২
মুঘল শাসনপ্রণালী
মুঘল সাম্রাজ্য কয়েকটি সুবায় (প্রদেশে) বিভক্ত ছিল এবং প্রতি সুবার শাসনপ্রণালী মোটামুটি এক রকমই ছিল। ব্রিটিশ যুগের বাংলা প্রদেশ অপেক্ষা সুবে বাংলা অধিকতর বিস্তৃত ছিল। পূর্ণিয়া ও ভাগলপুর জিলার কতক অংশ এবং শ্রীহট্ট জিলা বাংলা সুবার অন্তর্গত ছিল। চট্টগ্রাম জিলা প্রথমে আরাকান রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ১৬৬৬ খ্রীষ্টাব্দে ইহা সুবে বাংলার সহিত যুক্ত হয়।
প্রত্যেক প্রদেশেই একজন সুবাদার বা প্রধান শাসনকর্ত্তা এবং আরও একজন। উচ্চপদস্থ কর্মচারী নিযুক্ত হইতেন। সাধারণ রাজস্বের জন্য দিওয়ান, সামরিক ব্যয় নির্বাহের জন্য বশী–এই দুই বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন এবং তাঁহারা অনেক পরিমাণে সুবাদারের যথেচ্ছ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত করিতেন। বকাইনবিশ নামে একজন কর্মচারী প্রাদেশিক সমস্ত ঘটনার বিবরণ সোজাসুজি বাদশাহের নিকট পাঠাইতেন। সুবাদার সম্বন্ধে সমস্ত খুঁটিনাটি বিবরণ এইভাবে বাদশাহের কাছে পৌঁছিত। এই কয়জন কর্মচারীই বাদশাহ কর্ত্তৃক নিযুক্ত হইতেন এবং পরস্পরের কার্যে ক্ষমতার অপব্যবহার অনেকটা সংযত্ন করিতে পারিতেন। নিম্নতর কর্মচারীদের মধ্যে কতক ছিলেন বাদশাহী মনসবদার–ইহারা সুবাদারের নিযুক্ত কর্মচারীদের অপেক্ষা অধিক সম্মানের দাবি করিতেন এবং প্রয়োজন হইলে সুবাদারের বিরুদ্ধে বাদশাহের নিকট অভিযোগ করিতে পারিতেন। কোন গুরুতর বিষয় উপস্থিত হইলে সুবাদারকে বাদশাঙ্কের উপদেশ, নির্দেশ ও মতামত লইতে হইত। কোন সুবাদার ইহা না করিয়া বেশি রকম স্বাধীনতা অবলম্বন করিলে বাদশাহ তাঁহার বিরুদ্ধে কঠোর পরওয়ানা জারি করিতেন এবং কখনও কখনও সুবাদারের কার্য তদন্ত করিবার জন্য রাজধানী হইতে উচ্চপদস্থ কোন লোক পাঠাইতেন।
সুবাদারের অধীনস্থ কর্মচারীদের উন্নতি অবনতি বাদশাহের উপর নির্ভর করিত। অবশ্য সুবাদারের নিকট হইতে প্রত্যেকের কার্য সম্বন্ধে রিপোর্ট যাইত। সুবাদারদের উপর কড়া আদেশ ছিল যে রিপোর্টে যেন খাঁটি সত্য কথা বলা হয় এবং ইহা কোন রকম পক্ষপাতিত্ব দোষে দুষ্ট না হয়। কিন্তু কর্মচারীরাও অনেক সময় অন্য লোক দিয়া বাদশাহের নিকট সুপারিশ করাইতেন এবং বাদশাহের দরবারে উপহার বা পেশকাশ পাঠাইতেন। মির্জা নাথান নিজের পদোন্নতির জন্য সম্রাট জাহাঙ্গীরকে উপঢৌকন-স্বরূপ হস্তী ও অন্যান্য যে দ্রব্যাদি পাঠাইয়াছিলেন, তাঁহার মূল্য ছিল ৪২,০০০ টাকা।
ভূমির রাজস্বই ছিল সুবার প্রধান আয়। মোটামুটি তিন শ্রেণীর জমি ছিল। প্রথম, খালিসা শরিফা অর্থাৎ প্রত্যক্ষভাবে সরকারের অধীন। দ্বিতীয়, কর্মচারীদের ব্যয় নির্বাহের জন্য জায়গীর। তৃতীয়, প্রাচীন জমিদার অথবা সামন্তরাজার জমি।
