মীর কাশিমের পতনের অনতিকাল পরে গভর্নর ভ্যানসিটার্ট তাঁহার সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছেন, তাঁহার সারমর্ম এই—”নবাব কোন দিন আমাদের ব্যবসায়ের কোন অনিষ্ট করেন নাই। কিন্তু আমরা প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত অতি সামান্য ও তুচ্ছ কারণে প্রতিদিন তাঁহার শাসনব্যবস্থায় পদাঘাত করিয়াছি এবং তাঁহার কর্মচারীদের যথেষ্ট নিগ্রহ করিয়াছি। বহু দিন পর্যন্ত নবাব অপমান ও লাঞ্ছনা সহ্য করিয়াছেন, কারণ তাঁহার আশা ছিল যে আমি এই সমুদয় দূর করিতে পারি। তিনি প্রতিবাদ করিয়াছেন, কিন্তু প্রতিশোধ লন নাই।
“এই যুদ্ধের জন্য যে আমরাই দায়ী–এলিসের পাটনা আক্রমণই যে এই যুদ্ধের কারণ তাহা কেহই অস্বীকার করিতে পারে নাই। যে কোন নিরপেক্ষ ব্যক্তি মীর কাশিমের দিক হইতে ঘটনাগুলি বিচার করিবেন, তিনিই বলিবেন যে এলিসের পাটনা আক্রমণ বিশ্বাসঘাতকতার একটি চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত এবং ইহা হইতেই প্রমাণিত হয় যে আমরা যে সব সন্ধি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করিয়াছি তাহা স্তোকবাক্য মাত্র এবং মীর কাশিমকে প্রতারিত করিয়া তাঁহার সর্বনাশ সাধনের উপায় মাত্র।
“যখন আমাদের সহিত মীর কাশিমের যুদ্ধ বাধিল তখন তিনি বক্তিগত ভাবে কোন সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দেন নাই। কিন্তু তাঁহার সৈন্যদল যে সাহস ও প্রভুভক্তি দেখাইয়াছেন হিন্দুস্থানে তাঁহার দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। তাঁহার রাজ্যের দূরতম প্রদেশে তাঁহার কোন প্রজা পাটনায় যুদ্ধে পরাজয় ও তাঁহার পলায়নের চেষ্টার পূর্বে বিদ্রোহ করে নাই বা আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় নাই। প্রজারা যে তাঁহাকে ভালবাসিত ইহা তাঁহারই পরিচয়।
“মুঙ্গেরের হত্যাকাণ্ডের পূর্বে মীর কাশিম কোন নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেন নাই। কিন্তু তিন বৎসর পর্যন্ত তিনি যাহা সহ্য করিয়াছিলেন, তাঁহার কথা এবং তাঁহার গুরুতর ভাগ্য বিপর্যয়ের কথা স্মরণ করিলে এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডজনিত অপরাধও তত গুরুতর মনে হইবে না। ধনসম্পদশালী দেশের আধিপত্য হইতে কপর্দকহীন ভিখারী অবস্থায় প্রাণের জন্য পলায়ন-এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় মস্তিষ্ক বিকৃত হইবার ফলে ও সাময়িক উত্তেজনার ফলে তিন বৎসরের পূঞ্জীভূত অপমানের প্রতিহিংসা গ্রহণে প্রণোদিত হইয়াই তিনি এই দুষ্কার্য করিয়াছিলেন, এ কথা স্মরণ করিলে আমরা তাঁহার চরিত্র সম্বন্ধে সঠিক ধারণা করিত পারিব।”
