সকল জমিদারই সম্পূর্ণরূপে মুঘল সুবাদারের আনুগত্য স্বীকার করিত। কেবলমাত্র সীতারাম রায় ছিলেন ইহার ব্যতিক্রম এবং পুরাতন বারো ভুঞাদের মতনই স্বাধীনচেতা। তাঁহার পিতা ভূষণার মুসলমান ফৌজদারের অধীনে একজন সামান্য রাজস্ব-আদায়কারী ছিলেন। সীতারাম প্রথমে বাংলার সুবাদারের নিকট হইতে নলদি (বর্তমান নড়াইল) পরগনার রাজস্ব আদায়ের ভার পান (১৬০৬ খ্রীষ্টাব্দ)। কথা ছিল যে তিনি নিয়মিতভাবে সুবাদারের প্রাপ্য রাজস্ব দিবেন এবং বিদ্রোহী আফগান ও দস্যুর দল হইতে ঐ অঞ্চল রক্ষা করিবেন। তাঁহার সততা ও দক্ষতার ফলে বাংলার সুবাদার আরও কতকগুলি পরগণার রাজস্ব আদায়ের ভারও তাঁহার হাতে দেন। এইভাবে সীতারাম একদল সৈন্য সংগ্রহ করেন। তিনি সুবাদারকে নিয়মিত টাকা পাঠাইয়া সন্তুষ্ট রাখিতেন এবং প্রবাদ এই যে, তিনি দিল্লির বাদশাহকে উপঢৌকন পাঠাইয়া রাজা উপাধি গ্রহণের ফরমান লাভ করেন। তাঁহার খ্যাতি ও প্রতাপে আকৃষ্ট হইয়া বহু বাঙালী সৈন্য তাঁহার সহিত যোগ দেয় এবং তিনি ভূষণা হইতে দশ মাইল দূরে মধুমতী নদীর তীরে বাগজানী গ্রামে এক সুরক্ষিত দুর্গ নির্মাণ করিয়া সেখানে রাজধানী স্থাপন করেন। কথিত আছে যে, একজন মুসলমান ফকীরের অনুরোধে তিনি নূতন রাজধানীর নাম রাখেন মহম্মদপুর। এবং অনেক মন্দির, সুরম্য হ্য, প্রাসাদ প্রভৃতি নির্মাণ এবং বৃহৎ বৃহৎ দীঘি কাটাইয়া ইহার গৌরব ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন। প্রথমে সুবাদার ইব্রাহিম খানের (১৬৮৯-১৬৯৭ খ্রী) দুর্বলতা ও অকর্মণ্যতা এবং পরে সুবাদার আজিমুসসানের সহিত মুর্শিদকুলী খানের কলহের সুযোগ লইয়া তিনি পার্শ্ববর্তী জমিদারদিগের ধনসম্পত্তি লুঠ করেন এবং সরকারী রাজস্ব দেওয়া বন্ধ করেন। অবশেষে ১৭১৩ খ্রীষ্টাব্দে তিনি হুগলির ফৌজদারকে হত্যা করেন। এইবার মুর্শিদকুলী খান সীতারামের শক্তি ও ঔদ্ধত্য সম্বন্ধে সচেতন হইয়া তাঁহাকে দমন করিবার জন্য ভূষণার ফৌজদারকে একদল সৈন্যসহ পাঠাইলেন। পার্শ্ববর্তী জমিদারদের সেনাদলও সুবাদারের ফৌজের সহিত যোগ দিল। এই মিলিত বাহিনীর সহিত যুদ্ধে সীতারাম পরাজিত ও সপরিবারে বন্দী হইলেন এবং তাঁহার রাজধানী ধ্বংস করা হইল। এইরূপে বাংলার শেষ হিন্দু রাজ্যের পতন হইল। ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র সীতাৰ্বামকে অমর করিয়া গিয়াছেন।
যে সকল জমিদার নিয়মমত রাজস্ব দিতেন মুর্শিদকুলী খান তাঁহাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করিতেন এবং কোন উপরি পাওনার দাবি করিতেন না। কিন্তু নির্ধারিত তারিখে রাজস্ব জমা দিতে না পারিলে তিনি রাজস্ব-বিভাগে কর্মচারী ও জমিদারদের উপর অকথ্য অত্যাচার করিতেন। তাঁহাদিগকে কাছারীতে বন্ধ করিয়া রাখা হইত। খাদ্য বা পানীয় কিছুই দেওয়া হইত না। ঐ রুদ্ধ কক্ষেই মলমূত্র ত্যাগ করিতে হইত। অনেক সময় মাথা নীচু ও পা উপরের দিকে করিয়া