বাংলা দেশে বৌদ্ধ পাল রাজত্বের সময় অনেক বৌদ্ধ ছিল। সেন রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মের প্রাধান্য পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করেন; তাঁহার ফলে অনেক প্রাক্তন বৌদ্ধ সমাজের নিম্নস্তরে পতিত হয়। তাহারা মুসলমানদিগকে ত্রাণকর্ত্তা বলিয়াই মনে করিত। তাহাদের বিশ্বাস হইয়াছিল যে ব্রাহ্মণদের অত্যাচার বন্ধ করিবার জন্যই দেবতারা মুসলমানের মূর্ত্তিতে ভূতলে আসিয়াছেন। এ সম্বন্ধে “ধর্মপূজা বিধান” নামক গ্রন্থখানি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। ধর্মপূজা বাংলায় বৌদ্ধধর্ম্মের শেষ স্মৃতিচিহ্ন রক্ষা করিয়াছে এবং তান্ত্রিক ও ব্রাহ্মণ্য মতের সহিত সংমিশ্রিত হইয়া এখনও পশ্চিমবঙ্গে নিম্নশ্রেণীর মধ্যে প্রচলিত আছে। উল্লিখিত গ্রন্থে ‘নিরঞ্জনের রূস্মা’ নামে একটি কবিতা আছে। ব্রাহ্মণেরা ধর্মঠাকুরের ভক্তদের সহিত কিরূপ দুর্ব্যবহার করিত প্রথমে তাঁহার বর্ণনা আছে। দক্ষিণা না পাইলেই তাহারা শাপ দেয়–সদ্ধর্মীদের বিনাশ করে ব্রাহ্মণদের ভয়ে সকলেই কম্পমান ইত্যাদি। ইহাতে বিচলিত হইয়া ভক্তেরা ধর্মঠাকুরের নিকট প্রার্থনা করিল :
মনেতে পাইয়া মর্ম সভে বলে রাখ ধর্ম
তোমা বিনে কে করে পরিত্রাণ।
এইরূপে দ্বিজগণ করে সৃষ্টি সংহরণ
এ বড় হইল অবিচার।
ভক্তের প্রার্থনা শুনিয়া বৈকুণ্ঠে ধর্মঠাকুরের আসন টলিল :
বৈকুণ্ঠে থাকিয়া ধর্ম মনেতে পাইয়া মর্ম
মায়ারূপে হইল খনকার।
ধর্ম হইলা যবনরূপী শিরে নিল কাল টুপি
হাতে শোভে ত্রিকচ কামান।
যতেক দেবতাগণ সবে হয়ে একমন
আনন্দেতে পরিল ইজার।
বিষ্ণু হইল পয়গম্বর ব্রহ্মা হৈল পাকাম্বর (হজরৎ মহম্মদ)
আদম্ভ হইয়া শূলপাণি।
এইরূপে গণেশ হইলেন গাজী, কার্তিক–কাজী, চণ্ডিকা দেবী–হায়্যা বিবি, ও পদ্মাবতী–বিবি নূর হইলেন। এইভাবে দেবগণ মুসলমানের রূপ ধারণ করিয়া জাজপুরে প্রবেশ করিল এবং মন্দিরাদি ভাঙ্গিয়া অনর্থ সৃষ্টি করিল।
এই কবিতাটি কোন্ সময়ের রচনা তাহা জানা নাই। ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে সমাজের নিম্নশ্রেণীভুক্ত প্রাক্তন বৌদ্ধগণ মুসলমানদিগকেই হিন্দুর উপাস্য দেবতার স্থানে বসাইয়াছিল অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিল উক্ত কবিতায় তাহাই প্রতিধ্বনিত হইয়াছে।
প্রথম যুগের তুর্কী সেনাগণ ও ধর্ম্মান্তরিত নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদিগকে লইয়াই বাংলার মুসলমান সমাজ সর্বাগ্রে গঠিত হয়। কিন্তু ক্রমে ক্রমে বাহির হইতে উচ্চ শ্রেণীর মুসলমানও আসিয়া বাংলা দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মোঙ্গলরাজ চেঙ্গিস খাঁ সমগ্র মধ্য এশিয়ার তুর্কী মুসলমানদের রাজ্য এবং বোখারা, সমরখন্দ প্রভৃতি ইসলাম সংস্কৃতির প্রধান প্রধান কেন্দ্রগুলি ধ্বংস করেন। ইহার ফলে এই অঞ্চল হইতে গৃহহীন পলাতকেরা দলে দলে ভারতে তুর্কী মুসলমানদের রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। পরে তাহাদের অনেকে বাংলা দেশে বসতি স্থাপন করিল এবং বাংলার মুসলমান সুলতানগণ জ্ঞানী-গুণী মুসলমানদিগকে অর্থ ও সম্মান দিয়া নানা স্থানে প্রতিষ্ঠিত করিলেন। পরবর্তীকালে দিল্লিতে বিভিন্ন তুর্কী রাজবংশের উত্থান ও পতনের ফলে বিতাড়িত অনেক তুর্কী সম্ভ্রান্ত লোক বাংলায় আশ্রয় লইলেন। বাংলায় মুঘল রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হইলে