এইরূপ পুনঃ পুনঃ পরাজয়ে ও সেনানায়কের বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী শুনিয়া মীর কাশিম উন্মত্তবৎ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হইলেন। তিনি ৯ই সেপ্টেম্বর ইংরেজ সেনাপতিকে পত্র লিখিয়া জানাইলেন যে তাঁহার সৈন্যদের অত্যাচারে তিন মাস যাবৎ বাংলা দেশ বিধ্বস্ত হইতেছেযদি তাহারা এখনও নিবৃত্ত না হয় তাহা হইলে তিনি এলিস ও ইংরেজ বন্দীদের হত্যা করিবেন। তাঁহার সেনানায়কগণের বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি সকলের উপরেই সন্দিহান হইয়া উঠিয়াছিলেন। এবং মুঙ্গের দুর্গে বন্দী জগৎশেঠ, মহারাজা রাজবল্লভ, স্বরূপচাঁদ, রামনারায়ণ প্রভৃতি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদিগকে এবং আরও বহু বন্দীকে গলায় বালি বা পাথর ভরা বস্তা বাঁধিয়া দুর্গপ্রাকার হইতে গঙ্গাবক্ষে নিক্ষেপ করিয়া নির্মমভাবে হত্যা করিলেন। কাহারও কাহারও মতে জগৎশেঠকে গুলি করিয়া মারা হয়। তারপর আরাব আলি খাঁ নামক একজন সেনানায়কের হাতে মুঙ্গের দুর্গের ভার অর্পণ করিয়া পাটনায় গমন করিলেন। পথিমধ্যে দুইজন সৈন্য “গরগিন খা”কে হত্যা করে। ইংরেজ সৈন্য ১লা অক্টোবর মুঙ্গের দুর্গ অবরোধ করিল এবং আরাব আলি খাঁর বিশ্বাসঘাতকতায় ঐ দুর্গ অধিকার করিল। কতক নবাবীসৈন্য ইংরেজের পক্ষে যোগ দিয়া নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিল। এই সংবাদ শুনিয়াই নবাব ইংরেজ বন্দীদিগকে হত্যা করিবার আদেশ দিলেন। নৃশংস সমরু অতি নিষ্ঠুরভাবে এই আদেশ পালন করিল। একমাত্র ডাক্তার ফুলার্টন ব্যতীত ইংরেজ নরনারী, বালকবালিকা সকলেই নিহত হইল (৫ই অক্টোবর, ১৭৬৩ খ্রীষ্টাব্দ)।
ইংরেজ সৈন্য ২৮শে অক্টোবর পাটনার নগরোপকণ্ঠে উপনীত হইল। মীর কাশিম ইহার পূর্বেই তাঁহার সুশিক্ষিত অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া পলায়ন করিয়াছিলেন। পাটনার দুর্গ রক্ষার যথেষ্ট বন্দোবস্ত থাকা সত্ত্বেও ৬ই নভেম্বর ইংরেজ সৈন্য এই দুর্গ অধিকার করিল। তখনও মীর কাশিমের শিবিরে তাঁহার ৩০,০০০ সুশিক্ষিত সেনা এবং সমরুর সেনাদল ও মুঘল অশ্বারোহিগণ ছিল। কিন্তু পুনঃ পুনঃ পরাজয়ের ফলে ভগ্নোদ্যম হইয়া তিনি বাংলা দেশ ত্যাগ করাই স্থির করিলেন এবং অযোধ্যার নবাব উজীর শুজাউদ্দৌল্লার আশ্রয় ও সাহায্য ভিক্ষা করিয়া পত্র লিখিলেন। কর্মনাশা নদীর তীরে পৌঁছিয়া তিনি শুজাউদ্দৌল্লার উত্তর পাইলেন। শুজাউদ্দৌল্লা স্বহস্তে একখানি কোরাণের আবরণ-পৃষ্ঠায় মীর কাশিমকে আশ্রয় দানের প্রতিশ্রুতি লিখিয়া পাঠাইয়াছেন দেখিয়া মীর কাশিম আশ্বস্ত হইয়া বহু ধনরত্নসহ সপরিবারে এবং সুশিক্ষিত সেনাদল লইয়া এলাহাবাদে শিবির স্থাপন করিলেন। এই সময় সম্রাট শাহ আলম শুজাউদ্দৌল্লার আশ্রয়ে বাস করিতেছিলেন। এই তিন দল যাহাতে মিত্ৰতাবদ্ধ না হইতে পারে তাঁহার জন্য মীরজাফর, শাহ আলম ও শুজাউদ্দৌল্লা উভয়ের নিকটেই গোপনে দূত পাঠাইলেন।