তাঁহাদিগকে ঝুলাইয়া রাখিয়া বেত্রাঘাত করা হইত। বিষ্ঠাপূর্ণ গর্তে তাহাদিগকে। ডুবাইয়া রাখা হইত, এই গর্তের নাম দেওয়া হইয়াছিল বৈকুণ্ঠ! অনেক সময় খাজনা দিতে না পারার অপরাধে হিন্দু আমিল, জমিদার প্রভৃতিকে স্ত্রীপুত্রসহ মুসলমান ধর্ম্মে দীক্ষিত করা হইত। বলা বাহুল্য যে এইসব আমিল ও জমিদারগণও প্রজাদের উপর নানা রকম অত্যাচার করিয়া খাজনা আদায় করিতেন। বাদশাহের দরবারে এই সব অত্যাচারের কাহিনী পৌঁছিত, কিন্তু কোন প্রতিকার হইত না। শুজাউদ্দীন নবাব হইয়া বন্দী জমিদারদিগকে মুক্তি দিলেন এবং মুর্শিদকুলীর যে দুইজন অনুচর পূর্ব্বোক্তরূপ নিষ্ঠুর অত্যাচার করিত, তদন্ত করিয়া তাহাদের দোষ সাব্যস্ত হইলে পর তাহাদের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও প্রাণদণ্ডের আদেশ দিলেন।
মুর্শিদকুলী খান রাজস্বের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি করিয়াছিলেন। ইহার ফলে প্রজাদের করভার অসম্ভব রকম বৃদ্ধি পাইল। ইহাতে তাহাদের দুর্দশার অন্ত ছিল না। ওদিকে প্রতি বৎসর মুর্শিদকুলীর কোষাগারে বহু অর্থ সঞ্চিত হইত। শুজাউদ্দীনের আমলেও মোট রাজস্বের পরিমাণ পূর্বের ন্যায় ১,৪২,৪৫,৫৬১ টাকা ছিল। কিন্তু তিনি অতিরিক্ত কর (আবওয়াব) বাবদ ১৯,১৪,০৯৫ টাকা আদায় করিতেন।
মুর্শিদকুলী খানের প্রতিষ্ঠিত নবাবী আমলে বাংলায় হিন্দু জমিদারদের উৎপত্তি ছাড়াও আর একটি গুরুতর পরিবর্তন ঘটিয়াছিল। বাদশাহী আমলে সুবাদার উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা ও মনসবদারগণ দিল্লি হইতে নিযুক্ত হইয়া আসিত এবং নির্দিষ্ট কার্যকাল শেষ হইলে বাংলা দেশ ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইত। কিন্তু নবাবী আমলে বংশানুক্রমিক আজীবন সুবাদারেরা বাংলা দেশেরই চিরস্থায়ী বাসিন্দা হইলেন। দিল্লির দরবারের সঙ্গে যোগসূত্র ছিন্ন হওয়ার ফলে বাংলার অধিবাসীরাই সরকারী সকল পদে নিযুক্ত হইলেন। মুর্শিদকুলী খান গুণের আদর করিতেন এবং তাঁহার আমলে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ প্রভৃতি শ্রেণীর হিন্দুগণ উত্তমরূপে ফার্সী ভাষায় অভিজ্ঞতা অর্জন করিয়া কর্মকুশলতার ফলে বহু উচ্চপদ অধিকার করিতে লাগিলেন। এইভাবে মুসলমান যুগে সর্বপ্রথম হিন্দুদের মধ্যে এক সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব হইল। ইহাদের কেহ কেহ নবাবের অনুগ্রহে জমিদারী লাভ করিয়া অথবা কার্যে বিশেষ দক্ষতা দেখাইয়া বহু ধন অর্জন করিয়া রাজা, মহারাজা প্রভৃতি খেতাব পাইলেন। জগৎশেঠের ন্যায় ধনী হিন্দুরাও ক্রমে নবাবের দরবারে খুব প্রতিষ্ঠা লাভ করিলেন। মুর্শিদকুলী খানের পরবর্তী নবাবেরাও এই নীতি অনুসরণ করায় অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এক হিন্দু অভিজাত সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হইল।
