সমসাময়িক বৈদেশিক বিবরণ হইতে জানা যায় যে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের বণিকেরা বাংলায় বাণিজ্য করিতে আসিত। ইহাদের মধ্যে কাশ্মীরী, মুলতানী, আফগান বা পাঠান, শেখ, পগেয়া, ভুটিয়া ও সন্ন্যাসীদের বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায়। পগেয়া সম্ভবতঃ পাগড়ীওয়ালা হিন্দুস্থানীদের নাম এবং কলিকাতা বড়বাজারের পগেয়াপটি সম্ভবতঃ তাহাদের স্মৃতি বজায় রাখিয়াছে। সন্ন্যাসীরা সম্ভবতঃ হিমালয় অঞ্চল হইতে চন্দন কাঠ, ভুর্জপত্র, রুদ্রাক্ষ ও লতাগুল্ম প্রভৃতি ভেষজ দ্রব্য আনিত। বর্ধমান সম্বন্ধে হলওয়েল লিখিয়াছেন যে দিল্লি ও আগ্রার পগেয়া ব্যাপারীরা প্রতি বৎসর এখান হইতে সীসক, তামা, টিন, লঙ্কা ও বস্ত্র প্রভৃতি প্রচুর পরিমাণে কিনিত এবং তাঁহার পরিবর্তে নগদ টাকা অথবা আফিম, সোরা অথবা অশ্ব বিনিময় করিত। কাশ্মীরী বণিকেরা আগাম টাকা দিয়া সুন্দরবনে লবণ তৈরী করাইত। কাশ্মীরী এবং আর্মেনিয়ান বণিকেরা বাংলা হইতে নেপালে ও তিব্বতে চর্ম, নীল, মণিমুক্তা, তামাক, চিনি, মালদহের সাটিন প্রভৃতি নানা রকমের বস্ত্র বিক্রয় করিত।
বাঙালী সদাগরেরাও ভারতের সর্বত্র বাণিজ্য করিত। ১৭৭২ খ্রীষ্টাব্দে রচিত জয়নারায়ণের হরিলীলা নামক বাংলা গ্রন্থে লিখিত আছে যে একজন বৈশ্য বণিক নিম্নলিখিত স্থানে বাণিজ্য করিতে যাইতেন : “হস্তিনাপুর, কর্ণাট, বঙ্গ, কলিঙ্গ, গুর্জর, বারাণসী, মহারাষ্ট্র, কাশ্মীর, পঞ্চাল, কামোজ, ভোজ, মগধ জয়স্তী, দ্রাবিড়, নেপাল, কাঞ্চী, অযোধ্যা, অবন্তী, মথুরা, কাস্পিল্য, মায়াপুরী, দ্বারাবতী, চীন, মহাচীন, কামরূপ।” চন্দ্রকান্ত নামে প্রায় সমসাময়িক আর একখানি বাংলা গ্রন্থে লিখিত আছে যে চন্দ্রকান্ত নামে মল্লভূমি নিবাসী একজন গন্ধবণিক সাতখানি তরী বাণিজ্যদ্রব্যে বোঝাই করিয়া গুজরাটে গিয়াছিলেন।
ব্যবসা-বাণিজ্যের খুব প্রচলন থাকিলেও, বাংলায় কৃষিই ছিল জনসাধারণের উপজীব্য। প্রাচীন একখানি পুঁথিতে আছে যে আত্মমর্যাদাজ্ঞানসম্পন্ন লোকের পক্ষে কৃষিই প্রশস্ত। কারণ বাণিজ্য করিতে মূলধনের প্রয়োজন এবং অনেক জাল প্রতারণা করিতে হয়। চাকুরীতে আত্মসম্মান থাকে না এবং ভিক্ষাবৃত্তিতে অর্থ লাভ হয় না। নানাবিধ শস্য, ফল, শাক-সব্জীর চাষ হইত-এবং এ বিষয়ে বাঙালীর ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা বহু পরিমাণে ছিল। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ হইয়াও চাষ দ্বারা জীবিকা অর্জন করিতেন। বাংলার অতুলনীয় কৃষিসম্পদের কথা সমসাময়িক সাহিত্যে ও বিদেশীয় পর্যটকগণের ভ্রমণবৃত্তান্তে উল্লিখিত হইয়াছে। একজন চীনা পর্যটক লিখিয়াছেন যে বাংলা দেশে বছরে তিনবার ফসল হয়–লোকেরা খুব পরিশ্রমী; বহু আয়াস সহকারে তাহারা জঙ্গল কাটিয়া জমি চাষের উপযোগী করিয়াছে। সরকারী রাজস্ব মাত্র উৎপন্ন শস্যের এক-পঞ্চমাংশ।
