মুর্শিদকুলীর অধীনে ষোল জন খুব বড় জমিদার ছিলেন এবং ৬১৫টি পরগনার খাজনা তাঁহারাই আদায় করিতেন। ছোট ছোট জমিদার ও তালুকদারদের হস্তে আরও প্রায় ১৬০০ পরগনার খাজনা আদায়ের ভার ছিল। ছোট বড় জমিদারদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এবং তালুকদারদের অধিকাংশই হিন্দু ছিল। আজকাল হিন্দুদের মধ্যে দস্তিদার, সরকার, বক্সী, কানুনগো, চাকলাদার, তরফদার, লস্কর, হালদার প্রভৃতি উপাধিধারীদের পূর্বপুরুষগণ মুর্শিদকুলীর আমলে বা তাঁহার পরবর্তী কালে ঐ সকল রাজকার্যে নিযুক্ত হইয়াছিলেন।
নবাব আলীবর্দীর আমলে হিন্দুদের প্রতিপত্তি আরও বাড়িয়া যায়। মুর্শিদকুলী খানের বংশকে সরাইয়া তিনি নিজে নবাবী পদ লাভ করিয়াছিলেন, এই জন্য সম্ভ্রান্ত মুসলমানেরা তাঁহার প্রতি সদয় ছিল না। সুতরাং তিনি আত্মরক্ষার্থে হিন্দুদিগকে উচ্চপদে নিযুক্ত করিতেন। ইহারাও তাঁহার খুব অনুগত ছিল এবং ইহাদের সাহায্য তাঁহার রাজ্যে স্থিতি ও শক্তিবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ইহাদের মধ্যে জানকীরাম, দুর্লভরাম, দর্পনারায়ণ, রামনারায়ণ, কিরীটাদ, উমিদ রায়, বিরুদত্ত, রামরাম সিং ও গোকুলচাঁদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনেক হিন্দু উচ্চ সামরিক পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন এবং কেহ কেহ সাতহাজারী মনসবদার পদে উন্নীত হইয়াছিলেন। অনেক হিন্দু সেনানায়ক উড়িষ্যার যুদ্ধে এবং আফগান বিদ্রোহ দমন করিতে আলীবর্দীকে বিশেষ সাহায্য করিয়াছিলেন।
কিন্তু তথাপি হিন্দু জমিদারেরা মুসলমান নবাবীর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল গ্রন্থের সূচনায় কৃষ্ণচন্দ্রের লাঞ্ছনাকারী আলীবর্দীর বিরুদ্ধে অসন্তোষ পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছে। ১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দে লিখিত একখানি পত্রে কোম্পানীর একজন ইংরেজ কর্মচারী তাঁহার এক বন্ধুকে লিখিয়াছেন যে হিন্দু রাজা এবং প্রজা সকল শ্রেণীর লোকই মুসলমান শাসনে অসন্তুষ্ট এবং মনে মনে তাহাদের দাসত্ব হইতে মুক্তিলাভের ইচ্ছা পোষণ করে এবং ইহার সুযোগ সন্ধান করে। … …
১২. অর্থনৈতিক অবস্থা
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ – অর্থনৈতিক অবস্থা
মুসলমান বিজয়ের অব্যবহিত পূর্বে পাল ও সেন রাজগণের আমলের রাজাদের নামাঙ্কিত মুদ্রা পাওয়া যায় না। সে যুগে সম্ভবত প্রাচীন কালের মুদ্রারই প্রচলন ছিল। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ছোটখাট ব্যাপারে কড়িই মুদ্রার কাজ করিত।