মীর কাশিম বহু অর্থদানে উভয়ের পাত্রমিত্রকে বশীভূত করিলেন। তাঁহারা তাঁহাকে বাংলা দেশ উদ্ধারের জন্য সাহায্য করিবেন, এই মর্মে এক সন্ধি হইল।
এদিকে ইংরেজ সেনাপতি অ্যাডাম্সের মৃত্যু হওয়ায় মেজর কারন্যাক ঐ পদে নিযুক্ত হইলেন। তিনি প্রথমে বক্সারে শিবির স্থাপন করিয়াছিলেন, কিন্তু রসদের অভাবে পাটনায় ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হইলেন। পাটনার পশ্চিমস্থ সমস্ত প্রদেশ বিনা যুদ্ধেই মীর কাশিমের হস্তগত হইল এবং তিনি ও অযোধ্যার নবাব মিলিত হইয়া পাটনায় ইংরেজ শিবির অবরোধ করিলেন। পরে বর্ষাকাল উপস্থিত হইলে বক্সারে শিবির সন্নিবেশ করিলেন। কিন্তু ইংরেজ সৈন্য তাঁহাদের পশ্চাদ্ধাবন করিল না।
বক্সার শিবিরে অবস্থানের সময় সমরু ও অন্যান্য কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রে শুজাউদ্দৌল্লা মীর কাশিমের প্রতি খুবই খারাপ ব্যবহার করিতে লাগিলেন। যথেষ্ট অর্থ না দিতে পারায়, মীর কাশিমকে ভর্ৎসনা করিলেন। অর্থাভাবে সৈন্যদের বেতন দিতে না পারায় সমরু তাঁহার সেনাদল ও অস্ত্রশস্ত্র লইয়া শুজাউদ্দৌল্লার আশ্রয় গ্রহণ করিল। তারপর সমরু নূতন প্রভুর আদেশে পুরাতন প্রভুর শিবির লুণ্ঠন করিয়া মীর কাশিমকে বন্দী করিয়া শুজাউদ্দৌল্লার শিবিরে লইয়া গেল। শুজাউদ্দৌল্লা নিরুদ্বেগে বক্সারে নৃত্যগীত উপভোগ করিতে লাগিলেন।
ইতিমধ্যে মেজর মনরো কারন্যাকের পরিবর্তে সেনাপতি নিযুক্ত হইয়া বক্সার অভিমুখে অগ্রসর হইলেন। আরার নিকটে নবাবসৈন্য তাঁহাকে বাধা দিতে গিয়া পরাজিত হইল। ইংরেজ সেনা বক্সারের নিকট পৌঁছিলে শুজাউদ্দৌল্লা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইলেন। ১৭৬৪ খ্রীষ্টাব্দের ২২শে অক্টোবর তারিখের প্রাতে মীর কাশিমকে মুক্তি দিয়া শুজাউদ্দৌল্লা ইংরেজদিগকে আক্রমণ করিলেন। যুদ্ধে ইংরেজদের জয়। হইল। শাহ আলম অমনি ইংরেজদের সঙ্গে যোগ দিলেন। শুজাউদ্দৌল্লা ও মীর কাশিম রোহিলখণ্ডে পলায়ন করিলেন। ইংরেজ সৈন্য অযোধ্যা বিধ্বস্ত করিল। মীর কাশিম কিছুদিন রোহিলখণ্ডে ছিলেন–তাঁহার পরে সম্ভবত ১৭৭৭ খ্রীষ্টাব্দে অতি দরিদ্র অবস্থায় দিল্লির এক জীর্ণ কুটিরে তাঁহার মৃত্যু হয়।
ইংরেজের সহিত মীর কাশিমের যুদ্ধে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। পলাশীতে ক্লাইব মীরজাফর ও রায়দুর্লভের বিশ্বাসঘাতকতার ফলেই জিতিয়াছিলেন–এবং সেখানে বিশেষ কোন যুদ্ধও হয় নাই। কিন্তু মীর কাশিমের সৈন্যদল ইংরেজ সৈন্যের তিন চার গুণ বেশী ছিল। তাহারা বীর বিক্রমে যুদ্ধ করিয়াছিল। সুতরাং তাহাদের পুনঃ পুনঃ পরাজয় এই সিদ্ধান্তই সমর্থন করে যে ইংরেজরা সামরিক শক্তি ও নৈপুণ্যে ভারতীয় অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিল এবং বাহুবলেই বাংলা দেশে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন।
