ইবন বতুতা আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্গত টেঞ্জিয়ারের অধিবাসী। তিনি আফ্রিকার উত্তর উপকূল ও এশিয়ায় আরব দেশ হইতে ভারতবর্ষ ও ইন্দোনেশিয়া হইয়া চীন দেশ পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছেন যে সারা পৃথিবীতে বাংলা দেশের মত কোথাও জিনিসপত্রের দাম এত সস্তা নহে।
সপ্তদশ খ্রীষ্টাব্দে বার্ণিয়ার লিখিয়াছেন যে সাধারণ বাঙালীর খাদ্য চাউল, ঘূত ও তিনচারি প্রকার শাকসবজী–নামমাত্র মূল্যে পাওয়া যাইত। এক টাকায় কুড়িটা বা তাঁহার বেশি ভাল মুরগী পাওয়া যাইত। হাঁসও এইরূপ সস্তা ছিল। ভেড়া এবং ছাগলও প্রচুর পাওয়া যাইত। শূকরের মাংস এত সস্তা ছিল যে এদেশবাসী পর্তুগীজরা কেবল তাহা খাইয়াই জীবন ধারণ করিত। নানারকম মাছও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাইত।
ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে ‘দুর্বলার বেসাতি’ বর্ণনায়ও দ্রব্যের মূল্য এইরূপ সস্তা দেখা যায়। রাজধানী মুর্শিদাবাদে ১৭২৯ খ্রীষ্টাব্দে খাদ্যদ্রব্যের মুল্য এইরূপ ছিল।”[ K.K. Datta. op. cit. 463-54]
প্রতি টাকায় খুব ভাল চাউল (বাঁশফুল) প্রথম শ্রেণী ১ মণ ১০ সের
প্রতি টাকায় খুব ভাল চাউল (বাঁশফুল) দ্বিতীয় শ্রেণী ১ মণ ২৩ সের
প্রতি টাকায় খুব ভাল চাউল (বাঁশফুল) তৃতীয় শ্রেণী ১ মণ ৩৫ সের
প্রতি টাকায় মোটা (দেশনা ও পূরবী) চাউল ৪ মণ ২৫ সের
প্রতি টাকায় মোটা (মুশসারা) ৫ মণ ২৫ সের
প্রতি টাকায় মোটা (কুরাশালী) ৭ মণ ২০ সের
প্রতি টাকায় উৎকৃষ্ট গম প্রথম শ্রেণী ৩ মণ
প্রতি টাকায় উৎকৃষ্ট গম দ্বিতীয় শ্রেণী ৩ মণ ৩০ সের
প্রতি টাকায় তৈল প্রথম শ্রেণী ২১ সের
প্রতি টাকায় তৈল দ্বিতীয় শ্রেণী ২৪ সের
প্রতি টাকায় ঘৃত প্রথম শ্রেণী ১০।।০ সের
প্রতি টাকায় ঘৃত দ্বিতীয় শ্রেণী ১১+১/৪ সের
কাপাস (তুলা) প্রতি মণ ২।।০ টাকা
মধ্যযুগের শেষভাগে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে সরকারী কাগজপত্রে বাংলা দেশকে বলা হইত ভারতের স্বর্গ। ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধি, প্রাকৃতিক শোভা, কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যসম্ভার, জীবনযাত্রার সচ্ছলতা প্রভৃতির কথা মনে করিলে এই খ্যাতির সার্থকতা সহজেই বুঝা যায়।
দেশে ঐশ্বর্যশালী ধনীর পাশাপাশি দারিদ্রের চিত্রও সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে ফুটিয়া উঠিয়াছে। কারণ দ্রব্যাদির মূল্য খুব সস্তা হইলেও সাধারণ কৃষক ও প্রজাগণের দুঃখ ও দুর্দশার অবধি ছিল না। ইহার অনেকগুলি কারণ ছিল; তাহাদের মধ্যে অন্যতম রাজকর্মচারীদের অযথা অত্যাচার ও উৎপীড়ন। কবিকঙ্কণ চণ্ডীর গ্রন্থকার মুকুন্দরাম চক্রবর্তী দামিন্যায় ছয় সাত পুরুষ যাবৎ বাস করিতেছিলেন–কৃষিদ্বারা জীবন যাপন করিতেন। ডিহিদার মামুদের অত্যাচারে যখন তিনি পৈতৃক ভিটা ছাড়িয়া অন্যত্র যাইতে বাধ্য হইলের তখন তিন দিন ভিক্ষান্নে জীবন ধারণের পর এমন অবস্থা হইল যে–
