মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুর অত্যাচারে দক্ষিণবঙ্গের সমুদ্র উপকূলের অধিবাসীরা সর্বদা সন্ত্রস্ত থাকিত। ইহারা নগর ও জনপদ লুঠপাট করিত ও আগুন লাগাইয়া ধ্বংস করিত, স্ত্রীলোকদের উপর বহু অত্যাচার করিত এবং শিশু, যুবক, বৃদ্ধ নর নারীকে হরণ পূর্বক পশুর মত নৌকার খোলে বোঝাই করিয়া লইয়া দাসরূপে বিক্রয় করিত। ১৬২১ হইতে ১৬২৪ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে পর্তুগীজরা ৪২,০০০ দাস বাংলার নানা স্থান হইতে ধরিয়া চট্টগ্রামে আনিয়াছিল। অনেক দাস পর্তুগীজেরা গৃহকার্যে নিযুক্ত করিত।
স্থলপথে অভিযানের সময়ও সৈন্যরা গ্রাম লুঠপাট করিয়া বহু নর-নারীকে বন্দী করিয়া দাসরূপে বিক্রয় করিত। শান্তির সময়েও সাধারণ লোককে কর্মচারীদের হুকুমে বেগার (অর্থাৎ বিনা পারিশ্রমিকে) খাঁটিতে হইত। মোটের উপর মধ্যযুগে সাধারণ লোকের অবস্থা খুব ভাল ছিল এরূপ মনে করিবার কারণ নাই। তবে ভাতকাপড়ের দুঃখ হয়ত বর্তমান যুগের অপেক্ষা কম ছিল।
১৩. ধর্ম ও সমাজ
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ – ধর্ম ও সমাজ
১
হিন্দু ও মুসলমান
বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের ধর্ম এবং সমাজের মধ্যে একটি গুরুতর প্রভেদ আছে। প্রাচীন যুগে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায় থাকিলেও মূলতঃ ইহারা একই ধর্ম হইতে উদ্ভূত এবং ইহাদের মধ্যে প্রভেদ ক্রমশঃ অনেকটা ঘুচিয়া আসিতেছিল। প্রাচীন যুগের শেষে বৌদ্ধধর্ম্মের পৃথক সত্তা ছিল না বলিলেই হয়। জৈন ধর্ম্মের প্রভাবও প্রায় বিলুপ্ত হইয়াছিল। সুতরাং মুসলমানেরা যখন এদেশে আসিয়া বসবাস করিল তখন হিন্দু এই একটি সাধারণ নামেই তাহারা এখানকার জাতি ধর্ম ও সমাজকে অভিহিত করিল। মুসলমানের ধর্ম ও সমাজ সমস্ত মৌলিক বিষয়েই এত স্বতন্ত্র ছিল যে তাহারা কোন দিনই হিন্দুর সঙ্গে মিশিয়া যাইতে পারে নাই। মুসলমানদের পূর্বে গ্রীক, শক, পুতুব, কুষাণ, হুণ প্রভৃতি বিদেশী জাতি ভারতের অল্প বা অনেক অংশ জয় করিয়া সেখানেই স্থায়িভাবে বসবাস করিয়াছে এবং ক্রমে বিরাট হিন্দু সমাজের মধ্যে এমন ভাবে মিশিয়া গিয়াছে যে আজ তাহাদের পৃথক সত্তার চিহ্নমাত্র বিদ্যমান নাই। কিন্তু মুসলমানেরা মধ্যযুগের আরম্ভ হইতে শেষ পর্যন্ত স্থল-বিশেষে ১৩০০ হইতে ৭০০ বৎসর হিন্দুর সঙ্গে পাশাপাশি বাস করিয়াও ঠিক পূর্বের মতই স্বতন্ত্র আছে। ইহার কারণ এই যে, এই দুই সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস ও সমাজ-বিধান সম্পূর্ণ বিপরীত। মন্দিরে দেবতার মূর্ত্তি প্রতিষ্ঠিত করিয়া নানা উপচারে তাঁহার পূজা করা হিন্দুদিগের ধর্ম্মের প্রধান অঙ্গ। কিন্তু মুসলমান ধর্মশাস্ত্রে দেবমূর্ত্তি পূজা যে কেবল অবৈধ তাহা নহে, মন্দির ও দেবমূর্ত্তি ধ্বংস করা অত্যন্ত পুণ্যের কার্য বলিয়া গণ্য হয়। আবার হিন্দুশাস্ত্রমতে মুসলমানেরা ম্লেচ্ছ ও অপবিত্র, তাহাদের সহিত বিবাহ, একত্রে পানভোজন প্রভৃতি সামাজিক সম্বন্ধ তো দূরের কথা তাহাদের স্পর্শও দূষিত বলিয়া গণ্য করা হয় তাহাদের সৃষ্ট অন্নজল গ্রহণ করিলে হিন্দু ধর্ম্মে পতিত ও জাতিচ্যুত হয়। গোমাংস ভক্ষণ, বিধবা-বিবাহ প্রভৃতি যে সমুদয় আচার ব্যবহার হিন্দুর দৃষ্টিতে অতিশয় গর্হিত, মুসলমান সমাজে তাহা সর্বজন স্বীকৃত। এইরূপ অশন বসন ভোজন ও জীবনযাপন প্রণালী সম্পূর্ণ ভিন্ন। হিন্দুরা বাংলা সাহিত্যের প্রেরণা পায় সংস্কৃত হইতে, মুসলমানেরা পায় আরবী ফরাসী হইতে। বিবাহাদির ও উত্তরাধিকারের আইন মুসলমান পণ্ডিত আবিরূণী (১০৩০ খ্রীষ্টাব্দ) বলিয়াছিলেন যে ‘হিন্দুরা যাহা বিশ্বাস করে আমরা তাহা করি না। আমরা যাহা বিশ্বাস করি হিন্দুরা তাহা করে না। নয় শত বৎসর পরে যে মুসলমানেরা পাকিস্তানের দাবি করিয়াছিল তাহারাও এই কথাই বলিয়াছিল। তাহারা পূর্ব্বোক্ত ও অন্যান্য প্রভেদের বিষয় সবিস্তারে