মীর কাশিম যখন ইংরেজ কর্মচারীদিগকে ঘুষ দিয়া তাহাদের অনুগ্রহে মীরজাফরকে সরাইয়া নিজে নবাব হইয়াছিলেন তখন তাঁহার বোঝা উচিত ছিল যে ন্যায় হউক অন্যায় হউক ইংরেজ যে সব সুযোগ সুবিধা পাইয়াছে তাহা কখনও ত্যাগ করিবে না। বরং নূতন নূতন সুবিধার দাবি করিবে। নবাবী লাভের মূল্যস্বরূপ তিনিও অনেক নূতন সুবিধা ও অধিকার ইংরেজকে দিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ইংরেজের বেআইনী ব্যবসা বন্ধ করিতে হইলে তাহাদের সহিত যে সন্ধির ফলে তিনি নবাব হইয়াছিলেন, সেই সন্ধিতেই তাঁহার উল্লেখ করা উচিত ছিল। তিনি বেশ জানিতেন ইংরেজ কখনও তাহাতে রাজী হইবে না। সন্ধির সময়ে এ প্রসঙ্গ না ভোলায় তিনি প্রকারান্তরে ইহা মানিয়াই লইয়াছিলেন। সুতরাং পরে এই বিষয় লইয়া আপত্তি করার স্বপক্ষে যুক্তি থাকিতে পারে, কিন্তু ন্যায়ের বা আইনের দোহাই দিয়া নিজেকে সম্পূর্ণ নিরপরাধ ও উৎপীড়িতের পর্যায়ে ফেলা যায় না।
নিজের প্রভু, রাজা ও শ্বশুরের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া তিনি যে গুরুতর অপরাধ করিয়াছিলেন তাহা কোন রকমেই ক্ষমা করা যাইতে পারে না। কেহ কেহ মনে করেন বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তাঁহার প্রাণপণ চেষ্টা দ্বারা তিনি তাঁহার অপরাধের ক্ষালন করিয়াছেন। অবশ্য সিরাজউদ্দৌলার পরবর্তী নবাবদের সহিত তুলনা করিলে এ বিষয়ে তাঁহার শ্রেষ্ঠত্ব অবিসংবাদিত। বঙ্কিমচন্দ্র মীর কাশিমকে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব’ আখ্যা দিয়া বাঙালীর হৃদয়ে তাঁহাকে উচ্চ স্থান দিয়াছেন। কিন্তু পূর্বে মীর কাশিমের নবাবী সম্বন্ধে যাহা বলা হইয়াছে তাহা স্মরণ করিলে বলিতে হইবে যে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রদত্ত উপাধি কেবল আংশিকভাবে সত্য। মীর কাশিমের চার বৎসর নবাবীর মধ্যে প্রায় তিন বৎসর স্বাধীনভাবে তিনি বিশেষ কিছুই করিতে পারেন নাই। তিনি স্বাধীনতা লাভের জন্য চেষ্টা করিয়াছিলেন; কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। ১৭৬৩ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে মীর কাশিমকে স্বাধীন নবাব বলিয়া মনে করিবার কোন সঙ্গত কারণ নাই।
৯
মীর কাশিমের পর (১৭৬৪-৬৬)
মীর কাশিমের সহিত যুদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরেই কলিকাতা কাউনসিল তাঁহাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া মীরজাফরকে পুনরায় মসনদে প্রতিষ্ঠিত করিতে সংকল্প করেন। তদনুসারে ১৭৬৩ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই জুলাই মীরজাফরের সহিত ইংরেজদের এক নূতন সন্ধি হয়। মীরজাফর ইংরেজ সৈন্যের ব্যয় নির্বাহাৰ্থ বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম জেলা ইংরেজদিগকে দিলেন। ইংরেজদিগকে বিনা শুঙ্কে বাংলা দেশে বাণিজ্য করিতে (কেবল লবণের উপর আড়াই টাকা শুঙ্ক থাকিবে) অনুমতি দিলেন। ১২,০০০ অশ্বারোহী ও ১২,০০০ পদাতিকের বেশি সৈন্য না রাখিতে স্বীকৃত হইলেন। ইংরেজের একজন প্রতিনিধিকে মুর্শিদাবাদে স্থায়ীরূপে বসবাস করিতে অনুমতি দিলেন; এবং ইংরেজ কোম্পানীকে ত্রিশ লক্ষ টাকা দিতে রাজী হইলেন। এই সমুদয় শর্তের বিনিময়ে ইংরেজগণ মীর কাশিমকে পদচ্যুত করিয়া মীরজাফরকে পুনরায় নবাব করিতে প্রতিশ্রুত হইলেন।
