ইউরোপীয় বণিক ও মগ জলদস্যুরা বন্দুক ব্যবহার করিত; কিন্তু বাঙালী বণিকেরা আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার জানিত না বলিয়াই তাহাদের সঙ্গে আঁটিয়া উঠিতে পারিত না। বংশীদাস লিখিয়াছেন–
মগ ফিরিঙ্গি যত বন্দুক পলিতা হাত
একেবারে দশগুলি ছোটে ॥
বাঙালী বণিকেরা কিরূপে দ্রব্য বিনিময়ে ব্যবসায় করিত, কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে তাঁহার কিছু আভাস পাওয়া যায়। ধনপতি সদাগর সিংহলের রাজাকে ইহার এইরূপ বিবরণ দিয়াছেন :
বদলাশে নানা ধন আন্যাছি সিংহলে।
যে দিলে যে হয় তাহা শুন কুতুহলে ॥
কুরঙ্গ বদলে তুরঙ্গ পাব নারিকেল বদলে শঙ্খ।
বিরঙ্গ বদলে লবঙ্গ দিবে সঁটের বদলে ডঙ্ক (টঙ্ক?)
পিড়ঙ্গ (প্লবঙ্গ?) বদলে মাতঙ্গ পাব পায়রার বদলে শুয়া।
গাছফল বদলে জায়ফল দিবে বয়ড়ার বদলে গুয়া ॥
সিন্দুর বদলে হিঙ্গুল দিবে গুঞ্জার বদলে পলা।
পাটশন বদলে ধবল চামর কাঁচের বদলে নীলা ॥
লবণ বদলে সৈন্ধব দিবে জোয়ানি বদলে জিরা।
আতঙ্গ (আকন্দ) বদলে মাতঙ্গ (মাকন্দ) দিবে হরিতাল বদলে হীরা ॥
চঞর বদলে চন্দন দিবে পাগের বদলে গড়া।
শুক্তার বদলে মুক্তা দিবে ভেড়ার বদলে ঘোড়া ॥
এই সুদীর্ঘ তালিকায় অনেক কাল্পনিক উক্তি আছে। কিন্তু এই সমুদয় বাণিজ্যের কাহিনী যে কবির কল্পনা মাত্র নহে, বাস্তব সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, বিদেশী ভ্রমণকারীদের বিবরণ তাহা সম্পূর্ণ সমর্থন করে। ষোড়শ শতকের প্রথমে (আনুমানিক ১৫১৪ খ্রীষ্টাব্দ) পর্তুগীজ পর্যটক বারবোসা বাংলা দেশের যে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিখিয়াছেন, তাঁহার সারমর্ম এই :
“এদেশে সমুদ্রতীরে ও দেশের অভ্যন্তরভাগে বহু নগরী আছে। ভিতরের নগরগুলিতে হিন্দুরা বাস করে। সমুদ্ৰীরের বন্দরগুলিতে হিন্দু মুসলমান দুইই আছে–ইহারা জাহাজে করিয়া বাণিজ্য দ্রব্য বহু দেশে পাঠায়। এই দেশের প্রধান বন্দরের নাম ‘বেঙ্গল’ (Bengal)। আরব, পারস্য, আবিসিনিয়া ও ভারতবাসী বহু বণিক এই নগরে বাস করে। এদেশের বড় বড় বণিকদের বড় বড় জাহাজ আছে এবং ইহা নানা দ্রব্যে বোঝাই করিয়া তাহারা করমণ্ডল উপকূল, মালাবার, ক্যাম্বে, পেশু, টেনাসেরিম, সুমাত্রা, লঙ্কা এবং মলাক্কায় যায়। এদেশে বহু পরিমাণ তুলা, ইক্ষু, উৎকৃষ্ট আদা ও মরিচ হয়। এখানে নানা রকমের সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরী হয় এবং আরবে ও পারস্যে ইহাদ্বারা এত অধিক পরিমাণে টুপি তৈরী করে যে প্রতি বৎসর অনেক জাহাজ বোঝাই করিয়া এই কাপড়ের চালান দেয়। ইহা ছাড়া আরও অনেক রকম কাপড় তৈরী হয়। মেয়েদের ওড়নার জন্য ‘সরবতী’ কাপড় খুব চড়া দামে বিক্রয় হয়। চরকায় সূতা কাটিয়া এই সকল কাপড় বোনা হয়। এই শহরে খুব উৎকৃষ্ট সাদা চিনি তৈরী হয় এবং অনেক জাহাজ বোঝাই করিয়া চালান হয়। মালাবার ও ক্যাম্বেতে চিনি ও মসলিন খুব চড়া দামে বিক্রয় হয়। এখানে আদা, কমলালেবু, বাতাবী লেবু এবং আরও অনেক ফল জন্মে। ঘোড়া, গরু, মেষ ও বড় বড় মুরগী প্রচুর আছে।”