মধ্যযুগে বাংলার ঐশ্বর্য ও সম্পদ প্রবাদবাক্যে পরিণত হইয়াছিল। বাংলা সাহিত্যে ধনী নাগরিকদের বর্ণনায় বিস্তৃত প্রাসাদ, মণিমুক্তাখচিত বসনভূষণ, এবং স্বর্ণ, রৌপ্য ও মূল্যবান রত্নের ছড়াছড়ি। বৈদেশিক বর্ণনায়ও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। পঞ্চদশ শতকে চীনা রাজদূতেরা বাংলায় আসিয়াছিলেন। তাহাদের বিবরণ হইতে এদেশের সম্পদের পরিচয় পাওয়া যায়। ভোজনাস্তে চীনা রাজদূতকে সোনার বাটি, পিকদানি, সুরাপাত্র ও কোমরবন্ধ এবং তাঁহার সহকারীদের ঐ সকল রৌপ্যের দ্রব্য, কর্মচারীদিগকে সোনার ঘণ্টা ও সৈন্যগণকে রূপার মুদ্রা উপহার দেওয়া হয়। এদেশে কৃষিজাত সম্পদের প্রাচুর্য ছিল এবং ব্যবসায় বাণিজ্যে বহু ধনাগম হইত। পোশাক-পরিচ্ছদ ও মণিমুক্তাখচিত অলঙ্কারেই এই ঐশ্বর্যের পরিচয় পাইয়া চীনাদূতেরা বিস্মিত হইয়াছিলেন।
‘তারিখ-ই-ফিরিশতা’ ও ‘রিয়াজ-উস সলাতীনে’ উক্ত হইয়াছে যে প্রাচীন যুগ হইতে গৌড় ও পূর্ববঙ্গে ধনী লোকেরা সোনার থালায় খাইত। আলাউদ্দীন হোসেন শাহ (ষোড়শ শতক) গৌড়ের লুণ্ঠনকারীদের বধ করিয়া ১৩০০ সোনার থালা ও বহু ধনরত্ন পাইয়াছিলেন। ফিরিশতা সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে এই ঘটনার উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন যে ঐ যুগে যাহার বাড়িতে যত বেশি সোনার বাসনপত্র থাকিত সে তত বেশি মর্যাদার অধিকারী হইত এবং এখন পর্যন্তও বাংলা দেশে এইরূপ গর্বের প্রচলন আছে।
এই ঐশ্বর্যের প্রধান কারণ বঙ্গদেশের উর্বরাভূমির প্রাকৃতির শস্যসম্পদ এবং বাঙালীর বাণিজ্য বৃত্তি। সপ্তগ্রামে বহু লক্ষপতি বণিকেরা বাস করিতেন। চৈতন্য চরিতামৃতে আছে :
হিরণ্য-গোবর্ধন নাম দুই সহোদর।
সপ্তগ্রামে বার লক্ষ মুদ্রার ঈশ্বর ॥
যে যুগে টাকায় ৫/৬ মণ চাউল পাওয়া যাইত সে যুগে বার লক্ষ টাকার মূল্য কত সহজেই বুঝা যাইবে। কবিকঙ্কণের সমসাময়িক বিদেশী পর্যটক সিজার ফ্রেডারিক সপ্তগ্রামের বাণিজ্য ও ঐশ্বর্যের বিবরণ দিয়াছেন। প্রতি বৎসর এখানে ৩০/৩৫ খানা বড় ও ছোট জাহাজ আসিত এবং মাল বোঝাই করিয়া ফিরিয়া যাইত।
মধ্যযুগে বাংলা দেশে খাদ্যদ্রব্য ও বস্ত্র খুব সস্তা ছিল। চতুর্দ্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইবন্ বতুতা বঙ্গদেশে আসিয়াছিলেন। তিনি তৎকালীন দ্রব্যমূল্যের নিম্নলিখিত তালিকা দিয়াছেন।
দ্রব্য পরিমাণ মূল্য বর্তমানের (নয়া) পয়সা
চাউল বর্তমানকালের একমণ ১২
ঘি বর্তমানকালের একমণ ১৪৫
চিনি বর্তমানকালের একমণ ১৪৫
তিল তৈল বর্তমানকালের একমণ ৭৩
উত্তম কাপড় ১৫ গজ ২০০
দুগ্ধবতী গাভী ১টি ৩০০
হৃষ্টপুষ্ট মুরগী ১২টি ২০
ভেড়া ১টি ২৫
এক বৃদ্ধ বাঙালী মুসলমান ইবন্ বতুতাকে বলিয়াছিলেন যে তিনি, তাঁহার স্ত্রী ও একটি ভূত্য–এই তিনজনের খাদ্যের জন্য বৎসরে এক টাকা ব্যয় হইত। (স্বর্ণমানের হিসাবে সাত টাকা)।
