বাংলা দেশ হইতে মুর্শিদকুলী খাঁর আমলে উদ্বৃত্ত রাজস্ব গড়ে এক কোটি টাকা প্রতি বৎসর বাদশাহের নিকট পাঠান হইত। শুজাউদ্দীন প্রতি বৎসর এক কোটি পঁচিশ লক্ষ টাকা পাঠাইতেন। তাঁহার ১২ বৎসর রাজত্বকালে মোট ১৪,৬২,৭৮,৫৩৮ টাকা দিল্লিতে প্রেরিত হয়। পূর্বেকার সুবাদারগণও এইরূপ রাজস্ব পাঠাইতেন এবং পদত্যাগ করিয়া যাইবার সময় সঞ্চিত বহু টাকা সঙ্গে লইয়া যাইতেন। শায়েস্তা খা বাইশ বৎসরে আটত্রিশ কোটি এবং আজিমুদ্দীন (আজিমুসসান) নয় বৎসরে আট কোটি টাকা সঞ্চয় করিয়াছিলেন এবং এই টাকাও বাংলা দেশ হইতে দিল্লিতে গিয়াছিল। অন্যান্য সুবাদার ও কর্মচারীরা কত টাকা বাংলা দেশ হইতে লইয়া গিয়াছিলেন তাহা সঠিক জানা যায় না। এই পরিমাণ রূপার টাকা গাড়ী বোঝাই হইয়া দিল্লিতে চলিয়া যাইত। এইরূপ শোষণের ফলে রৌপ্যমুদ্রার চলন অত্যন্ত কমিয়া যায় এবং দ্রব্যাদির মূল্য হ্রাসের ইহাই প্রধান কারণ। সাধারণ লোকে টাকা জমাইতে পারিত না; ফলে, তাহাদের মূলধনও ক্রমশ কমিতে লাগিল। সম্ভবত এই কারণেই বিনিময়ের জন্য কড়ির খুব প্রচলন ছিল। অবশ্য কড়ি ইহার পূর্ব হইতেই মুদ্রারূপে ব্যবহৃত হইত।
বাংলা দেশে নানাবিধ উৎকৃষ্ট শিল্প প্রচলিত ছিল। বস্ত্র শিল্প খুবই উন্নত ছিল এবং ইহা দ্বারা বহু লোক জীবিকা অর্জন করিত। বাংলার মসলিন জগদ্বিখ্যাত ছিল। এই সূক্ষ্ম শিল্পের প্রধান কেন্দ্র ছিল ঢাকা; এখান হইতে প্রচুর পরিমাণে মসলিন বিদেশে রপ্তানি হইত। ইরাক, আরব, ব্রহ্মদেশ, মক্কা ও সুমাত্রায় বাংলার কাপড় যাইত। ইউরোপে খুব সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্রের বিস্তর চাহিদা ছিল। ইহা এমন সূক্ষ্ম হইত যে ২০ গজ মসলিন নস্যের ডিবায় ভরিয়া নেওয়া যাইত। ইহার বয়ন কৌশল ইউরোপে বিস্ময়ের বিষয় হইয়া উঠিয়াছিল। মসলিন ছাড়া অন্যান্য উৎকৃষ্ট বস্ত্রও ঢাকায় তৈরী হইত। ইংরেজ কোম্পানীর চিঠিতে ঢাকায় তৈরী নিম্নলিখিত বস্ত্রসমূহের উল্লেখ আছে–সরবতী, মলমল, আলাবালি, তঞ্জীব, তেরিন্দাম, নয়নসুখ, শিরবান্ধানি (পাগড়ি), ডুরিয়া, জামদানী। [K.K. Datta, op. cit. p. 419 ff] অতি সূক্ষ্ম মসলিন হইতে গরীবের জন্য মোটা কাপড় সবই ঢাকায় তৈরী হইত। বাংলার বহুস্থানে বস্ত্র বয়নের প্রধান প্রধান কেন্দ্র ছিল।
মির্জা নাথান মালদহে ৪,০০০ টাকা দিয়া একখণ্ড বস্ত্র ক্রয় করেন। সে আমলে বাংলার উৎকৃষ্ট বস্ত্রসমূহের মূল্য ইহা হইতে ধারণা করা যাইবে। বাংলাদেশে বহু পরিমাণ রেশম ও রেশমের বস্ত্র প্রস্তুত হইত। নৌকা-নিৰ্মাণ আর একটি বড় শিল্প ছিল। ট্যাভার্নিয়ারের বিবরণ হইতে জানা যায় যে ঢাকায় নদীতীরে দুই ক্রোশ স্থান ব্যাপিয়া কেবলমাত্র বড় বড় নৌকানির্মাণকারী সূত্রধরেরা বাস করিত। শঙ্খ ঢাকার একটি বিখ্যাত শিল্প ছিল। ইহা ছাড়া সোনারূপা ও দামী পাথরের অলঙ্কার নির্মাণেও খুবই উৎকর্ষ লাভ করিয়াছিল।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিদেশী লেখকদের বিবরণে লৌহ শিল্পের বহু উল্লেখ আছে। বীরভূমে লোহার খনি ছিল। রেনেল লিখিয়াছেন যে সিউড়ি হইতে ১৬ মাইল দূরে খনি হইতে লৌহপিণ্ড নিষ্কাশিত করিয়া দামরা ও ময়সারাতে কারখানায় লৌহ প্রস্তুত হইত। মুল্লারপুর পরগনায় এবং কৃষ্ণনগরে লোহার খনি ছিল এবং দেওচা ও মুহম্মদবাজারে লৌহ তৈরীর কারখানা ছিল। কলিকাতা ও কাশিমবাজারে এদেশী লোকেরা কামান তৈরী করিত। কামানের বারুদও এদেশেই তৈরী হইত। [K.K. Datta, op. cic. p. 481-3.]
