মীরজাফরের মৃত্যুর পর ইংরেজ কাউসিল নজমদ্দৌল্লাকে এই শর্তে নবাব করিলেন যে তিনি নামে নবাব থাকিবেন, কিন্তু সমস্ত শাসনক্ষমতা একজন নায়েব সুবাদারের হস্তে থাকিবে। ইংরেজের অনুমোদন ব্যতীত তিনি কোন নায়েব সুবাদার নিযুক্ত বা বরখাস্ত করিতে পারিবেন না। অর্থাৎ পরোক্ষভাবে ইংরেজই বাংলার শাসনভার গ্রহণ করিল। এই শর্তে নবাবী করিবার জন্য নজমুদ্দৌল্লা ইংরেজ গভর্নর ও অন্যান্য সদস্যগণকে প্রায় চৌদ্দ লক্ষ টাকা উপঢৌকন দিলেন।
অতঃপর গভর্নর ভ্যানসিটার্ট অনুগত বাদশাহ শাহ্ আলমকে অযোধ্যা প্রদেশ দান করিবেন, এইরূপ প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু শীঘই তাঁহার স্থানে ক্লাইব পুনরায় গভর্নর হইয়া কলিকাতায় আসিলেন (মে, ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দ)। তিনি এই ব্যবস্থা উল্টাইয়া শুজাউদ্দৌল্লার সঙ্গে সন্ধি করিলেন। তাঁহাকে তাঁহার রাজ্য ফিরাইয়া দেওয়া হইল, বিনিময়ে তিনি নগদ ৫০ লক্ষ টাকা এবং এলাহাবাদের উপর অধিকার ছাড়িয়া দিলেন। তারপর ক্লাইব শাহ্ আলমের সহিত সন্ধি করিলেন। এলাহাবাদ ও চতুস্পার্শ্ববর্তী ভূখণ্ড শাহ্ আলমকে দেওয়া হইল। তৎপরিবর্তে বাদশাহ ইংরেজ কোম্পানীকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দিওয়ান নিযুক্ত করিয়া এক ফরমান দিলেন। নবাবের সহিত সন্ধির ফলে বাংলার সৈন্যবল ও শাসনক্ষমতা পূর্বেই ইংরেজের হস্তগত হইয়াছিল।
দিওয়ানী পাইবার পর রাজস্ব আদায়ের ভারও ইংরেজরা পাইল। স্থির হইল যে প্রতি বত্সর আদায়ী রাজস্ব হইতে মুর্শিদাবাদের নাম-সর্বস্ব নবাব ৫৩ লক্ষ এবং দিল্লির নাম-সর্বস্ব বাদশাহ ২৬ লক্ষ টাকা পাইবেন। বাকী টাকা ইংরেজরা ইচ্ছামত ব্যয় করিবে। নবাবের বার্ষিক বৃত্তি কমাইয়া ১৭৬৬ খ্রীষ্টাব্দে ৪১ লক্ষ এবং ১৭৬৯ খ্রীষ্টাব্দে ৩২ লক্ষ করা হইয়াছিল। প্রকৃতপেক্ষ বাংলার নবাবী আমল ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দেই শেষ হইল।
১১. মুসলিম যুগের উত্তরার্ধের রাজ্যশাসন ব্যবস্থা
একাদশ পরিচ্ছেদ – মুসলিম যুগের উত্তরার্ধের রাজ্যশাসন ব্যবস্থা
১
বারো ভুঞার যুগ
জাহাঙ্গীরের রাজত্বে এবং সুবাদার ইসলাম খাঁর কঠোর নীতিতে, বাংলার মুঘল শাসনপ্রণালী দৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। আকবরের হস্তে দাউদ খান কররানীর পরাজয়ের পরে প্রায় চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত বাংলায় কোন শৃঙ্খলাবদ্ধ শাসনপ্রণালী ছিল না। বারো ভুঞা নামে পরিচিত বাংলার জমিদারগণ স্বেচ্ছামত নিজের নিজের রাজ্য শাসন করিতেন। সুতরাং ইহা বারো ভুঞার যুগ বলা যাইতে পারে। পরবর্তীকালে বাঙালীর কল্পনায় এই যুগ এক নূতন রূপে চিত্রিত হইয়াছে। মুঘলদের সঙ্গে বারো ভুঞার সংঘর্ষ বাঙালীর স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ বলিয়া কল্পিত হইয়াছে এবং বাংলার যে সকল জমিদার মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছিলেন, তাঁহাদের অপূর্ব বীরত্ব ও স্বদেশপ্রেম রঙীন কল্পনায় রঞ্জিত হইয়া সাহিত্যে ও বাঙালীর মনে উজ্জ্বল রেখাপাত করিয়াছে।