ভ্যানসিটার্টের এই উক্তি মোটামুটিভাবে সত্য বলিয়া গ্রহণ করা যায়। কিন্তু মীর কাশিম যে নিষ্ঠুর প্রকৃতির ছিলেন না ইহা পুরাপুরি স্বীকার করা যায় না। অর্থ সংগ্রহের জন্য তিনি বহু নিষ্ঠুর কার্য করিয়াছিলেন। রামনারায়ণ যতদিন ইংরেজের আশ্রিত ছিলেন মীর কাশিম তাঁহার কোন অনিষ্ট করিতে পারেন নাই। যে কোন কারণেই হউক, ইংরেজরা যখনই রামনারায়ণকে আশ্রয় হইতে বঞ্চিত করিল তখনই মীর কাশিম তাঁহার সর্বস্ব লুণ্ঠন করিয়া তাহাকে বন্দী করিলেন। তারপর ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে হরিয়া পলায়ন করিবার পূর্বে তিনি কেবল ইংরেজ বন্দীদিগকে নহে, রামনারায়ণ, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ প্রভৃতি রাজ্যের কয়েকজন প্রধান প্রধান ব্যক্তিকে নিমর্মভাবে হত্যা করেন। সুতরাং তাঁহার বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতার অভিযোগ একেবারে অস্বীকার করা যায় না।
এই প্রসঙ্গে সমসাময়িক মুসলমান ঐতিহাসিক সৈয়দ গোলাম হোসেনের মন্ত ব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তিনি মীর কাশিমের কয়েকজন বিশিষ্ট সভাসদের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন এবং নবাবের অপকীর্তি ও সঙ্কীর্তি উভয়েরই উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন
“মীর কাশিম বঙ্গীয় সেনানায়ক ও সিপাহী দলের প্রভুভক্তিতে বিশ্বাস করিতেন না বলিয়া, অনেক সময়ে সামান্য কারণে অনেকের প্রাণদণ্ড করিতেও ইতস্তত করেন নাই। কিন্তু দেওয়ানী ও ফৌজদারী বিচারকার্যে অথবা পণ্ডিত সমাজের মর্যাদা রক্ষা কার্যে তিনি যেরূপ ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত রাখিয়া গিয়াছেন তাহাতে তাঁহাকে তৎসময়ের আদর্শ নরপতি বলিলেও অত্যুক্তি করা হইবে না। তিনি সপ্তাহে দুই দিবস যথারীতি বিচারাসনে উপবেশন করিতেন। নিম্নপদস্থ বিচারকগণের বিচার কার্যের পর্যালোচনা করিতেন। স্বয়ং অর্থী, প্রত্যর্থ ও তাহাদের সাক্ষীগণের বাদানুবাদ শ্রবণ করিয়া বিচার কার্য সম্পাদনা করিতেন। তাঁহার আমলে কোন রাজকচারী উৎকোচ গ্রহণ করিয়া ‘হাঁ’কে ‘না’ করিয়া দিতে পারিতেন না। জমিদারদিগের উৎপীড়ন হইতে দুর্বল প্রজাদিগকে রক্ষা করা তাঁহার বিশেষ প্রিয় কার্য মধ্যে পরিগণিত হইয়াছিল। সিরাজউদ্দৌলা বহু ব্যয়ে যে ইমামবাড়ী প্রস্তুত করিয়াছিলেন, তিনি তাঁহার গৃহসজ্জা বিক্রয় করিয়া দরিদ্রদিগকে বিতরণ করিয়া দিয়াছিলেন।”
মীর কাশিম ইংরেজদের হস্তে পদে পদে যেভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হইয়াছিলেন তাহাতে স্বতঃই তাঁহার প্রতি আমাদের সহানুভূতি হয়। কিন্তু স্মরণ রাখিতে হইবে যে ইংরেজদের যে সকল কার্যের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিবাদ ও পুনঃ পুনঃ অভিযোগ করিয়াছেন, বেআইনী হইলেও মীরজাফরের আমল হইতেই তাহা প্রচলিত ছিল। মীরজাফর নবাব হইয়া যে সমুদয় পরওয়ানা দিয়াছিলেন তাহাতে বাংলা দেশের অভ্যন্তরে বিনা শুল্কে কোম্পানীর বাণিজ্য করিবার অধিকার স্বীকৃত হইয়াছে। আর কোম্পানীর কর্মচারীরা মীরজাফরের আমল হইতে এরূপ অবৈধ বাণিজ্য করিয়াছে এবং নবাবের কর্মচারীরা বাধা দিলে নিজেরাই তাঁহাদের বিচার করিয়া শাস্তি দিয়াছে।