বারবোসার সমসাময়িক ইতালীয় পর্যটক ভার্থেমাও (১৫০৫ খ্রীষ্টাব্দে) উক্ত বন্দরের বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইহার বিস্তৃত বাণিজ্যসম্ভার বিশেষতঃ সূতা ও রেশমের কাপড়ের উল্লেখ করিয়াছেন।
ভার্থেমা বলেন যে বাংলা দেশের মত ধনী বণিক আর কোন দেশে তিনি দেখেন নাই। আর একজন পর্তুগীজ, জাঁয়া দে’ বারোস (১৪৯৩-১৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে), লিখিয়াছেন যে, গৌড় নগরী বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। নয় মাইল দীর্ঘ এই শহরে প্রায় কুড়ি লক্ষ লোক বাস করিত এবং বাণিজ্য দ্রব্য সম্ভারের জন্য সর্বদাই রাস্তায় এত ভিড় থাকিত যে লোকের চলাচল খুবই কষ্টকর ছিল। সোনারগাঁও, হুগলি, চট্টগ্রাম ও সপ্তগ্রামেও বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল।
ষোড়শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সিজার ফ্রেডারিক (১৫৬৩ খ্রীষ্টাব্দ) সাতগাঁওকে (সপ্তগ্রাম) খুব সমৃদ্ধশালী বন্দর বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু তিনি ‘বেঙ্গল’ বন্দরের নাম করেন নাই। বিশ বৎসর পরে রালফ ফিচ সাতগাঁও ও চাটগাঁও এই দুই বন্দরের বর্ণনা দিয়াছেন এবং চাটগাঁও বা চট্টগ্রামকে প্রধান বন্দর (Porto Grande) বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু তিনিও ‘বেঙ্গল’ বন্দরের উল্লেখ করেন। নাই। হামিলটন (১৬৮৮-১৭২৩ খ্রীষ্টাব্দ) হুগলিকে একটি প্রসিদ্ধ বন্দর বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন কিন্তু সাতগাঁও-এর উল্লেখ করেন নাই। তিনি চিটাগাং বন্দরেরও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়াছেন, কিন্তু ‘বেঙ্গল’ বন্দরের নাম করেন নাই। ১৫৬১ খ্রীষ্টাব্দে অঙ্কিত একটি মানচিত্রে বেঙ্গল ও সাতগাঁ উভয় বন্দরেরই নাম আছে।
রালফ ফিচ আগ্রা হইতে নৌকা করিয়া যমুনা ও গঙ্গা নদী বাহিয়া বাংলায় আসেন। তাঁহার সঙ্গে আরও ১৮০ খানি নৌকা ছিল। হিন্দু ও মুসলমান বণিকেরা এই সব নৌকায় লবণ, আফিং, নীল, সীসক, গালিচা ও অন্যান্য দ্রব্য বোঝাই করিয়া বাংলা দেশে বিক্রয়ের জন্য যাইতেছিল। বাংলা দেশে তিনি প্রথমে টাণ্ডায় পৌঁছেন। এখানে তুলা ও কাপড়ের খুব ভাল ব্যবসা চলিত। এখান হইতে তিনি কোচবিহারে যান। সেখানে হিন্দু রাজা এবং অধিবাসীরাও হিন্দু অথবা বৌদ্ধ মুসলমান নহে। ফিচ হুগলিরও উল্লেখ করিয়াছেন–এখানে পর্তুগীজেরা বাস করিত। ইহার অল্প একটু দূরে দক্ষিণে অঞ্জেলি (Angeli) নামে এক বন্দর ছিল। এখানে প্রতিবৎসর নেগাপটম, সুমাত্রা, মলাক্কা এবং আরও অনেক স্থান হইতে বহু বাণিজ্য-জাহাজ আসিত।