বারো ভুঞাদের প্রায় সকলেই এই যুগসন্ধির অরাজকতার সুযোগ লইয়া বাংলার নানাস্থানে স্বীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। ইহারা কোন প্রাচীন বংশের প্রতিনিধি নহেন এবং নিজের সম্পত্তি রক্ষার জন্যই যুদ্ধ করিয়াছিলেন। ইঁহাদের কেহ কেহ অসাধারণ বীরত্ব দেখাইয়াছেন, কিন্তু বাঙালীর কল্পনায় যাহারা বীর বলিয়া খ্যাতি লাভ করিয়াছেন, তাঁহারা সকলেই ইহার যোগ্য নহেন। প্রতাপাদিত্য অতুলনীয় বীর ও দেশপ্রেমিক বলিয়া খ্যাতিলাভ করিয়াছেন, কিন্তু তিনি কোন যুদ্ধেই বীরত্ব দেখাইতে পারেন নাই এবং বাঙালী জমিদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুঘল সুবাদারকে সাহায্য করিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। যাহারা বীরত্ব দেখাইয়ছিলেন ঈশা খাঁ, উসমান প্রভৃতি–তাঁহাদের অধিকাংশই মুসলমান। যে অর্থে মুঘলেরা বাংলায় বিদেশী, সে অর্থে এই সব পাঠানেরাও বিদেশী। পাঠানেরাও হিন্দুদের উপর অত্যাচার কম করেন নাই এবং স্বার্থের খাতিরে বাংলার হিন্দুদের সহিত একত্র হইয়া সাধারণ শত্রু মুঘলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছেন। সুতরাং বারো ভুঞার যুগ হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের উপর প্রতিষ্ঠিত বাঙালী জাতির বিদেশী মুঘল শত্রুর আক্রমণ হইতে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার্থে সংগ্রামের যুগ–এরূপ মনে করিবার কোনই কারণ নাই। মুঘলরা বাংলা দেশ অধিকার না করিলে হয় বারো ভুঞার অরাজকতার যুগই চলিত, নয় তো কোন মুসলমান জমিদার বাংলায় একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপন করিয়া আবার পাঠান যুগের প্রবর্তন করিত। কারণ কোন হিন্দুকে যে মুসলমানেরা রাজা বলিয়া স্বীকার করিত না, হিন্দু রাজা গণেশ ও তাঁহার মুসলমান ধর্ম্মাবলম্বী পুত্রের ইতিহাস স্মরণ করিলেই সে বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকে না। মুর্শিদকুলী খাঁর সময় হইতে বাংলার মুসলমান নবাবগণ বাংলা দেশেই স্থায়িভাবে বসবাস করিতেন। সিরাজউদ্দৌলা, মীর কাশিম প্রভৃতিকেও বাঙালীরা ইংরেজের বিরুদ্ধে বাংলা দেশের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামের নায়ক বলিয়া কল্পনা করিয়াছেন। ঐতিহাসিক তথ্যের দিক দিয়া পাঠান জমিদারদের মুঘল শক্তির সহিত যুদ্ধের সঙ্গে ইহার কোন প্রভেদ নাই। সপ্তদশ শতাব্দীতে যে মুঘলরাজ বিদেশী শত্রু বলিয়া পরিগণিত হইত–তাহারাই অষ্টাদশ শতাব্দীতে পাঠান জমিদারদের ন্যায় বাংলায় স্বাধীনতা সংগ্রামে স্বদেশপ্রেমিক বলিয়া খ্যাতি লাভ করিয়াছে। এই দুইয়ের তুলনা করিলেই দেখা যাইবে যে জাতীয়তা এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের দিক দিয়া বারো ভুঞার যুগের সহিত নবাবী আমলের বাংলার যুগের বিশেষ কোন প্রভেদ নাই। সিরাজউদ্দৌলা ও মীর কাশিমের বিরুদ্ধে যাহারা ইংরেজের সহিত চক্রান্ত করিয়াছিলেন, তাঁহাদের অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু। সুতরাং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের উপর প্রতিষ্ঠিত বাঙালী জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের কল্পনা মুঘল যুগের প্রারম্ভের ক্ষেত্রেও যেরূপ, ইংরেজ আমলের প্রথম ভাগের ক্ষেত্রেও সেরূপ অলীক ও সম্পূর্ণরূপে অনৈতিহাসিক।
