধারণ অপেক্ষা কিছু উচ্চস্তরের ছিল। ইহা ছাড়া তুর্কী, পাঠান, মোণল প্রভৃতিও বিভিন্ন শ্রেণী বলিয়া বিবেচিত হইত। কিন্তু এই শ্রেণীবিভাগ হিন্দুদের জাতিভেদের ন্যায় কঠোর ছিল না–ইহাদের মধ্যে পান ভোজনের বা স্পর্শদোষের বালাই ছিল না এবং বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিবাহাদিও একেবারে অপ্রচলিত ছিল না।
নিম্নশ্রেণীর মুসলমানের মধ্যেও বংশানুক্রমিক বৃত্তি অনুসারে অনেক শ্রেণী বিভাগ ছিল। কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে ইহাদের একটি সুদীর্ঘ তালিকা আছে। যথা গোলা, জোলা, মুকেরি [যাহারা বলদে করিয়া বিক্রেয় জিনিস নেয়], পিঠারি, কাবাড়ি [মৎস্য বিক্রেতা অথবা কসাই], সানাকার, হাজাম, তীরকর, কাগজী [যে কাগজ তৈরী করে], দরজি, বেনটা [যে বয়ন করে], রংরেজ [যে রং লাগায়], হালান ও কসাই।
