অন্যান্য কৃষিজাত দ্রব্যের মধ্যে গুড়, সুপারি, তামাক, তেল, আদা, পাট, মরিচ, ফল, তাড়ি ইত্যাদি ভারতের অন্যান্য প্রদেশে ও বাহিরে চালান যাইত। ১৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে প্রতি বৎসর ৫০,০০০ মণ চিনি রপ্তানী হইত। মাখনও বাংলা দেশ হইতে রপ্তানি হইত। বাংলার ব্যবসায় বাণিজ্যও যথেষ্ট উন্নতি লাভ করিয়াছিল। ইউরোপীয় বণিকের প্রতিযোগিতা, শাসকদের উৎপীড়ন ও রৌপ্য মুদ্রার অভাব ইত্যাদি বহু গুরুতর বাধা সত্ত্বেও বাংলার অনেক দ্রব্য ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশে ও ভারতের বাহিরে রপ্তানি হইত। পূর্ব্বোক্ত শিল্প ও কৃষিজাত দ্রব্য ছাড়াও বাংলা হইতে লবণ, গালা, আফিম, নানা প্রকার মসলা, ঔষধ এবং খোঁজা ও ক্রীতদাস জল ও স্থল পথে ভারতের নানা স্থানে এবং সমুদ্রের পথে এশিয়ার নানা দেশে বিশেষতঃ লঙ্কা দ্বীপ ও ব্রহ্মদেশে রপ্তানি হইত। সূক্ষ্ম মসলিন বাঁশের চোঙ্গায় ভরিয়া অন্যান্য দ্রব্যসহ সওদাগরেরা খোরাসান, পারস্য, তুরস্ক ও নিকটস্থ অন্যান্য দেশে রপ্তানি করিত। এতদ্ব্যতীত ম্যানিলা, চীন ও আফ্রিকার উপকূলের সহিতও বাঙালী বাণিজ্য করিত। বাঙালী সদাগরদের সমুদ্রপথে দূর বিদেশে বাণিজ্যযাত্রার কথা বৈদেশিক ভ্রমণকারীরা উল্লেখ করিয়াছেন এবং মধ্যযুগের বাংলা আখ্যানে ও সাহিত্যে তাঁহার বহু উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। বিজয়গুপ্ত ও বংশীদাসের মনসামঙ্গল এবং কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে বাঙালী সওদাগরেরা যে বহুসংখ্যক অতিবৃহৎ বাণিজ্যতরী লইয়া বঙ্গোপসাগরের পশ্চিম কূল ধরিয়া সিংহলে এবং পরে উত্তর দিকে আরবসাগরের পূর্ব কূল বাহিয়া নানা বন্দরে সওদা করিতে করিতে পাটনে (গুজরাট) পৌঁছিতেন তাঁহার বিশদ বিবরণ আছে।
বাঙালী বণিকেরা বঙ্গোপসাগর পার হইয়া ব্রহ্মদেশ, ইন্দোচীন ও ইন্দোনেশিয়াতে যাইত। চতুর্দ্দশ শতাব্দীতে ই বতুতা সোনারগাঁও হইতে চল্লিশ দিনে সুমাত্রায় গিয়াছিলেন। সুদূর সমুদ্রযাত্রার বর্ণনায় পথিমধ্যে কয়েকটি বন্দরের নাম পাওয়া যায়পুরী, কলিঙ্গপত্তন, চিল্কাচুলি (চিকাকোল), বানপুর, সেতুবন্ধরামেশ্বর, লঙ্কাপুরী, বিজয়নগর। ইহা ছাড়া অনেক দ্বীপের নামও আছে।
অনেক মঙ্গলকাব্যেরই নায়ক একজন সদাগর–যেমন, চাঁদ, ধনপতি ও তাঁহার পুত্র শ্রীমন্ত। ইহাদের বাণিজ্যযাত্রার বর্ণনা উপলক্ষে বাণিজ্য-তরীর বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়। চাঁদ সদাগরের ছিল চৌদ্দ ডিঙ্গা আর ধনপতির ছিল সাত ডিঙ্গা। প্রত্যেক নৌকারই এক একটি নাম ছিল। এই দুই বহরেরই প্রধান তরীর নাম ছিল মধুকর–সম্ভবতঃ সদাগর নিজে ইহাতে যাইতেন। নৌকাগুলি জলে ডোবান থাকিত, যাত্রার পূর্বে ডুবারুরা নৌকা উঠাইত। কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে ডিঙ্গা নির্মাণের বর্ণনায় [কবিকঙ্কণ চণ্ডী–দ্বিতীয় ভাগ ৭৩৯ পৃ.] বলা হইয়াছে, কোন কোন