মুসলমান যুগে প্রত্যেক স্বাধীন সুলতানই নিজ নামে মুদ্রা অঙ্কিত করিতেন। বস্তুত ইহাই তখন স্বাধীনতার প্রধান প্রতীক ছিল। বাংলার মুসলমান সুলতানেরা স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়াই নিজের নামে মুদ্রা বাহির করিতেন। এই সব মুদ্রায় তারিখ থাকিত। কয়েকজন সুলতানের অস্তিত্ব এবং অনেক স্থলে সুলতানদের সঠিক তারিখ কেবল মুদ্রা হইতেই জানা যায়। বাংলা দেশ দিল্লি সরকারের অন্ত গত হইলে দিল্লির সুলতানের মুদ্রাই চলিত। সপ্তদশ শতকের পর হইতে মুঘল সম্রাটগণের মুদ্রাই বাংলায় প্রচলিত ছিল। রূপার মুদ্রার নাম ছিল ‘টঙ্ক’-ইহা হইতেই টাকা শব্দের উৎপত্তি। প্রতি টঙ্কতে (চীন দেশীয় ১/১২ আউন্স) রূপা থাকিত। [Visvabharati Annals. Vol. I. P. 99] সাধারণ কেনা বেচায় কড়ি ব্যবহৃত হইত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে চার পাঁচ হাজার (কাহারও মতে আড়াই হাজার) কড়ি এক টাকার সমান ছিল। [K.K. Datta, History of Bengal Subah, p, 464 ff.] হিন্দু যুগের শেষ পাঁচ শত বৎসরে অনেক পরাক্রান্ত রাজা ও সম্রাট বাংলা দেশে রাজত্ব করিয়াছেন। তাঁহারা কেন নিজ নামে মুদ্রা বাহির করেন নাই এবং মুসলমান সুলতান প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত নিজ নামে কেন মুদ্রা প্রচার করিয়াছিলেন, এ রহস্যের কোন মীমাংসা আজ পর্যন্তও হয় নাই।
স্বাধীন সুলতানী আমলে অর্থাৎ দ্বাদশ হইতে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত বাংলা দেশ ধন-সম্পদে বিশেষ সমৃদ্ধ ছিল। দেশের শস্য-সম্পদ, শিল্প ও বাণিজ্যই ইহার প্রধান কারণ। আর একটি রাজনীতিক কারণও ছিল।
সপ্তদশ শতকের আরম্ভেই মুঘল শাসন বাংলা দেশে দৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইহা মুঘল সাম্রাজ্যের একটি সুবায় পরিণত হয়। ইহার পূর্বে চারি শতাব্দীতে বাংলা দেশ অধিকাংশ সময়ই স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। এই সময় বাংলার ধন-সম্পদ বাংলায়ই থাকিত, সুতরাং বাংলা দেশ খুবই সম্পদশালী ছিল।
অপর দিকে মুঘল যুগে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ হইয়া শাস্তি স্থাপন ও উৎকৃষ্ট শাসন ব্যবস্থার ফলে কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প প্রভৃতির উন্নতি হইয়াছিল। ইউরোপীয় বিভিন্ন জাতি–ইংরেজ, ফরাসী, ওলন্দাজ প্রভৃতি বাংলা দেশে বাণিজ্য বিস্তার করায় বহু অর্থাগম হইত। ১৬৮০-১৬৮৪ খ্রীষ্টাব্দ এই চারি বৎসরে কেবলমাত্র ইংরেজ ব্যবসায়ীরা খোল লক্ষ টাকার জিনিস কিনিয়াছিল। ওলন্দাজেরাও ইহার চেয়ে বেশি ছাড়া কম জিনিস কিনিত না। সুতরাং এই দুই কোম্পানীর নিকট হইতে প্রতি বৎসর আট লক্ষ রূপার টাকা বাংলায় আসিত। ১৯৩৮ খ্রীষ্টাব্দে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে দ্রব্যের যে মূল্য ছিল সেই অনুপাতে প্রতি বৎসর এক কোটি ষাট লক্ষ টাকা এই দুইটি ইউরোপীয় কোম্পানী দিত। ইহা ছাড়া অন্য দেশের সহিত বাণিজ্য তো ছিলই।
কিন্তু সম্পদ যেমন বাড়িল, সঙ্গে সঙ্গে তেমন কমিবারও ব্যবস্থা হইল। মুঘল শাসনের যুগে দুই কারণে বাংলার ধন শোষণ হইত। প্রথমত বাৎসরিক রাজস্ব হিসাবে বহু টাকা দিল্লিতে যাইত। দ্বিতীয়ত সুবাদার হইতে আরম্ভ করিয়া বড় বড় কর্মচারিগণ দিল্লি হইতে নিযুক্ত হইতেন এবং অধিকাংশই ছিলেন অবাঙালী। তাঁহারা অবসর গ্রহণ করিবার সময় সৎ ও অসৎ উপায়ে অর্জিত বহু অর্থ সঙ্গে লইয়া নিজের দেশে ফিরিয়া যাইতেন।