খালিসা জমির খাজনা কখনও কখনও সরকারী কর্মচারীরাই আদায় করিতেন কিন্তু বেশির ভাগ ইজারাদারেরাই আদায় করিত। নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিবার অঙ্গীকারে ইহারা এক একটী পরগনা ইজারা লইত।
দ্বিতীয় শ্রেণীর জমির কতকটা কর্মচারীর ব্যক্তিগত আর কতকটা চাকরাণ জমির মত কর্মচারীদিগকে বেতনের পরিবর্তে দেওয়া হইত।
বারো ভুঞা বা পাঠান যুগের অন্যান্য যে সকল স্বাধীন রাজা মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করিয়াছিলেন, তাঁহারা তৃতীয় শ্রেণীভুক্ত ছিলেন। তাঁহারা অনেকেই তাঁহাদের পূর্বতন সম্পত্তি পুরাপুরি বা আংশিকভাবে ভোগ করিতেন এবং নির্দিষ্ট খাজনা দিতেন। আভ্যন্তরিক শাসন বিষয়ে তাঁহাদের যথেষ্ট ক্ষমতা ও অনেক পরিমাণে স্বাধীনতা ছিল। অধীনস্থ জমিতে শান্তিরক্ষা, বিচার করা প্রভৃতি অনেক ক্ষমতা তাঁহাদের ছিল।
৩
নবাবী আমলের শাসনপ্রণালী
মুর্শিদকুলী খানের সময় হইতে এই ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন হয়। তিনি দিওয়ান হইয়া যখন বাংলায় আসিলেন, তখন প্রায় সমস্ত খাস জমিই কর্মচারীদের জায়গীরে পরিণত হইয়াছে। জমিদারদের মধ্যেও অনেকেই অলস, অকর্মণ্য ও বিলাসী হওয়ায় নিয়মিত রাজস্ব দিত না। তিনি এই উভয় প্রকার জমির রাজস্ব আদায়ের জন্যই নূতন ইজারাদার নিযুক্ত করিলেন। জমিদার নামেমাত্র রহিলেন, কিন্তু ইজারাদারদের হাতেই তাঁহাদের রাজস্ব আদায়ের ভার পড়িল। ইজারাদারেরা যে রাজস্ব আদায় করিতেন, তাঁহার জন্য পূর্বেই তাহাদিগকে জামিন স্বরূপ মোটামুটি সেই টাকার পরিমাণ কড়ারী খত সই করিয়া দিতে হইত। সংগৃহীত রাজস্বের এক অংশ তাঁহারা পাইতেন। পূর্বেকার মুসলমান ইজারাদারেরা রাজস্ব আদায় করিয়াও ন্যায্য টাকা জমা দিতেন না–অধিকাংশই আত্মসাৎ করিতেন। এইজন্য মুর্শিদকুলী খান বেশির ভাগ হিন্দুদের মধ্য হইতেই নূতন ইজারাদার নিযুক্ত করিতেন। এই নূতন ব্যবস্থার ফলে প্রাচীন জমিদারেরা প্রায় লুপ্ত হইল এবং নূতন ইজারাদারেরা তাহাদের স্থান অধিকার করিয়া দুই তিন পুরুষের মধ্যেই রাজা, মহারাজা প্রভৃতি উপাধি পাইলেন। এইরূপে বাংলা দেশে নূতন এক হিন্দু অভিজাত সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হইল। ইংরেজ যুগের লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে অষ্টাদশ শতাব্দীর এই সব ইজারাদারের বংশধরেরাই উত্তরাধিকারী সূত্রে জমিদার বলিয়া পরিগণিত হইলেন। পরবর্তী কালের নাটোর, দীঘাপতিয়া, মুক্তাগাছা প্রভৃতি স্থানের প্রবল জমিদারগণের উৎপত্তি এই ভাবেই হইয়াছিল। অবশ্য বর্ধমান, কৃষ্ণনগর, সুসঙ্গ, বীরভূম, বিষ্ণুপুর প্রভৃতির জমিদারগণ মুর্শিদকুলী খানের সময়ের পূর্ব হইতেই ছিলেন। কোচবিহার, ত্রিপুরা ও জয়ন্তিয়া–এই তিনটি পুরাতন রাজ্য স্বাধীনতা হারাইয়া নবাবের বশ্যতা স্বীকার করিয়া করদ রাজ্যে পরিণত হইয়াছিল।