ডিঙ্গা দৈর্ঘ্যে শত গজ ও প্রস্থে বিশ গজ। এগুলির মধ্যে অত্যুক্তিও আছে, কারণ দ্বিজ বংশী দাসের মনসামঙ্গলে হাজার গজ দীর্ঘ নৌকারও উল্লেখ আছে। এই সব নৌকার সামনের দিকের গলুই নানারূপ জীবজন্তুর মুখের আকারে নির্মিত এবং বহু মূল্যবান প্রস্তর গজদন্ত ও স্বর্ণ রৌপ্য দ্বারা খচিত হইত। কাঁঠাল, পিয়াল, শাল, গাম্ভারী, তমাল প্রভৃতির কাঠে নৌকা তৈরী হইত। ভারতবর্ষে মধ্যযুগে যে বৃহৎ বৃহৎ বাণিজ্য-তরী নির্মিত হইত, ‘যুক্তি কল্পতরু’ নামক একখানি সংস্কৃত গ্রন্থে এবং বৈদেশিক পর্যটকগণের বিবরণে তাঁহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। পঞ্চদশ শতাব্দীতে নিকলো কন্টি লিখিয়াছেন যে ভারতে প্রস্তুত নৌকা ইউরোপের নৌকা অপেক্ষা বৃহত্তর এবং বেশী মজবুৎ। সপ্তদশ শতাব্দে ঢাকা নগরীর এক বিস্তৃত অংশে নৌবহর নির্মাণকারী সূত্রধরেরা বাস করিত। [Tavernier’s Travels in India. p. 103] সম্ভবতঃ বর্তমান ঢাকার সূত্রাপুর অঞ্চল তাঁহার স্মৃতি রক্ষা করিতেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও চট্টগ্রামে সমুদ্রগামী নৌবহর নির্মিত হইত। সুতরাং বাংলা সাহিত্যে ডিঙ্গীর বর্ণনা অতিরঞ্জিত হইলেও একেবারে কাল্পনিক বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া যায় না। নৌবহরের সঙ্গে যে সকল মাঝিমাল্লা প্রভৃতি যাইত মঙ্গলকাব্যে তাহাদের উল্লেখ আছে। প্রধান মাঝির নাম ছিল কড়ারী-কাণ্ডারী শব্দের অপভ্রংশ। সাবরগণ সারিগান গাহিয়া দাঁড় টানিত। সূত্রধর, ডুবারী ও কর্মকারেরা সঙ্গে থাকিত এবং প্রয়োজনমত নৌকা মেরামত করিত। ইহা ছাড়া একদল পাইক থাকিত-সম্ভবতঃ জলদস্যুদিগের আক্রমণ নিবারণের জন্য এই ব্যবস্থা ছিল।
সে যুগে ভারতে চুম্বক দিগদর্শন যন্ত্রের ব্যবহার প্রচলিত ছিল না। সুতরাং সূর্য ও তাঁহার সাহায্যে দিনির্ণয় করা হইত। বংশীদাসের মনসামঙ্গলে আছে :
অস্ত যায় যথা ভানু উদয় যথা হনে।
দুই তারা ডাইনে বামে রাখিল সন্ধানে ॥
তাঁহার দক্ষিণ মুখে ধরিল কাঁড়ার।
সেই তারা লক্ষ্য করি বাহিল নাওয়ার ॥
এই সমুদয় বর্ণনা সমুদ্রযাত্রার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পরিচায়ক।
কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে আছে :
ফিরিঙ্গির দেশখান বাহে কর্ণধারে।
রাত্রিতে বাহিয়া যায় হারমাদের ডরে ॥
হারমাদ পর্তুগীজ আবমাডা [Armada-রণতরী বহর] শব্দের অপভ্রংশ। পর্তুগীজ বণিকেরা যে বাঙালীর তথা ভারতীয়ের ব্যবসায়বাণিজ্যে বহু অনিষ্ট করিত তাঁহার প্রমাণ আছে। বস্তুতঃ পর্তুগীজ বণিকেরা ভারত মহাসাগরে ও বঙ্গোপসাগরে এদেশীয় বাণিজ্যজাহাজের উপর জলদস্যুর ন্যায় আচরণ করিত এবং তাঁহার ফলেই বাংলার জলপথের বাণিজ্য ক্রমশঃ হ্রাস পাইতে থাকে। আরাকান হইতে মগদের অত্যাচারে দক্ষিণ বঙ্গের সমুদ্রতীরবর্তী বিস্তৃত অঞ্চল ধ্বংস হইয়াছিল। পর্তুগীজরাও তাহাদের অনুকরণে নদীপথে ঢুকিয়া দক্ষিণ বঙ্গে বহু অত্যাচার করিত।
