কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে নূতন নগরপত্তনের যে বিস্তৃত বিবরণ আছে তাহা হইতে অনুমান করা যায় যে বড় বড় নগরে মুসলমানেরা একটি স্বতন্ত্র পাড়ায় বাস করিত। এই গ্রন্থের নিম্নলিখিত কয়েকটি পংক্তিতে ষোড়শ শতাব্দীতে মুসলমান সমাজের একটি মনোরম চিত্র পাওয়া যায় :
ফজর [প্রাতঃকাল] সময়ে উঠি বিছায়ে লোহিত পাটী
পাঁচ বেরি [পাঁচবার] করয়ে নমাজ
ছোলেমানী মালা করে জপে পীর পগম্বরে
পীরের মোকামে দেয় সঁজ ॥
দশ বিশ বেরাদরে বসিয়া বিচার করে
অনুদিন কেতাব কোরাণ।
কেহ বা বসিয়া হাটে পীরের শীরিণি বাঁটে
সাঁঝে বাজে দগড় [দামামা], নিশান ॥
বড়ই দানিসবন্দ [পণ্ডিত, ধার্মিক] না জানে কপট ছন্দ
প্রাণ গেলে রোজা নাহি ছাড়ি।
যার দেখে খালি মাথা তার সনে নাহি কথা
সারিয়া চেলার মারে বাড়ি ॥
ধরয়ে কম্বোজ বেশ মাথাতে না রাখে কেশ
বুক আচ্ছাদিয়া রাখে দাড়ি।
না ছাড়ে আপন পথে দশ রেখা টুপি মাথে
ইজার পরয়ে দৃঢ় দড়ি (করি?)।।
আপন টোপর নিয়া বসিলা গাঁয়ের মিয়া
ভুঞ্জিয়া [আহার করিয়া] কাপড়ে মোছে হাত।
ষোড়শ শতকের প্রথম পাদে পর্তুগীজ বারবোসা বাংলা দেশের প্রধান একটি বন্দরের সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের সম্বন্ধে লিখিয়াছেন, মুসলমানেরা পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা সাদা জোব্বা পরে–ইহার তলে লুঙ্গির মত কোমরে জড়ান কাপড় এবং উপরে কোমরে রেশমের কোমরবন্ধ হইতে রৌপ্যখচিত তরবারি ঝুলান থাকে। হাতে মণিমাণিক্যখচিত অনেকগুলি আংটি এবং মাথায় সূক্ষ্ম তুলার কাপড়ের টুপি। তাহারা খুব বিলাসী মেয়ে পুরুষ উভয়ই উৎকৃষ্ট খাদ্য ও মদ্যপানে অভ্যস্ত। প্রত্যেকের ৩/৪ বা ততোধিক স্ত্রী। তাহাদের পরণে মূল্যবান বস্ত্র ও অলঙ্কার কিন্তু তাহারা পর্দানসীন। নৃত্য গীত তাহাদের খুব প্রিয়। প্রত্যেকেরই অনেক ভৃত্য। সাধারণ লোকেরা খাটো কৃর্তা ও মাথায় পাগড়ী পরে। সকলেই জুতা ব্যবহার করে। ধনীদের জুতায় রেশম ও সোনার সুতার কাজ।
মুসলমানদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা সাধারণতঃ ফার্সী ভাষার সাহায্যেই হইত। অনেকে আরবী ভাষারও চর্চ্চা করিতেন। বিদ্যাশিক্ষার জন্য মক্তব ও মাদ্রাসা ছিল। অনেক সুলতান এইরূপ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করিতেন। সুফীদের দর্গাতেও শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। প্রাথমিক শিক্ষা বাংলা ভাষায় হইত। সাধারণতঃ বিদেশী ও স্বল্পসংখ্যক অভিজাত মুসলমান উর্দু ব্যবহার করিতেন তাছাড়া সকলেই বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলিত। মুসলমান সমাজে অবস্থাপন্ন লোকের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা সম্বন্ধে বিশেষ যত্ন নেওয়া হইত। মসজিদেও শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। সকলেই কোরাণ শরীফ পড়িত এবং অন্য এক বা একাধিক বিষয় শিখিত।
অনেক সময় অল্পবয়সেই ছেলেমেয়েদের বিবাহের সম্বন্ধ স্থির হইত কিন্তু বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে বিবাহ হইত না। বর ঘোড়ায় চড়িয়া শোভাযাত্রা করিয়া কনের বাড়ীতে যাইত–সেখানে কাজীর সামনে মোল্লা বিবাহ দিতেন। ধনীর বাড়ীতে ভোজ নৃত্যগীতাদি একাধিক দিন চলিত। বিবাহ সম্বন্ধে হিন্দুর অনেক লৌকিক আচার অনুষ্ঠান মুসলমান সমাজেও প্রচলিত ছিল।