সন্ধির শর্ত ব্যতীত মীরজাফরের অনুরোধে কোম্পানী আরও কয়েকটি প্রস্তাবে স্বীকৃত হইল।
১। মীরজাফর খোঁজা পিকে সৈন্য বিভাগে এবং মহারাজা নন্দকুমারকে দিওয়ানী বিভাগে নিযুক্ত করিতে পারিবেন।
২। যদি নবাবের কোন প্রজা বা কর্মচারী কলিকাতায় আশ্রয় গ্রহণ করে, তবে নবাব দাবি করিলে তাহাকে (নবাবের নিকট) ফেরৎ পাঠাইতে হইবে।
৩। নবাবের কোন কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকিলে ইংরেজরা সরাসরি তাঁহার বিচার করিতে পারিবেন না।
৪। নবাব ইংরেজ গভর্নরের নিকট সৈন্য-সাহায্য চাহিলে অবিলম্বে তাহা পাঠাইতে হইবে এবং ইহার ব্যয় বাবদ নবাবকে কিছুই দিতে হইবে না।
বলা বাহুল্য, এই দ্বিতীয় বার নবাবী লাভের জন্যও মীরজাফরকে সন্ধির শর্ত অনুযায়ী ত্রিশ লক্ষ ব্যতীত আরও অনেক টাকা দিতে হইল।
মীরজাফর মেজর অ্যাডসের সৈন্যদলের সঙ্গে ১৭৬৪ খ্রীষ্টাব্দের ২৪শে জুলাই মুর্শিদাবাদে পৌঁছিয়া প্রাসাদে বাস করিতে লাগিলেন। নগরে কিছু গোলযোগ, মারামারি ও লুঠপাট আরম্ভ হইল কিন্তু ধনী ও অভিজাত সম্প্রদায় স্বস্তি র নিঃশ্বাস ফেলিলেন এবং যথারীতি নূতন নবাবের দরবারে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে অভিনন্দন জানাইলেন।
মীরজাফর ইংরেজ সৈন্যের সঙ্গে পাটনায় পৌঁছিলেন এবং সুবাদারীর সনদ পাইবার জন্য শুজাউদ্দৌল্লার সঙ্গে গোপনে কথাবার্তা চালাইতে লাগিলেন। বাদশাহকে বার্ষিক ২৭ লক্ষ এবং উজীরকে ২ লক্ষ টাকা দিবার শর্তে তিনি প্রার্থিত বাদশাহী সনদ প্রাপ্ত হইলেন। কিন্তু ইংরেজ কাউনসিল ইহা অনুমোদন করিলেন না। শুজাউদ্দৌল্লা ও বাদশাহের সহিত এরূপ গোপন কথাবার্তায় সন্দিহান হইয়া ইংরেজরা মীরজাফরের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁহাকে পাটনা ত্যাগ করিয়া কলিকাতায় আসিতে বাধ্য করিল। তারপর বক্সার যুদ্ধের পর শাহ্ আলম উজীরের সঙ্গ ত্যাগ করিয়া বারাণসীতে অবস্থান করিতেছিলেন। মীরজাফর ইংরেজদের অনুমতি লইয়া তাঁহার নিকট সুবাদারীর আবেদন জানাইয়া লোক পাঠাইলেন। বাদশাহ এই আবেদন মঞ্জুর করিয়া সুবাদারীর সনদ ও খিলাৎ পাঠাইলেন (জানুয়ারী, ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দ)। অল্পদিনের মধ্যেই মীরজাফরের গুরুতর পীড়া হইল। মত্যু আসন্ন জানিয়া তিনি ইংরেজ কর্মচারী ও প্রধান ব্যক্তির সম্মুখে নাবালক পুত্র নজমুদ্দৌল্লাকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করিয়া তাহাকে মসনদে বসাইলেন এবং নন্দকুমারকে তাঁহার দিওয়ান মনোনীত করিলেন। ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দের ৫ই ফেব্রুয়ারী মীরজাফরের মৃত্যু হইল। কথিত আছে যে মৃত্যুর অনতিকাল পূর্বে তিনি মহারাজা নন্দকুমারের অনুরোধে মুর্শিদাবাদের নিকটবর্তী কিরীটেশ্বরীর মন্দির হইতে দেবীর চরণামৃত আনাইয়া পান করিয়াছিলেন।