শীতকালে বাংলা দেশে কৃত্রিম উপায়ে বরফ তৈরী হইত। গরম জল সারা রাত্রি মাটির নীচে গর্ত করিয়া রাখিয়া বরফ প্রস্তুতের ব্যবস্থা ছিল। [K.K. Datta, op. cic. p. 435]
চীন পর্যটকেরা লিখিয়াছেন যে বাংলায় গাছের বাকল হইতে উৎকৃষ্ট কাগজ তৈরী হইত। ইহার রং খুব সাদা এবং ইহা মৃগ-চর্মের মত মসৃণ। লাক্ষা এবং রেশম শিল্পেরও উল্লেখ আছে।
চতুর্দ্দশ খ্রীষ্টাব্দে ইবন বতুতা লিখিয়াছেন যে বাংলা দেশে প্রচুর ধান ফলিত। সপ্তদশ খ্রীষ্টাব্দে বার্ণিয়ার লিখিয়াছেন যে অনেকে বলেন পৃথিবীর মধ্যে মিশর দেশই সর্বাপেক্ষা শস্যশালিনী। কিন্তু এ খ্যাতি বাংলারই প্রাপ্য। এদেশে এত প্রচুর ধান হয় যে ইহা নিকটে ও দূরে বহু দেশে রপ্তানি হয়। সমুদ্রপথে ইহা মসলিনপত্তন ও করমগুল উপকূলের অন্যান্য বন্দরে, এমন কি লঙ্কা ও মালদ্বীপে চালান হয়। বাংলায় চিনি এত হয় যে দক্ষিণ ভারতে গোলকুণ্ডা ও কর্ণাটে, এবং আরব, পারস্য ও মেসোপটেমিয়ায় চালান হয়। যদিও এখানে গম খুব বেশী পরিমাণে হয় না; কিন্তু তাহা এ দেশের লোকের পক্ষে পর্যাপ্ত। উপরন্তু তাহা হইতে সমুদ্রগামী ইউরোপীয় নাবিকদের জন্য সুন্দর সস্তা বিস্কুট তৈরী হয়। এখানে সুতা ও রেশম এত পরিমাণে হয় যে কেবল ভারতবর্ষ ও নিকটবর্তী দেশ নহে সুদূর জাপান এবং ইউরোপেও এখানকার বস্ত্র চালান হয়। এই দেশ হইতে উৎকৃষ্ট লাক্ষা, আফিম, মোমবাতি, মৃগনাভি, লঙ্কা এবং ঘৃত সমুদ্রপথে বহু স্থানে চালান হয়।
মধ্যযুগে এমন কয়েকটি বিদেশী কৃষিজাত দ্রব্য বাংলায় প্রথম আমদানি হয় যাহার প্রচলন পরবর্তীকালে খুবই বেশি হইয়াছিল। ইহার মধ্যে তামাক ও আলু আমেরিকা হইতে ইউরোপীয় বণিকেরা সপ্তদশ শতকে এদেশে আনেন। বাংলার বর্তমান যুগের দুইটি বিশেষ সুপরিচিত রপ্তানী দ্রব্য পাট ও চা সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের প্রথমে বিদেশে পরিচিত হয়। যে নীলের চাষ ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল তাহাও অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে আরম্ভ হয়। অষ্টাদশ শতাব্দী শেষ হইবার পূর্বেই নীল ও পাটের রপ্তানী আরম্ভ হয়।