অনেক সম্ভ্রান্ত মুসলমান রাজকর্মচারীরূপেও বাংলায় আসিতেন, ফলে বাংলার বাইরের ইসলাম সভ্যতার সহিত পরিচয় ঘনিষ্ঠ হইল। এইরূপে কালক্রমে বহু পণ্ডিত ও উচ্চশ্রেণীর মুসলমান বাংলায় আসিলেন এবং সংখ্যায় অল্প হইলেও ইঁহারা বাংলার মুসলমান সমাজে উচ্চতর শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রবর্তন করিলেন। আরবী ও ফার্সী সাহিত্যের উন্নতি হইল এবং ইসলাম ধর্ম্মেরও দ্রুত প্রসার হইতে লাগিল।
এই প্রসঙ্গে সুফী ও দরবেশ নামে পরিচিত একটি মুসলমান পীর বা ফকির সম্প্রদায়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; কারণ প্রধানতঃ ইহাদের চেষ্টায়ই বাঙালী মুসলমানদের উন্নত ধর্মভাব ও সংখ্যা বৃদ্ধি সম্ভব হইয়াছিল। সুফীগণ মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া হইতে উত্তর ভারতবর্ষের মধ্য দিয়া বাংলায় আগমন করেন। খ্রষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাংলার সর্বত্র-শহরে ও গ্রামে-সুফীরা দুর্গা প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। ইঁহারা ইসলামীয় ধর্মশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন এবং আধ্যাত্মিক সাধনায়ও উল্কর্ষ লাভ করিয়াছিলেন। প্রত্যেক সুফীরই বহু শিষ্য ছিল। ইঁহারা তাঁহাদিগকে ইসলামী শাস্ত্রে শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক উন্নতি বিষয়ে দীক্ষা দিতেন। এই। শিষ্যেরাও আবার বড় হইয়া দর্গা প্রতিষ্ঠা করিয়া নূতন নূতন শিষ্যকে শিক্ষা-দীক্ষা দিতেন। রাজা প্রজা সকলেই সুফীদিগকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করিতেন। সুফীর দর্গা ও কবর পবিত্র বলিয়া গণ্য হইত। এই সব দর্গায় শিক্ষা-দীক্ষা ব্যতীত দরিদ্রের অন্নদান ও চিকিৎসা প্রভৃতির ব্যবস্থা ছিল।
অ-মুসলমানকে ইসলাম ধর্ম্মে দীক্ষিত করা মুসলমান শাস্ত্রমতে পুণ্য কার্য বলিয়া বিবেচিত হইত। সুফীগণ এই বিষয়ে অতিশয় তৎপর ছিলেন। সুফীদের মধ্যে অনেক পণ্ডিত ও সাধু ছিলেন এবং ধর্মনীতি অনুসরণ করিয়া জীবনযাপন করিতেন। তাঁহাদের উপদেশে ও দৃষ্টান্তে অনেক হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিত। মুসলমান আক্রমণের অব্যবহিত পূর্বে বাংলায় তান্ত্রিক ধর্ম্মের খুব প্রভাব ছিল। সাধারণ লোকে বিশ্বাস করি যে তান্ত্রিক সাধু বা গুরুর বহুবিধ অলৌকিক ক্ষমতা আছে। সুতরাং তাহাদিগকে অত্যন্ত ভক্তি শ্রদ্ধা করিত এবং তাঁহাদের বাসস্থান তীর্থক্ষেত্র বলিয়া গণ্য হইত। মুসলমানেরা বাংলা জয় করিবার পর অনেক সুফী দরবেশ ও পীর এই সব তান্ত্রিক সাধুকে স্থানচ্যুত করিয়া তাহাদের বাসস্থানেই দর্গা প্রতিষ্ঠা করিতেন : ক্ৰমে পীরগণও অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন বলিয়া খ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন। লোকে মনে করিত পীরেরা ইচ্ছা করিলেই লোকের দুঃখ দুর্দশা মোচন করিতে পারেন, মৃত লোককে বাঁচাইতে পারেন আবার জীবন্ত মানুষকেও জাদুবলে মারিতে পারেন। একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে থাকিতে পারেন এবং লোকের ভবিষ্যৎ বলিয়া দিতে পারেন। ফলে তান্ত্রিক সাধুর শিষ্যেরাও অনেকে স্থান মাহাত্মে এবং এইসব অলৌকিক ক্ষমতার খ্যাতিতে আকৃষ্ট হইয়া পীরের দর্গায় আসিত ও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিত।