উল্লেখ করিয়া তাহাদের উক্তির সমর্থন করিত। অষ্টম শতাব্দের আরম্ভে মুসলমানেরা যখন সিন্ধুদেশ জয় করিয়া ভারতে প্রথম বসতি স্থাপন করে তখনও হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে যে মৌলিক প্রভেদগুলি ছিল সহস্র বৎসর পরেও এক ভাষার পার্থক্য ছাড়া আর সমস্তই ঠিক সেইরূপই ছিল। হিন্দুর সর্বপ্রকার রাজনীতির অধিকার লোপ এবং এই ধর্ম ও সমাজগত প্রভেদ ও পার্থক্যই মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসের সর্বপ্রধান দুইটি ঘটনা। রাজনৈতিক ইতিহাসে কেবল মুসলমান রাজাদের সম্বন্ধেই আলোচনা করা হইয়াছে কারণ মুসলমানেরাই ছিল রাজপদের অধিকারী হিন্দুরা ছিল তাহাদের দাস মাত্র। কোন হিন্দুর পক্ষে রাজপদ অধিকার করা যে কত অসম্ভব ছিল রাজা গণেশের কাহিনীই তাঁহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কিন্তু গুরুতর প্রভেদ সত্ত্বেও হিন্দু ও মুসলমান উভয়েরই বিধিবদ্ধ ধর্ম ও সমাজ ছিল–সুতরাং পৃথকভাবে এই দুইয়ের আলোচনা করিতে হইবে।
২
মুসলমান ধর্ম ও সমাজ
মুসলমান ধর্ম ইসলাম নামে পরিচিত এবং ইহার মূলনীতিগুলি কোরাণ প্রভৃতি কয়েকখানি ধর্মশাস্ত্রের অনুশাসন দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। সুতরাং পৃথিবীর সর্বত্রই মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসে ও ধর্ম্মাচরণে সাধারণভাবে একটি মূলগত ঐক্য দেখা যায়। বাংলা দেশেও এই নিয়মের ব্যত্যয় হয় নাই।
যে সকল তুর্কী সৈন্য প্রথমে বাংলা দেশ জয় করিয়া এখানে বসবাস করিতে আরম্ভ করে তাহারা শিক্ষা ও সংস্কৃতির দিক দিয়া খুব নিম্নস্তরেই ছিল। অনেক নিম্নশ্রেণীর হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়া বাংলায় মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি করিয়াছিল। হিন্দু সমাজে নিম্নশ্রেণীর লোকেরা নানা অসুবিধা ও অপমান সহ্য করিত। কিন্তু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিলে যোগ্যতা অনুসারে রাজ্য ও সমাজে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করার পক্ষেও তাহাদের কোন বাধা ছিল না। বখতিয়ার খিলজীর একজন মেচজাতীয় অনুচর গৌড়ের সম্রাট হইয়াছিলেন। এই সকল দৃষ্টান্তে উৎসাহিত হইয়া যে দলে দলে নিম্নশ্রেণীর হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিত ইহাতে আশ্চর্য বোধ করিবার কিছু নাই। অপর পক্ষে হিন্দুর উপর নানাবিধ অত্যাচার হইত। তাহাদিগকে জিজিয়া কর দিতে হইত, উচ্চপদে নিয়োগের কোন আশা তাহাদের ছিল না এবং রাজনৈতিক সকল অধিকার হইতেও তাহারা বঞ্চিত ছিল। এই সব কারণে হিন্দুদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রলোভন খুবই বেশি ছিল। ষোড়শ শতাব্দের প্রারম্ভে পর্তুগীজ পর্যটক দুয়ার্তে বারবোসা বাংলা দেশ সম্বন্ধে লিখিয়াছেন যে রাজ-অনুগ্রহ পাইবার জন্য প্রতিদিন হিন্দুরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। আবার, জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে মুসলমানদের সৃষ্ট পানীয় গ্রহণ ও দ্রব্য ভোজন এমন কি নিষিদ্ধ ভোজ্যের গন্ধ নাকে আসিলেও হিন্দুর জাতিচ্যুতি হইত। মুসলমান কোন হিন্দু নারীর অঙ্গ স্পর্শ করিলে সে স্বয়ং এবং কোন কোন স্থলে তাঁহার পরিবার ও আত্মীয়স্বজন জাতি ও ধর্ম্মে পতিত বলিয়া গণ্য হইত। এই সমুদয় হিন্দুর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। অনেক সময় জোর করিয়া হিন্দুকে মুসলমান করা হইত। আবার কোন কোন সময়ে কেহ কেহ স্বেচ্ছায় ফকীর ও দরবেশদের প্রভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিত। এই সকল কারণে বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা অনেক বাড়িয়া গেল। কিন্তু তাহাদের অধিকাংশই যে ধর্ম্মান্তরিত নিম্নশ্রেণীর হিন্দু সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।