ধনী পুরুষেরা বহু বিবাহ করিত এবং বিবাহবন্ধন ছেদও খুবই হইত। ধনীলোকের স্ত্রীদের সঙ্গে বহু দাসদাসী আসিত। পর্দার ব্যবস্থা খুব কড়া ছিল এবং বড়লোকের হারেমে খোঁজা প্রহরী নিযুক্ত হইত। নর্তকীর নৃত্য ও সঙ্গীত মুসলমান সমাজে খুবই আদৃত হইত।
৩
স্মৃতিশাস্ত্র অনুমোদিত আদর্শ রক্ষণশীল হিন্দুধর্ম ও সমাজ
হিন্দু সংস্কৃতির দুইটি বিশেষত্ব আছে। প্রথমতঃ ইহা ধর্মকেন্দ্রিক-অর্থাৎ ধর্মকে কেন্দ্র করিয়াই ইহার সাহিত্য সমাজ শিল্প প্রভৃতি গড়িয়া উঠিয়াছে। দ্বিতীয়তঃ প্রাচীন যুগের সহিত যোগসূত্র রক্ষা। অর্থাৎ অতীতে যাহা ছিল তাহা সহসা বা সরাসরি অস্বীকার না করিয়া যথাসম্ভব তাঁহার সহিত অন্ততঃ বাহ্যিক একটি সামঞ্জস্য রক্ষার চেষ্টা। অল্পবিস্তর পরিবর্তন প্রতি সমাজেই যুগে যুগে ঘটে–উহা সমর্থনের জন্য শাস্ত্রবচন অগ্রাহ্য না করিয়া তাঁহার টীকা টিপ্পনী–অনেক সময় অসঙ্গত ব্যাখ্যাদ্বারা তাঁহার এরূপ অর্থ করা হইত যাহাতে পরিবর্তিত লোকমতের বা লৌকিক আচরণের সহিত সঙ্গতি রক্ষা হইতে পারে। এই জন্যই গুরুতর পরিবর্তন ঘটিলেও হিন্দুরা প্রাচীন স্মৃতির মর্যাদা রক্ষা করিয়া চলিয়াছে-অথচ সঙ্গে সঙ্গে নূতন নূতন টীকা রচনা করিয়া কালের অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনের সঙ্গে প্রাচীন শাস্ত্রের প্রতি বিশ্বাসের অভাব ঘটিতে দেয় নাই। সুতরাং মধ্যযুগে মনু, যাজ্ঞবল্ক্য প্রভৃতি প্রামাণিক স্মৃগ্রিন্থের নূতন নূতন টীকা হইয়াছে এবং স্মার্ত পণ্ডিতগণ নূতন নূতন নিবন্ধ লিখিয়া প্রতি অঞ্চলে যে সব নূতন প্রথা প্রচলিত হইয়াছে তাঁহার সহিত শাস্ত্রের সঙ্গতি রক্ষা করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। ফলে একই স্মৃতির বিভিন্ন ব্যাখ্যা অথবা বিভিন্ন প্রদেশে বা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন স্মৃতির নিবন্ধ প্রামাণিক বলিয়া গৃহীত হইয়াছে। বাংলা দেশেও মধ্যযুগে, শূলপাণি, রঘুনন্দন প্রভৃতি স্মার্ট পণ্ডিতগণ এই শ্রেণীর গ্রন্থ লিখিয়াছেন। সুতরাং বাংলার ধর্ম ও সমাজ মধ্যযুগে কি আদর্শে পরিচালিত হইত এই সমুদয় সংস্কৃত গ্রন্থ হইতে তাহা জানিতে পারা যায়। দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের কয়েকজন বিখ্যাত নিবন্ধকারের জীবনকাল অদ্যাপি নিশ্চিতরূপে নির্ধারিত হয় নাই; তথাপি অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে ১২০০ খ্রীষ্টাব্দ এবং উহার কিঞ্চিত পূর্ব বা পর হইতে যে সকল স্মৃতি ও অন্যান্য শাস্ত্রগ্রন্থ রচিত হইয়াছিল, ঐগুলি অবলম্বন করিয়া এবং সংশ্লিষ্ট অপরাপর বিষয়ক সংস্কৃত গ্রন্থাবলীর সাহায্যে মধ্যযুগে বঙ্গদেশের আদর্শ রক্ষণশীল সমাজের চিত্র অঙ্কন করিতেছি। স্মৃতি ও নিবন্ধ ভিন্ন বঙ্গদেশে রচিত বলিয়া অনুমিত বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ [বাংলা দেশের ইতিহাস–প্রথম ভাগ-৩য় সংস্করণ, ১৭৬ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য] কৃষ্ণানন্দের তন্ত্রসার, প্রভৃতি গ্রন্থেও কিছু সামাজিক তথ্য আছে।