তৈল বিনা কৈল স্নান করিলুঁ উদক পান,
শিশু কাঁদে ওদনের তরে
ক্ষেমানন্দ কেতকদাসেরও এইরূপ দুরবস্থা হইয়াছিল। কবিকঙ্কণ-চণ্ডীতে সতীনের কোপে খুল্লনার কষ্ট ও ফুল্লরার বার মাসের দুঃখ বর্ণনায় এই দারিদ্র-দুঃখ প্রতিধ্বনিত হইয়াছে। [কবিকঙ্কণ চণ্ডী, প্রথম ভাগ ২৫৭ পৃ.] দ্বিজ হরিরামের চণ্ডীকাব্যেও খুল্লনার দুঃখ বর্ণিত হইয়াছে। শাসনকর্ত্তার অত্যাচারে সচ্ছল গৃহস্থের কিরূপ দুরবস্থা হইত মাণিকচন্দ্র রাজার গানে তাঁহার বর্ণনা পাই।
ভাটি হইতে আইল বাঙ্গাল লম্বা লম্বা দাড়ি।
সেই বাঙ্গাল আসিয়া মুলুকৎ কৈল্প কড়ি ॥
আছিল দেড় ঝুড়ি খাজনা লইল পনর গণ্ডা।
লাঙ্গল বেচায় জোয়াল বেচায়, আরো বেচায় ফাল।
খাজনার তাপতে বেচায় দুধের ছাওয়াল ॥
রাঢ়ী কাঙ্গাল দুঃখীর বড় দুঃখ হইল।
খানে খানে তালুক সব ছন হৈয়া গেল ॥
কিন্তু সুশাসনে প্রজারা চাষবাস করিয়াও, কিরূপ সুখে স্বচ্ছন্দে জীবন যাপন করিত তাঁহারও উজ্জ্বল অতিরঞ্জিত বর্ণনা ময়নামতীর গানে আছে :
সেই যে রাজার রাইঅত প্রজা দুষখু নাহি পাএ।
কারও মারুলি (পথ) দিয়া কেহ নাহি যায় ॥
কারও পুষ্করিণীর জল কেহ নাহি খাএ।
আথাইলের ধন কড়ি পাথাইলে শুকায়।
সোনার ভেটা দিয়া রাইঅতের ছাওরাল খেলায়।।
[২-৪ পংক্তির অর্থ এই যে প্রত্যেকেরই নিজের নিজের পথঘাট পুকুর আছে–মূল্যবান দ্রব্য যেখানে সেখানে ফেলিয়া রাখে চোরের ভয় নাই। বঙ্গ সাহিত্য পরিচয় পৃ. ৩৩৫]
বিদেশী পর্যটক মানরিক লিখিয়াছেন যে খাজনার টাকা না দিতে পারিলে হিন্দুদের স্ত্রী ও সন্তানদের নিলামে বিক্রয় করা হইত। কর্মচারীরা কৃষকদের নারী ধর্ষণ করিত এবং পিয়াদারা নানা প্রকার উৎপীড়ন করিত। ইহার কোন প্রতিকার ছিল না। অথচ ইহারাই ছিল শতকরা নব্বই জন।
লোকদের দুর্দশার আর একটি কারণ ছিল যুদ্ধের সময় সৈন্যদের লুঠপাট। দুই পক্ষের সৈন্যেরাই লুঠপাট, নারীধর্ষণ প্রভৃতিতে এত অভ্যস্ত ছিল যে, সৈন্যের আগমনবার্তা শুনিলেই রাস্তায় দুই পার্শ্বের গ্রাম ছাড়িয়া লোকে দূরে পলাইয়া যাইত। যুদ্ধের বিরতির পরেও বিজয়ী সৈন্যেরা লুঠপাট করিত। প্রতাপাদিত্যের আত্মসমর্পণের পর বিজয়ী মুঘল সেনানায়ক একদিন উদয়াদিত্যকে বলিলেন “মীর্জা মক্কী তোমাদের দেশ লুঠ করিতেছে আর তোমরা তাহাকে থলে ভর্তি সোনা দিতেছ। আমি চুপ করিয়া আছি বলিয়া আমাকে একটা আম কাঁঠালও পাঠাও না। আচ্ছা, কাল ইহার শোধ নিব।” সেনানায়কের আজ্ঞায় রাত্রি দ্বিপ্রহরে জল ও স্থলের সৈন্য ঘোড়ায় চড়িয়া রাজধানী যশোহর যাত্রা করিল এবং এমন ভাবে লুঠপাট করিল যে পূর্বের কোন অভিযানে আর সেরূপ হয় নাই। উক্ত সেনানায়ক নিজেই ইহা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন।
